COVID – 19 নিয়ন্ত্রণে তাইওয়ানের সফলতা নিয়ে কিছু কথা

চীন থেকে মাত্র ৮১ মাইল দূরে অবস্থিত একটি দেশ তাইওয়ান। প্রায় সাড়ে আট লাখ তাইওয়ানের নাগরিক চীনে বসবাস করে। প্রতিদিন চীন থেকে তাইওয়ান ও তাইওয়ান থেকে চীনমুখী অসংখ্য ফ্লাইট যাতায়াত করে থাকে। ২০১৯ সালে প্রায় ২৭ লাখ মানুষ চীন থেকে তাইওয়ান ভ্রমণ করেছেন। তাছাড়া তাইওয়ানে জনসংখ্যার ঘনত্বও অনেক, প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৬৫০ জন।

এ সকল কিছু বিবেচনা করে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিলেন চীনের পর সবচেয়ে বেশি COVID – 19 রোগী হয়তো পাওয়া যাবে তাইওয়ানে। কিন্তু বাস্তবে সেটি হয় নি। তাইওয়ান প্রশাসন সফলভাবে নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধ করতে পেরেছে। প্রথম রোগী জানুয়ারির ২১ তারিখ শনাক্ত হলেও ১৩ই মে পর্যন্ত মাত্র ৪৪০ জন রোগী পাওয়া গিয়েছে এবং এদের মধ্যে ৭ জন মৃত্যুবরণ করেছেন ; ৩৭২ জন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে গিয়েছেন। ৮ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত নতুন কোনো রোগী শনাক্ত করা যায় নি। যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশগুলো রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে ঝূঁকিপূর্ণ এলাকা হওয়া সত্ত্বেও তাইওয়ান কিভাবে সংক্রমণ রোধ করতে পারল? কোন কোন পদক্ষেপ নিয়েছে তাইওয়ান? চলুন সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক সে সম্পর্কে।

তাইওয়ান প্রশাসনের পদক্ষেপগুলোকে প্রধানত দুইভাগে ভাগ করা যায় :

(১) শনাক্ত পূর্ববর্তী পদক্ষেপ ;

২০১৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর চীন উহান শহরে নতুন ধরনের নিউমোনিয়া রোগ চিহ্নিত হওয়ার ঘোষণা দেয়। ঘোষণা দেওয়ার সাথে সাথে তাইওয়ান প্রশাসন উহান ফেরতদের স্ক্রিনিং করা শুরু করে। যাদের জ্বর এবং কাশির মত শ্বসনতন্ত্র সংক্রমণের লক্ষণ ছিল তাদেরকে নিজ নিজ ঘরে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়।
চীনে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে জানুয়ারির ২০ তারিখে “জাতীয় মহামারী ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র” সক্রিয় করে দেয়া হয়। অর্থাৎ রোগী শনাক্ত হওয়ার আগেই তাইওয়ানের প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেন। জানুয়ারির ১০ তারিখ চীনা বিজ্ঞানীরা SARS-CoV-2 এর জিনোম প্রকাশ করলে একদিনের মধ্যেই তাইওয়ানে RT-PCR টেস্টিং এর ল্যাব প্রস্তুত করা হয়। এছাড়া নিরাপত্তা সামগ্রী মজুত করার ক্ষেত্রেও তারা অগ্রসর ছিল। জানুয়ারীর ২০ তারিখ পর্যন্ত সরকারীভাবে প্রায় ৪.৫ কোটি মাস্ক মজুত ছিল ও ১১০০ আইসোলেশন কক্ষ প্রস্তুত ছিল।

(২) শনাক্ত পরবর্তী পদক্ষেপ :

২১শে জানুয়ারী তাইওয়ানে প্রথম COVID – 19 রোগী শনাক্ত করা হয়। এরপর পুরো দেশে সতর্কবার্তা জারী করা হয়। ২৩ জানুয়ারী তারিখে সার্জিকাল মাস্ক রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর শনাক্ত হওয়ার পরবর্তী পদক্ষেপগুলোকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা যায় :

১। বিদেশফেরত নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ:

জানুয়ারির ৩০ তারিখের মধ্যে স্বাস্থ্য ইন্সুরেন্স কেন্দ্র ও অভিবাসন কেন্দ্রের ডাটা সমন্বয় করে একটি বৃহৎ ডেটাবেজ তৈরী করা হয় এবং চীন, হংকং ও মাকাউ ফেরত প্রত্যেক নাগরিকের এয়ারপোর্টে জ্বর, কাশি ইত্যাদি লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করা হয়। সন্দেহভাজন রোগীকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। বাকীদেরকে ডেটাবেজ এ সুস্থ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যেসকল নাগরিক চীন বাদে অন্যান্য দেশ থেকে ফিরেছেন কিন্তু গত ১৪ দিনের মধ্যে চীনে ভ্রমণ করার ইতিহাস আছে তাদেরকেও এই পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়। ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখ এয়ারপোর্টগুলোতে QR code ব্যবস্থা চালু করা হয়। যাদের কোনো ধরনের লক্ষণ ও চীনে ভ্রমণ করার ইতিহাস ছিল না তাদেরকে QR code এর মাধ্যমে দ্রুতগতিতে Clearance দেওয়া হয়।

