বাংলাদেশে করোনার দুইমাস পার, লক্ষ লোক মারা যাওয়ার ধারনা মিথ্যা হল কেন

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র ২০০ জন, অথচ আমাদের ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আলেম সমাবেশ, কাওরানবাজারের জনসমাবেশ কিংবা গত মাসে কাজে ফেরত আসা লাখো গার্মেন্টস শ্রমিকদের সম্মেলনের পর ধারণা করা হচ্ছিল লাখ লাখ বাংলাদেশী মারা যাবে। তা হলো না কেন?
দেখুন, এই বিষয়টি একটি রহস্যের মতো বলা যায়। এই তিনটি ঘটনায় মানুষের উদ্বেগ খুবই স্বাভাবিক ছিল। সরকার যথেষ্ট সদিচ্ছা দেখালেও সমাজের কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী – পোশাক মালিক, ধর্মীয় নেতা এবং ব্যবসায়ীরা এই তিনটি ক্ষেত্রে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হুমকির মুখে ফেলেছেন। তবে আমাদের ভাগ্য ভালো যে এই জনসমুদ্রের ফলে এখনও করোনাভাইরাসের যে বিস্ফোরণ হবার কথা ছিল, তা সেইভাবে হয়নি। এখনও এর বহিঃপ্রকাশ হবার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু তবুও বলা যায় ব্রাক্ষণবাড়িয়া, কাওরানবাজার কিংবা ঢাকায় গার্মেন্টসকেন্দ্রিক মহামিলনের পর যেই হারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর আশংকা করা হয়েছিল, বাস্তবিক চিত্র তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি কেন হলো, তা কারও পক্ষেই এই মুহুর্তে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে যেইসব কারণে বাংলাদেশে মৃত্যুর হার আশংকার তুলনায় এখনও অনেক কম রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছেঃ
১) যদিও অফিসিয়ালি বলা হচ্ছে বাংলাদেশের করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ হয়েছিল ৮ মার্চ ২০২০, কিন্তু অনেকেই মনে করছেন চায়নার সাথে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকার কারণে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ শুরু হয়েছে আরও আগে, সম্ভবত ফেব্রুয়ারিতেই। তাই অনেকেই এরই মধ্যে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে গেছেন কোনপ্রকার লক্ষণ প্রকাশ না করেই, আর কেউ যদি ওই সময়ে করোনায় মারা গিয়ে থাকেন, তারা অন্য কারণে মারা গেছেন বলে ধরে নেয়া হয়েছে।
২) ঘন জনবসতির কারণে আমাদের দেশে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে দ্রুততম সময়ে অধিক সংখ্যক মানুষ ইমিউনিটি অর্জন করে থাকতে পারেন।
৩) উচ্চ তাপমাত্রায় ড্রপলেট (যাকে ভর করে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে থাকে) দ্রুত শুকিয়ে যায় ফলে বাংলাদেশের অতি উচ্চ তাপমাত্রায় করোনাভাইরাস ড্রপলেটে ভর করে হয়ত অতটা ছড়াতে পারেনি, যতটা আশংকা করা হয়েছিল।
৪) করোনাভাইরাস চায়নার উহানে আক্রমণের পর থেকে গত ৬ মাসে বিবর্তিত হয়ে ন্যূনতম আরও তিনটি রুপে পৃথিবীর নানাপ্রান্তে ছড়িয়েছে, যার সবগুলি একই মাত্রায় ক্ষতিকর নয়। বাংলাদেশে যে করোনাভাইরাস আক্রমণ করেছে, হতে পারে সেটি অন্যগুলোর চাইতে কম ভয়াবহ।
৫) বাংলাদেশের মানুষ যুগের পর যুগ খাদ্যে ভেজাল, অবাসযোগ্য পরিবেশ, দূষিত পানি, বিষাক্ত বায়ুসেবন করে, তার সাথে খাপ খাইয়ে আমরা ৭২ বছর গড় আয়ু অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। এমন কি হতে পারে এইসব বৈরিতা পার করে আসায় আমাদের যে ইমিউনিটি অর্জিত হয়েছে তা এই বিশেষ ভাইরাসটি প্রতিরোধে বেশী কার্যকর হয়েছে? এটি আমি প্রশ্ন হিসেবে রাখছি। সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে এই প্রশ্ন অনেকের মধ্যেই আছে, কিন্তু কেউই এখনও এ বিষয়ে নিশ্চিত নন।
এছাড়াও আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে সময়ে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা করেছেন তা একটি কার্যকর ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। তুলনামূলকভাবে এমেরিকা, ক্যানাডা, যুক্তরাজ্য অথবা অষ্ট্রেলিয়ার চাইতে বহুগুণে দূর্বল অর্থনীতির দেশে প্রায় একমাস সময় সাধারণ ছুটি ঘোষণার ফলে যেই বিপুল সংখ্যক মানুষ ঘরে থাকতে পেরেছেন, তা আমাদের দেশের কমিউনিটি ট্রান্সমিসনের গতিকে কিছুটা হলেও রোধ করেছে বলে প্রতীয়মান হয়।
এটি মনে রাখা দরকার, চায়না ছাড়া পৃথিবীর কোন দেশ শতভাগ লকডাউন বা কমিউনিটি ট্রান্সমিসান ঠেকাতে পারেনি। ক্যানাডাতেও শুরু থেকেই সরকার বেশ কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারলেও কখনই পরিপূর্ণ লক ডাউন ঘোষণা করেনি, বহু মানুষ নানাসময় বাইরে গিয়েছেন, এমনকি সরকারও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে শারীরিক পরিশ্রমকে উতসাহিতই করেছে নানাভাবে। কিন্তু বড় দেশ ও জনসংখ্যা কম হওয়ায় ক্যানাডায় ৬ ফুট শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা খুবই সহজ, যার তুলনা বাংলাদেশের সাথে করলে অবিবেচনাপ্রসূত হবে।
আরেকটি বিষয়, যদিও বাংলাদেশে মৃত্যুর হার কম, কিন্তু সংক্রমণের হার কম এটি বলা যাবে না। বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা না মেনে বিশাল জনসমাবেশ করা মানুষের অনেকেই হয়ত আগেই আক্রান্ত হয়ে ইমিউনিটি লাভ করেছিলেন, অথবা পরবর্তীতে আক্রান্ত হয়েছেন কিন্তু লক্ষণ প্রকাশ করেননি বা সীমিত আকারে করেছেন। যেহেতু আমাদের দেশে জনসংখ্যার অনুপাতে করোনার টেস্ট করা হয়েছে অনেক কম, তাই আক্রান্তের প্রকৃত চিত্র কখনই বোঝা যাবে না। তবুও খেয়াল করে দেখবেন, টেস্টের অনুপাতে পজিটিভ রোগী ধরা পড়ার সংখ্যার দিক দিয়ে পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ উপরে। শুরুর দিকে সরকারকে উপদেশ দিয়ে থাকেন এমন কিছু মানুষ দায় এড়াবার স্বভাব থেকে টেস্ট যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেটি অস্বীকার করেছেন। এখন তাদের উপদেশকে অগ্রাহ্য করে টেস্টের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু এটি যদি শুরু থেকে করা হতো, আমরা হয়ত আরেকটু পরিষ্কার একটি চিত্র পেতাম এবং আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারতাম।

শামীম আহমেদ
সোশাল এন্ড বিহেভিয়ারাল হেলথ সায়েন্টিস্ট
ইউনিভার্সিটি অফ টরোন্টো
৭ মে ২০২০
Shamim Ahmed #Corona

Facebook Comments

Related Articles