বেসরকারি স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হলে নেই কিছু, মালিকপক্ষের চাপে চাকরি ছাড়ছেন অনেকে

চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী সরকারি কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সবাইকে বিশেষ বিমা পলিসির আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। নানান জটিলতায় বীমার পরিবর্তে আক্রান্তদের টাকা দিতে যাচ্ছে সরকার। সরকার সরকারি হাসপাতালের বাইরে বেসরকারি হাসপাতালে করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া কোনো চিকিৎসক, নার্স বা কর্মী আক্রান্ত হলে বা মারা গেলেও সরকারি এ আর্থিক সুবিধা পাবেন না। এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন৷ খবর প্রথম আলোর।

ঢাকার ১০টি বড় ও মাঝারি বেসরকারি হাসপাতালের কিছু চিকিৎসক ও নার্স কাজে ইস্তফা দিয়েছেন। কিছু চিকিৎসককে বিনা বেতনে ছুটিতে যেতে বলেছে কর্তৃপক্ষ। করোনার এই দুর্যোগের সময় এমন ঘটনা কাঙ্ক্ষিত নয় বলে মনে করছেন সরকারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা। এই প্রবণতা এখনই বন্ধ করার সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন তাঁরা।

দেশে করোনা সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে, মৃত্যুও বাড়ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রোগী ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালকে সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করার কথা শুরু থেকেই বলে আসছে। ইতিমধ্যে রাজধানীতে তিনটি বেসরকারি হাসপাতালকে কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করেছে সরকার। আরও কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালকে যুক্ত করার কাজ চলছে।

সরকার যদি কোনো বেসরকারি হাসপাতালকে করোনার চিকিৎসার জন্য ঠিক করে, তবে ওই হাসপাতালে যাঁরা চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন, তাঁদেরও সরকারি সুবিধাভোগীর আওতায় আনা উচিত।” বলেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার।

এদিকে মালিকপক্ষের চাপে এবং জীবনশংকায় অনেকেই চাকরিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। মালিকপক্ষ পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রীও দিচ্ছেননা। কে করোনা রোগী আর কে নয় এটা না জেনেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। প্রথম আলো পত্রিকার সাথে আলাপে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ইকবাল আর্সলান বলেন, “বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসকদের ব্যবহার করে ব্যবসা বড় করেছে। মাত্র দুই মাস হাসপাতালে রোগী কম হওয়ায় চিকিৎসকদের ছুটিতে যেতে বাধ্য করেছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।”

ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে বেশ কয়েকজন চিকিৎসককে বিনা বেতনে ছুটিতে যেতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই ওই হাসপাতালে রোগী কমতে শুরু করে। সেখানে এখন প্রায় রোগীশূন্য। ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদিও সেটা অস্বীকার করছে।

একাধিক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ও হাসপাতালের উদ্যোক্তা উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম দুটি মৃত্যু হয়েছিল দুটি বেসরকারি হাসপাতালে। ওই দুজন রোগী ভর্তির আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানত না যে ওই দুই বয়স্ক ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) তাঁদের নমুনা পরীক্ষার পর ঘটনা সবার নজরে আসে। এই হাসপাতাল দুটির বেশ কিছু চিকিৎসক ও নার্সকে ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টিনে যেতে হয়েছিল। একটি হাসপাতালে একাধিক চিকিৎসক তখনই চাকরি ছেড়ে দেন।

ল্যাবএইড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এম শামীম প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সমস্যা নানা ধরনের। করোনার রোগী পরীক্ষা করার মতো প্রযুক্তি ও সুযোগ তাঁদের নেই। যেকোনো রোগী তাঁরা ভর্তি করেন। তাঁরা জানেন না কে সংক্রমিত, কে সংক্রমিত নন। তিনি বলেন, ‘আপনি ভাবুন, আইসিইউতে ভর্তির পরে যদি জানা যায় কোনো রোগী করোনায় আক্রান্ত, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়। অন্য রোগী, চিকিৎসক, নার্স সবারই ঝুঁকি থাকে। এর আর্থিক ঝুঁকিও কম না।’

‘আমরা এ বিষয়ে সজাগ আছি। দু-তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চিকিৎসকদের ছাঁটাই বা বিনা বেতনে ছুটিতে যেতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছিল। কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করেছে।’ বলছেন বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া৷

এমন হতে পারে যে সুরক্ষার কারণে চিকিৎসকেরা হাসপাতালে কাজ করতে চাইছেন না। পিপিই নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। আর সত্যি যদি অর্থের সমস্যা হয়, তাহলে সরকারকে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, পদত্যাগ করুক অথবা চাকরি যাক—এতে দুর্ভোগ বাড়বে সাধারণ মানুষের।” বলছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related Articles