বেয়াদব ছাত্র ও ঘরজামাই বাড়িওয়ালা

বেয়াদব ছাত্র ও ঘরজামাই বাড়িওয়ালাঃ

সময় টা ২০০৩ এর সেপ্টেম্বর।
মেডিকেল কোচিং এর জন্য আমি ঢাকায় তখন।
উঠলাম পূর্ব রাজা বাজারের একটা মেচে।
গ্রাম থেকে এসেছি।
শহরের মানুষের হাবভাব বুঝিনি তখনো।

সাদা লুঙ্গি ও ফতুয়া পরা এক লোক প্রায়ই মেচে এসে স্টুডেন্টদের উপর খবরদারি করতো।
ঝিনাইদহ এর ছেলে সৌমেন ছিলো আমার রুমমেট।

আমি গ্রাম থেকে আসলেও আমার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিলো।
আমি পড়তে বসলেই আমার মা বাবার চেহারা চোখে ভেসে উঠতো।

সম্ভবত সেই জন্যই কোচিং লাইফে আমি বখে যাইনি।
গ্রাম বা মফস্বল থেকে শহরে এসে পোলাপান তখন আনন্দ ছন্দ সিনেমায় সময় কাটাতো, চন্দ্রিমা উদ্যানে ঘুরে বেড়াতো, ইন্দিরা রোডে আড্ডা দিতে যেত, কোচিং এর সামনে মেয়েদের পটানোতে ব্যস্ত ছিলো তখন আমি ছিলাম একেবারেই ভিন্ন চিন্তায়।

তখন আমাদের অনেক ক্রান্তিকাল ছিলো।
অভাব ছিলো।
ঘরে ভাত ছিলো না।
আমার বাবা সুদে টাকা ধার এনে আমাকে কোচিং এ এডমিট করিয়ে দিয়ে গেছেন।

আমার ইঞ্জিনিয়ার হবার খুব শখ ছিলো।
আমার অনুপ্রেরণা ছিলেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আমার প্রিয় মানুষ ড. দেলোয়ার হোসেন কাকা।
উনার মত বড় মানুষ হবার ইচ্ছে ছিলো।

ম্যাথ ফিজিক্স ছিলো আমার প্রিয় বিষয়।
অনেকটা গোপন প্রেমিকার মত।

এই দুই সাব্জেক্ট এর সাথে আমার টানটান উত্তেজনামূলক প্রেমের কারণে আমি ম্যাথ ফিজিক্স এ ডুবে থাকতাম বেশি।
বায়োলজি আমি দুই চোখেও দেখতে পারতাম না।
অনেকটা সতীনের মত আচরণ করেছি আমি কোচিং এ ভর্তি হবার আগ পর্যন্ত বায়োলজির সাথে।
যতটুকু পড়েছি যেখানে আনন্দ ছিলো না
শুধু পড়ার জন্য পড়া।

যাই হউক মেচে সেই সাদা লুঙ্গি পরা লোকের উপদ্রপ বাড়লো অনেক।
পরে জানলাম উনি বাড়িওয়ালা।
ঘর জামাই থাকেন।
বউ এর হাতে এই বুড়ো কালেও চরম নিগ্রহের স্বীকার উনি।

বউ এর বাপের বাড়িতে থাকেন।
পুরো বাড়ি মেস বানিয়ে ফেলছেন।
ভদ্রলোক পারলে টয়লেটেও একজন ছাত্রকে একটা বেড পেতে ভাড়া দেন এমন অবস্থা।
আর শুধু খবরদারি।

বন্ধু আসা যাবে না।
গান শুনা যাবেনা।
পানি বেশি ইউজ করা যাবে না
উনি পারলে শৌচকার্যে কে কতটুকু পানি ব্যবহার করবে তাও মেপে দেন এমন অবস্থা।

পোলাপান আড়ালে আবডালে উনাকে গালি দেয়।
খিস্তিখেউড় দেয়।
কিন্ত সামনে চাচা চাচা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে ভয়ে।

আমি রীতিমতো ক্ষুব্ধ।
একদিন আমি মুখের উপর বলে বসলাম।
চাচা আপনি এত ঘনঘন আমার রুমে আসবেন না।
আমার ডিস্টার্ব হয়।
আপনি শুধু মাসে একবার আসবেন ভাড়া নিতে।

ভদ্রলোক আমার বেয়াদবি টা নিতে পারলেন না।
হুংকার দিলেন।
উনি বের করে দিবেন আমাকে।
আমি এই রাজাবাজারে কোথাও জায়গা পাবো না উনার এমন পাওয়ার।

আমি আবার উচিত কথা বলায় ঘাউরা ও বেয়াদব।
কথা মিথ্যা বলেননি।
আমি বলে বসলাম, আপনার বালের মেচে আমিই থাকবো না।
আর আমাকে ক্ষমতা না দেখিয়ে চাচীকে ক্ষমতা দেখান পারলে।
ঘর জামাই পুরুষদের গলার আওয়াজ এত লাউড হলে সেটা বেমানান।

ভদ্রলোক গেলেন চটে।
বললেন, বেয়াদব ছেলে।
এখনই আমার মেচ ছাড়ো।
আমি বললাম, এখন রাত ১১ টাকা।
আগামীকাল সকালেই ছেড়ে দিবো।

তারপর আমাকে অভিশাপ দিলেন, তুমি জীবনেও কোথাও চান্স পাবে না।
আমি মুখের উপর বলে দিলাম।
চান্স পাই আর না পাই তবে জীবনেও আপনার মত ঘর জামাই হবো না এটা নিশ্চিত।।

তারপর সেই মেচ ছেড়ে দিলাম সকালেই।।
চলে গেলাম পশ্চিম রাজাবাজারে।

তবে মেডিকেলে চান্স পাবার পর আমি এক কেজি জিলাপি গিফট করে চাচার দোয়া নিয়ে আসছিলাম।
তখন চাচা বললেন, এসো ভেতরে এসো।
চা খেয়ে যাও।
কারণ সেই মেচে আগে পরে যারা ছিলো শুধু আমিই মেডিক্যালে চান্স পেয়েছিলাম।

এই বাড়িওয়ালা আমার মাথায় গেঁথে আছেন।

দেশের ক্রান্তিলগ্নে কিছু বাড়িওয়ালা এমন খাটাশ এর মত আচরণ করছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথে।
অনেক চিকিৎসককে বাড়িতে থাকতে দিচ্ছেন না।

এসব খাটাশদের কঠোর ভাবে দমন করা সময়ের দাবী।

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ।।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related Articles