এটা হতে পারে করোনা মোকাবিলার অন্যতম গাইডলাইন।

নীচের ছবিটা এই মুহুর্তে বাংলাদেশের জন্য অশনি সংকেত। প্রথম করোনা রোগী আক্রান্ত হবার পর থেকে প্রথম ২৯ দিনের হিসেবে দেখা যাচ্ছে আমরা বিশাল ব্যবধানে মড়ক লাগা অন্য দেশ গুলির থেকে এগিয়ে আছি। ওই উন্নত দেশগুলির থেকে আমাদের প্রিপারেশন কেমন তা সবাই জানেন। তাই ভবিষ্যৎ সহজেই অনুমেয়!খোদ আমেরিকাতেই প্রথম ২৯ দিনে ১৫ কেইসের বিপরীতে পরের ৪৭ দিনে কেইস ধরা পড়েছে প্রায় সোয়া তিন লাখ! বাংলাদেশে তাহলে প্রথম ২৯ দিনে ৮৮ (আমেরিকার থেকে এই সময়ের মধ্যে ৬ গুণ বেশি) কেইসের বিপরীতে পরের ৪৭ দিনে প্রায় ১৮-২০ লাখ কেইস হবার কথা! মনে রাখতে হবে বাংলাদেশে প্রচুর ঘনবসতি আর করোনাও সাধারণ ফ্লু এর থেকে প্রায় তিন গুন বেশি ছোয়াচে। তাই কেইস আরো বাড়াটাও অস্বাভাবিক না!

আমার ভয় হচ্ছে জাস্ট আর এক দুই সপ্তাহ! এরপর খুব সম্ভবত আমাদের রোগী নিয়ে ছুটোছুটি শুরু হবে। বাবাটা চোখের সামনে একটু শ্বাসের জন্য আকুলি বিকুলি করবে। একটু অক্সিজেন একটু নেবুলাইজেশনের আশায় আমরা পথে পথে ঘুরবো, এই হাসপাতাল ওই হাসপাতাল করবো! কিন্তু কোথাও জায়গা পাবো না! বাংলার হাসপাতাল গুলো এতো স্থান সংকুলান করবে কোথা থেকে! ইউরোপ আমেরিকার হাসপাতাল গুলো যেখানে কল্যাপ্স করছে সেখানে পুরো বাজেটের মাত্র ৫% হেলথ সেক্টরে খরচ করা দেশটার কি হবে তা ভাবতেও ভয় লাগছে!

দেরিতে হলেও ডিজি হেলথ স্যার বাস্তবতা মেনে বলেছেন আক্রান্ত বেশি হলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কল্যাপ্স করবে। লাইভে এসে মন্ত্রী মহোদয় নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন প্রতিনিয়ত। এখন চলছে দোষারোপের পালা!

কারো দোষ খুঁজে এখন লস ছাড়া লাভ নেই। আমার মতে তাই আগামী সপ্তাহের প্রিপারেশন এখনই নিতে হবে। তাতে নিশ্চিত বেশ কিছু জীবন রক্ষা পাবে, বেচে যাবে অনেকগুলো পরিবার!

আমি কোনো জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নই। ক্যারিয়ার আর প্যাশন সার্জারী হলেও করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একদম সম্মুখ সমরের ক্ষুদ্র যোদ্ধা আমি। এই লড়াই লড়তে গিয়ে আমার উপলব্ধিগুলো তুলে ধরতে চাই।

