জাতীয় বীরের স্বীকৃতি চাই

কি আকুল আবেদন ছিল ডা. মঈনের! নিজে ডাক্তার হয়েও, চিকিৎসা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েও নিতান্ত অসহায় অবস্হায় রাষ্ট্র তাকে একটা এয়ার এ্যাম্বুলেন্স দিতেও ব্যর্থ।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের কে ৪৮ ব্যাচের ছাত্র ডা. মঈনউদ্দীন। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অন্য সকল ডাক্তার চেম্বার বন্ধ করলেও উনি চেম্বার বন্ধ করেননি। কিছুদিনের মধ্যেই নিজে আক্রান্ত হন জ্বর, সর্দিকাশি তে। পরীক্ষার পর ধরা পড়লো উনি কোভিড নাইনটিন পজিটিভ অর্থাৎ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। সিলেটে শামসুদ্দীন করোনা হাসপাতালে চলছিলো তাঁর চিকিৎসা। অবস্হার অবনতি হলে প্রয়োজন পড়ে ভেন্টিলেটর সহ আইসিইউ এর। কিন্তু উনার কর্মস্হল সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংক্রমণের অজুহাতে উনার জন্য আইসিইউ এর একটি বেড দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। নিতান্ত অসহায় অবস্হায় উনি ঢাকায় কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে আসার ইচ্ছা পোষণ করলে রাষ্ট্রীয় ভাবে উনার জন্য একটা এয়ার এম্বুলেন্সের ব্যবস্হা ও হয়নি! সিলেট মেডিকেলের সহকারী পরিচালকের বক্তব্য অনুসারে উনাকে ঢাকায় শিফটের প্রয়োজন ছিল না, উনার পারিবারিক সিদ্ধান্তে উনি ঢাকায় আসেন! তাই এয়ার এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্হা করার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের না! নিজস্ব ব্যবস্হাপনায় তিনি সড়কপথেই এ্যাম্বুলেন্সে আসেন ঢাকায়। গত তিনদিন মৃত্যুর সাথে পান্জা লড়ে আজ সকাল ৭:৫০ মিনিটে চলে গেলেন না ফেরার দেশে, সকল অভাব-অভিযোগের ঊর্ধ্বে।
আমরা দুঃখিত, লজ্জিত, ক্ষমাপ্রার্থী। এ রাষ্ট্র তার মেধাবী সন্তানকে ধারণ করতে অক্ষম। তার প্রাপ্য টুকু আমরা তাঁকে দিতে পারিনি। ডা. মঈনের নিষ্পাপ দুটি শিশুর মুখের দিকে তাকাতে লজ্জা লাগে, অপরাধবোধে কুঁকড়ে যাই। কি জবাব দিবো আমরা ওদের কাছে? একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তৈরীর পিছনের গল্প সবাই জানে না। জানলে বুঝতো আমাদের মত রাষ্ট্র আজ কি সম্পদ হারালো!
যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিককে ঢাল-তলোয়ারবিহীন অবস্হায় শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধ্য করা হয়েছে। এর দায় কার? আজ পর্যন্ত মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর থেকে একজন কর্তাব্যক্তিও কি তাঁকে দেখতে একবারের জন্য হলেও হাসপাতালে গিয়েছে? তাঁর পরিবারের খোঁজ নিয়েছে? এতটুকু দায়িত্বও কি কারো নেই? সরকারী একজন কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালীন পেশাগত কারণে মৃত্যু হলে তার দায়িত্ব কার? ধিক ধিক শতধিক! এর দায় এ রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের।

ডা. মঈন স্যারের জন্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন ও জাতীয় বীরের স্বীকৃতি চাই। উনার পরিবারের দায়িত্ব আজ রাষ্ট্রকে নিতে হবে। অন্তত কিছুটা লজ্জা ঢাকার জন্য হলেও, কিছুটা দায়মুক্তির জন্য হলেও। আজ রাষ্ট্রযন্ত্র যে বড় বেশি দায়ী ডা. মঈনউদ্দীনের কাছে!

লেখক – ডা. শাফিনাজ মেহজাবীন

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related Articles