ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাজ করে যাওয়া যোদ্ধাদের গল্প

আমাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে

ইমার্জেন্সি অপারেশন এর জন্য ৮ টা ওটি ২৪*৭ খোলা থাকে।এর মাঝে একটা অপারেশন থিয়েটার কে করোনার জন্য ডেডিকেট করা হয়েছে।

মানে করোনা কনফার্মড বা সাসপেক্টেড সব ধরনের রোগী দের অপারেশন হবে এই অপারেশন থিয়েটারে, পাশেই খোলা হয়েছে করোনা রোগী দের জন্য পোস্ট অপারেটিভ রুম।কালকে আমার ইভিনিং ডিউটি ছিল ঐ ওটি তে।গিয়েই হ্যান্ডওভার নিতে নিতে শুনি, গাইনি অবস বিভাগের একটা রোগীর ওটি হবে। রাপচার্ড এক্টোপিক প্রেগন্যান্সির (ভ্রুণ জরায়ু তে স্থাপিত না হয়ে ডিম্বনালীর মাঝে ফেটে গেছে) পেশেন্ট। রোগীর বাড়ি নারায়ণগঞ্জ, সাথে জ্বর এর হিস্ট্রি আছে। রেড জোনের রোগী বিধায়, তার কোভিড ১৯ এর টেস্ট করতে দেওয়া হয়েছে, রিপোর্ট পেন্ডিং।

বিকাল ৫ টায় অপারেশন শুরু হলো।

যাবতীয় সতর্কতা নিয়ে রোগী কে এনেস্থিসিয়া দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য একদম মিনিমাম স্টাফ নিয়েই অপারেশন করা হয়েছে।

সার্জন, এনেস্থিসিওলজিস্ট, নার্স, ওটি বয় সবাই ছিলেন, কারো মাঝে এতটুকু ভীতি কিংবা অবহেলা ছিল না।যে যেভাবে সম্ভব পরস্পরকে সাহায্য করে গেছে।

আমার সুপারভাইজার ডা. আরমান আলী টিটু স্যার অপারেশন চলাকালীন পুরো সময় ঠায় দাড়িয়ে ছিলেন,আমাকে যতটা সম্ভব আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন। এমন কি ডিপার্টমেন্টাল হেড স্যার ও ফোনে খবর নিয়েছেন।

গাইনোকলিজস্টরা অপারেশন এর সময় সার্জনদের কল দেন। সে কল এটেন্ড করেন আমাদের মেডিক্যালেরই সার্জারী বিভাগের বড় বোন ডা. শাওন শারমিন আপা। অপারেশন এর সময় ডায়াগনোসিস হয় বার্স্ট এপেনডিক্স(এপেণ্ডিক্স এর প্রদাহ হয়ে পড়ে ফেটে গেছে) উইথ সেকেন্ডারি ইনফেকশন।

অপারেশন এর সময় রোগীকে যথাসম্ভব আমরা আশ্বস্ত করেছি, জানিয়েছি আমাদের বাড়তি সতর্কতার কারণ। রোগীও যথেষ্ট কো-অপারেটিভ ছিলেন।

সবার সম্মিলিত চেষ্টাতে ৩ ঘন্টা র সফল অস্ত্রপচার শেষে রোগী কে সাসপেক্টেড করোনা পেশেন্ট জন্য নির্ধারিত পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড এ স্থানান্তর করা হয়।

প্রতিটি মেডিকেলেই প্রতিদিন এমন শতশত অপারেশন হয়। করোনা সাসপেক্টেড অনেক কেসও হয়। ডাক্তাররা পেশাগত চাপেই হোক, রোগীর গোপনীয়তা রক্ষার্থেই হোক কিংবা অন্তর্মুখিতা র জন্যই হোক এগুলো প্রচার করেন না। মিডিয়াতে জোরালো ভাবেও হয়ত আসে না।

বিশ্বাস করুন, গতকাল অপারেশন এর সময় একবারের জন্যেও কারো মাঝে এতটুকু অবহেলা কিংবা ঢিলেঢালা ভাব দেখি নি, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে দ্বিগুণ সতর্কতা দেখেছি।