১. ‘ An army of sheep led by a lion is better than an army of lions led by a sheep.’ আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট এর বিখ্যাত উক্তি। ন্যাশনাল করোনা রেসপন্স টিমের দায়িত্ব ব্যুরোক্র্যাটদের হাত থেকে ডাক্তার সম্প্রদায়ের স্কলারদের দিয়ে লিড করাতে হবে। আমাদের আজিজুল কাহহার স্যার, রিদোয়ান স্যার, রোবেদ আমিন স্যাররা আছেন। আমাদের দূর্যোগ প্রতিমন্ত্রী এনামুল স্যার আছেন। রানা প্লাজা ক্রাইসিসে উনার অবদান সবাই জানেন। বাংলাদেশ নিডস দি সার্ভিস অব অল দি ব্রিলিয়ান্ট মাইন্ডস রাইট নাও।হোপলেস কোনো সেনাপতি দিয়ে আর যাই হোক যুদ্ধ জয় হবে না। বিশ্বাস করেন, উপজেলা লেভেলে সরকারের প্রতিটি উইং..স্বাস্থ বিভাগ, পুলিশ,প্রশাসন ..প্রত্যেকে তাদের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করছে। এরা প্রত্যেকে একেকজন লায়ন। শুধু এদের নেতৃত্বে লায়ন দরকার। তাই ময়দানে নতুন যোগ্য সেনাপতি আনার এখনই সময়।

২. বাংলাদেশের বিশেষ করে ঢাকা এবং জেলা সদরের সব প্রাইভেট হসপিটাল গুলো রিকুইজিশন দিয়ে সরকারের অধীনে আনতে হবে। প্রত্যেকটা এলাকায় একটা করে করোনা আক্রান্তদের জন্য ডেডিকেটেড হাসপাতাল ঠিক করে দিতে হবে যেখানে শ্বাসকষ্ট, জ্বর গলা ব্যাথার প্রত্যেকটা রোগী প্রথমে যাবেন। যেমন মিরপুর ১/২, টোলারবাগ, কল্যাণপুর এলাকার জন্য বিআইএইচএস, ইবনেসিনা অথবা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালকে ঠিক করা যেতে পারে। এই হাসপাতাল গুলোতে শুধুমাত্র করোনা সাস্পেক্টেড রোগীগুলি যাবেন। গুলশান, বাডডা, উত্তরা ইত্যাদি প্রতিটি এলাকার জন্য আলাদা ডেডিকেটেড করোনা ইউনিট ঠিক করতে হবে। অন্য হাসপাতালগুলোতে ফুসফুস বাদে অন্য সব স্পেশালটির রোগীরা যাবেন।সেটাও ঠিক করে দিতে পারলে ভালো হয়। যেমন ঢাকার দুইটা বা তিনটা হাসপাতালকে প্রসূতিসেবার জন্য ফিক্স করা যেতে পারে। ঠিক একই ভাবে জেলা শহর গুলোতেও হাসপাতাল ঠিক করতে হবে। এই মুহুর্তে রোগীদের যে ভোগান্তি তার প্রধান কারণ সুনির্দিষ্ট প্রটোকলের অভাব। তাই রোগ অনুযায়ী হাসপাতাল ঠিক করে দিলে ভোগান্তি অনেক কমবে বলেই আমার বিশ্বাস।

৩. শুধু হাসপাতাল ঠিক করলে হবে না, এগুলো চালানোর জন্য ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ড বয়, আয়া লাগবে। বাংলাদেশে সরকারী বেসরকারী মিলিয়ে প্রায় ৮০ হাজার রেজিষ্টার্ড ডাক্তার আছেন। ঠিক একই ভাবে নার্সদের সংখ্যাও অনেক। সরকারী বেসরকারী সবাইকে রোষ্টারে আনা যেতে পারে। যারা চিকিৎসা দেবেন প্রত্যেককে সরকারি ভাবে আপদকালীন সময়ে যার যার যোগ্য পেস্কেল অনুযায়ী বেতন দিতে হবে। কোনটা কিডনীর আর কোনটা প্রসূতিসেবার হাসপাতাল এটা ঠিক হবার পর যার যার সোসাইটির( যেমন বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন) প্রধান দুইজনের হাতে ওই ডেডিকেটেড হাসপাতালের ডাক্তারদের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। করোনা ইউনিটে অপেক্ষাকৃত তরুণ চিকিৎসকদের দায়িত্ব দিতে হবে। বিভিন্ন বিষয়ে বেশ কয়েকটি এক্সপার্ট প্যানেল তৈরি করে তাদের দিয়ে সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় এক্সপার্ট ওপিনিয়ন প্রয়োজন হলে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে তা প্রোভাইড করা যেতে পারে।

