N95 তদন্তে প্রভাব বিস্তার, উচ্চ পর্যায়ের কারো নাম আসেনি; দায়ীদের মাস্ক সরবরাহ চলছেই

অতিরিক্ত সচিব সাইদুর রহমানকে প্রধান করে এন-৯৫ মাস্ক কেলেংকারি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করেছে। সেই তদন্ত রিপোর্টটি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলামের টেবিলে জমা দেওয়া হয়েছে। এন-৯৫ মাস্ক জাতিয়াতির ঘটনায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএমআই’র কর্ণধার আবদুর রাজ্জাকসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। একাধিক জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় এ তথ্য উঠে এসেছে৷

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জাতীয় দৈনিক যুগান্তরকে জানান, তদন্ত নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি প্রভাব বিস্তারও। তাই অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। জানা গেছে, যাদের নাম প্রতিবেদনে এসেছে, তারা এন-৯৫ মাস্কের চালান গ্রহণ করেন। উচ্চ পর্যায়ের কাউকে এই তদন্তের আওতায় আনা বা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়নি।

করোনা সংক্রমণের সময় সরকারি হাসপাতালগুলোকে এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আব্দুর রাজ্জাকের মালিকানাধীন জেএমআই নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে। এই প্রতিষ্ঠানটি এন-৯৫ মাস্ক বলে যা সরবরাহ করেছিল, তা এন-৯৫ নয় বলে মুগদা হাসপাতালের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে।

এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এক ভিডিও কনফারেন্সে বলেন যে, এন-৯৫ এর নামে যে মাস্ক দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো আসলে এন-৯৫ কিনা তা দেখা দরকার। যারা সাপ্লাই দিচ্ছে তারা সঠিকভাবে দিচ্ছে কিনা সেটাও তদন্ত করতে বলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের বক্তব্যের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই কমিটির প্রধান ছিলেন অতিরিক্ত সচিব সাইদুর রহমান। তিন দিনের মধ্যে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রদান করার কথা বলা হয়। তবে এই তদন্ত কমিটি গঠিত হওয়ার সাথে সাথে সিএমএসডি’র পরিচালক এই মাস্ক কেলেংকারি নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুরে বক্তব্য রাখেন পরপর তিন দিন। এই বক্তব্যে তিনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএমআই’কে প্রচ্ছন্নভাবে সমর্থন দেন। জেএমআই এর পক্ষ থেকে আব্দুর রাজ্জাকও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সচিবের কাছে যে তদন্তের রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে সেই রিপোর্টে বলা হয়েছে-

প্রথমত; কোনোরকম টেন্ডার ছাড়াই এই মাস্কগুলো সরবরাহ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত; বাংলাদেশে এন-৯৫ মাস্ক উৎপাদন হয় না।

তৃতীয়ত; এন-৯৫ মোড়কে যে মাস্ক সরবরাহ করা হয়েছে সেটা আসলে এন-৯৫ নয়।

চতুর্থত; এই ঘটনার জন্য দায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

তবে এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দায়ী হলেও কেন তাদেরকে বিনা টেন্ডারে কাজ দেওয়া হয়েছিল, নেপথ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কে বা কারা জেএমআই’কে পৃষ্ঠপোষকতা করে এবং কেন জেএমআই একচেটিয়াভাবে কাজ করে; এ সমস্ত প্রশ্নের উত্তর তদন্ত কমিটির রিপোর্টে নেই বলে জানা গেছে।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) এন-৯৫ মাস্ক জালিয়াতি ও দুর্নীতির ঘটনা নিয়ে গোপনে অনুসন্ধান শুরু করেছে। সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে জড়িতদের কাউকে ছাড় দেয়া হলে দুদকের অনুসন্ধানে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানান সংস্থাটির চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে এন-৯৫ মাস্কের অনিয়মের বিষয়ে কারও অপরাধ আড়াল করা হলে দুদকের অনুসন্ধানে তা বেরিয়ে আসবে। দুদকের অপর এক কর্মকর্তা জানান, তারা মন্ত্রণালয়ের কাছে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন চাইবেন।

কমিটির এক কর্মকর্তা বলেন, এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা প্রতিবেদনে তুলে ধরেছি। তবে ছোট করে যদি বলি, বিষয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর দিয়ে গড়ালেও ওই প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে এখনও এন-৯৫ সরবরাহ করা হচ্ছে কিনা আপনারা খবর নেন। তবে এ বিষয়ে বেশি আর তেমন কিছু বলতে নারাজ কমিটির সদস্যরা।

একটি সূত্র জানায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিএমআই এখনও বিভিন্ন ধরনের করোনা সামগ্রী সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করছে। ওই প্রতিষ্ঠান ছাড়া আরও দুটি প্রতিষ্ঠানও এন-৯৫-এর পরিবর্তে ‘এডাল্ট ফেস মাস্ক’ নামে এক ধরনের মাস্ক সরবরাহ করছে বলে জানা যায়। চিকিৎসক ও নার্স অনেকটা বাধ্য হয়ে এসব মাস্ক ব্যবহার করছেন। তারাও আছেন ঝুঁকির মধ্যে।

সূত্রঃ যুগান্তর, একাত্তর জার্নাল

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related Articles