ইতালি তে প্রপার প্রটেকশন নিয়েও শতাধিক ডাক্তার মারা গেছেন….আমাদের প্রটেকশন করোনার বিরুদ্ধে শতভাগ কার্যকর সেটা ভাবার কোন অবকাশ নেই।

আমাদের প্রপার শু কভার ছিল না, এন ৯৫ মাস্কও আমরা পাইনা।যে গুলো করোনা রোগীর অস্ত্রপচারে অপরিহার্য।

জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও আমরা পিছপা হইনি, দেশের ক্রান্তিলগ্নে, জাতীয় দুর্যোগের সময় পিছু হটি নি।

বাসায় না গিয়ে টানা হাসপাতালে থাকছি, আধাবেলা আধাপেটা খাচ্ছি, সব ডাক্তার রা যাতে এক্সপোজড না হয় সেজন্য রোস্টার ডিউটি করতে গিয়ে সাময়িক বরখাস্ত ও হচ্ছি মিথ্যা অভিযোগ মাথায় নিয়ে।তারপরেও সেবা দিয়ে যাচ্ছি আমরা স্বাস্থ্যকর্মী রা।

ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতা শুনবেন???

আমাদের এনেস্থিসিওলজির স্বনামধন্য একজন সহকারী অধ্যাপক করোনা পজিটিভ হয়ে সিএমএইচে ভর্তি আছেন।আমাদের বিভাগের অন্তত পাঁচজন এনেস্থিসিওলজিস্ট(অজ্ঞান করার চিকিৎসক) ওয়ানস্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টারে ১টা কনফার্মড কোভিড পেশেন্ট ডিল করেছেন।সাসপেক্টেড পেশেন্ট ডিল করেছেন অনেক।

ডিএ স্টুডেন্ট এক আপুর হাজব্যান্ড কোভিড পজিটিভ হয়েছেন। তার বাসা লকডাউন করা হয়েছে।

সার্জারী বিভাগের ২ টা ইউনিটের অন্তত ২৫ জন ডাক্তার কনফার্মড করোনা রোগীর সংস্পর্শে এসেছেন। একটা রোগী মারাও গিয়েছে।

মেডিসিন বিভাগের ডাক্তার রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি এটিপিক্যাল নিউমোনিয়া র কেইস ডিল করছেন।

কালকে সাসপেক্টেড রোগী টার অস্ত্রপচার শেষে বাসায় ফিরে একা একটা ঘরে বন্দী হয়ে আছি। ছেলেটার বয়স সাড়ে তিন বছর। আজ ২০ দিন সে বাসার বাইরে যায় না। ঘরেই আমার সাথে খেলে,মারামারি করে,কোলে কাঁধে উঠে লাফালাফি করে।
কালকে ওর মা ওকে বুঝাইছে, বাবার কাছে যাওয়া যাবে না।শোনার পর ছেলে অস্থির হয়ে পড়ছে, বন্ধ দরজার সামনে গলা ফাটিয়ে কান্নাকাটি করছে। বাবা হয়ে আমি চুপচাপ ঘরের ভেতর শুনছি।একই বাসায় থেকেও সন্তানকে কোলে নিয়ে আদর করতে পারছি না।কষ্ট টা কি রকম বোঝানোর সাধ্য নেই…

কালকে অস্ত্রোপচার শেষে পিপিই ডিস্পোজাল এর সময় সুপারভাইজার স্যারের ফোন এসেছিল। কথা বলার জন্য স্পিকার অন করতেই স্যারের মেয়ে ডাক ছেড়ে কান্না শুরু করছে।কারণ স্যার ওটির মাঝে ৩ ঘন্টা ফোন ধরেন নাই।সে বাবাকে মিস করছিলো।

এই ত্যাগ গুলো, এই কষ্ট গুলো কখনো খবরের কাগজে হয়ত দেখবেন না।

চিকিৎসক সত্তা আর পিতৃ/মাতৃসত্তার মাঝে পড়ে আমাদের এই নিয়ত হাঁসফাঁস কখনো আসবে না কোন টিভি চ্যানেলে।

দাহকালে সবার কাছে কেবল একটাই অনুরোধ , কেবল একটাবার কি আমাদের ডাক্তার না ভেবে মানুষ ভাবা যায় না????

লেখা কৃতজ্ঞতাঃডা. তানভীর হক(ডিএ স্টুডেন্ট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল)

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related Articles