৩. এই লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের সাথে আমরা হেলথকেয়ার প্রোভাইডাররাও বেশ কিছু মানুষ মারা যাবো তা নিশ্চিত। ইতোমধ্যে ১২ জন ডাক্তার করোনা পজিটিভ, ১৪৭ জন কোয়ারান্টাইনে। দুইটা স্বাস্থ কম্পলেক্স পুরোটা লকডাউনে। তাই প্রায় সুইসাইডাল এই মিশনে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে যারা কাজ করবেন তাদের জন্য বীমা থাকা আবশ্যক। কারণ জুনিয়র ডাক্তারদের অনেকেই তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম। তাদের কিছু হলে পরিবারগুলো পথে বসে যাবে। পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত হলে অনেক ডাক্তাররাই আগ্রহের সাথে এগিয়ে আসবেন এটা নিশ্চিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সরকারি ডাক্তারদের প্রশংসা করলেও উনার বক্তব্যে বেসরকারি ডাক্তারদের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন এলাকায় করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল ঠিক করে ভলান্টিয়ার চাইলে দেখবেন প্রচুর বেসরকারি চিকিৎসক সারা দেবেন। তারপরও যদি চিকিৎসক না পাওয়া যায়, তাহলে সবার ‘ডাক্তার পালিয়ে গিয়েছে’ এই অভিযোগ আমরা মাথা পেতে নেবো।

৪. করোনা আক্রান্তদের ৮০ শতাংশের কোনো উপসর্গ থাকে না বা থাকলেও খুব অল্প উপসর্গ থাকে। তাদের চিকিৎসা বাসাতেই সম্ভব। ২০ শতাংশের মধ্যে ৫ শতাংশের আইসিইউ লাগে।এই ৫ শতাংশের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং আউটকামও খুব ভালো না। কিন্তু মাঝের ১৫ শতাংশের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া লাগে এবং সময়মত চিকিৎসা করলে তাদের বেশিরভাগকেই পুরো সুস্থ করা সম্ভব। তাই এই ১৫ শতাংশ জীবনের কথা চিন্তা করে এগুতে হবে। তাদেরকে গুরুত্ব দিতে হবে সব থেকে বেশি।

৫. আজ থেকে ধরে আগামি ২১ দিন কমপ্লিট লকডাউন করতে পারলে সবথেকে ভালো হয়। এতে রোগের ট্রান্সমিশন ব্যাহত হবে। এই সময়ের মধ্যে যারা আক্রান্ত হবেন তাদেরকে এবং তাদের কন্ট্যাক্টকে সহজে সনাক্ত করাও যাবে। ঘানার প্রেসিডেন্টের বিখ্যাত লাইনটাই মনে পড়ছে.. We know how to bring the economy back to life. What we do not know is how to bring people back to life!

আমার জীবনের সবথেকে বড় ভয় কি? এই প্রশ্নের উত্তর আমার প্রিয় পরিবারের আপনজনদের মৃত্যু! আমি মারা যেতে পারি এই সম্ভাবনাটা অতটা ভয় ধরায় না যতটা ধরায় আমার আপনজনদের মৃত্যু সম্ভাবনা। তার থেকেও বেশি ভয় পাই যে আমার বাবা,মা,বউ কিংবা আমার ছোট্ট মেয়েটা প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে ভুগছে আর আমি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি কোনো হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে। রাষ্ট্রের কাছে শেষ মুহূর্তে একটু অক্সিজেন একটু নেবুলাইজেশন, একটা হাসপাতালের বেড.. স্বাধীন বাংলার নাগরিক হিসেবে এইটূকূও কি অনেক বেশি চাওয়া?!

বিঃদ্রঃ উপরের সবকিছু আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত। কাউকে ভয় দেখানোর জন্য নয় বরং সবথেকে খারাপ সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। কারণ we can never be too prepared for corona!
আল্লাহ আমাদের সহায় হউন।

ডাঃ মুহাম্মদ আবু নাহিদ।

মেডিকেল অফিসার

শ্রীমংগল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related Articles