২। কনট্যাক্ট ট্রেসিং ও টেস্টিং:

তাইওয়ান প্রশাসন শুরু থেকেই ব্যাপকহারে টেস্টিং ও কনট্যাক্ট ট্রেসিং শুরু করে দেয়। বিদেশফেরত নাগরিকদের মধ্যে যাদের লক্ষণ বাড়তে থাকে তাদেরকে RT-PCR এর মাধ্যমে টেস্ট করা হয়। যাদের COVID – 19 পজিটিভ পাওয়া যায় তাদের ক্ষেত্রে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করা হয়। লক্ষণ দেখা দেওয়ার ৪ দিন আগে থেকে পজিটিভ পাওয়ার দিন পর্যন্ত রোগীর সংস্পর্শে আসা প্রত্যেক ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা হয়। যারা রোগীর ২ মিটার বা কাছের দুরত্বে ছিলেন এবং ১৫ মিনিট সংস্পর্শে ছিলন, তাদেরকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং আইসোলেট করা হয়। আইসোলেট করা ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের জ্বর, কাশির মত লক্ষণ দেখা দিয়েছিল, তাদের টেস্টিং করা হয় এবং পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত করা হয়। উপরে উল্লেখিত বৃহৎ ডেটাবেজ ব্যবহার করে যারা জানুয়ারির মধ্যে চীন থেকে ফেরৎ এসেছে, তাদেরকে একটি খুদে বার্তা পাঠানো হয়। খুদে বার্তায় যাদের জ্বর, কাশির মত লক্ষণ ছিল তাদেরকে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে বলা হয় এবং টেস্টিং এর জন্য নির্দিষ্ট কেন্দ্রে আসতে বলা হয়। উল্লেখ্য যে, তাইওয়ানে ফেব্রুয়ারির মাঝখানে প্রায় ২৭ টি ল্যাব প্রস্তুত ছিল এবং প্রতিদিন ৩০০০ এর উপরে পরীক্ষা করা সক্ষমতা ছিল। এছাড়া জানুয়ারির ২১ তারিখের পর থেকে যাদের তীব্র শ্বসনতন্ত্রের রোগের লক্ষণ ছিল এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা পরীক্ষা করার পর নেগেটিভ এসেছিল তাদেরকে আবার COVID – 19 পরীক্ষা করা হয়। তারা শুধু ট্রেসিং ও রোগীদেরকে কোয়ারেন্টিনে রেখেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। স্মার্টফোনের মাধ্যমে তাদের ট্রেস করেছেন, খাবারের ব্যবস্থা করেছেন এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত তাদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করেছেন।

৩। সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিতকরণ:

প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার সময়ে তাইওয়ানে নববর্ষের ছুটি চলছিল। ছুটি ২৮ তারিখ শেষ হওয়ার কথা ছিল কিন্তু ছুটি আরো তিন সপ্তাহ বাড়ানো হয়। ছুটি শেষ হওয়ার পর ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট, শপিং মল বন্ধ করা হয় নি। অর্থাৎ তাইওয়ান কোন ধরনের লকডাউন বাস্তবায়ন করে নি। তবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা গ্রহণ করা হয়েছিল। বাইরে বের হলে মাস্ক পড়া বাধ্যতামূলক ছিল। প্রত্যেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে তাপমাত্রা মেপে সবাইকে প্রবেশ করানো হত। এছাড়া বড় জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়।

২০০৩ সালের সার্স এপিডেমিকের অভিজ্ঞতা কোভিড-১৯ মোকাবেলা করতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। ২০০৪ সালেই তারা মহামারী প্রস্তুতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে এবং জরুরী অবস্থায় পদক্ষেপ নেওয়ার মত অবকাঠামো প্রস্তুত করে রাখে। তাছাড়া তাইওয়ান ছোট আয়তনের একটি দ্বীপ। তাই তাদের পক্ষে দেশব্যাপী ট্রেসিং করা ও কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় করা তুলনামূলক সহজ ছিল। সর্বোপরি বলা যায়, তাইওয়ান প্রশাসন জনগণের সামগ্রিক স্বাস্থ্য অগ্রাধিকার দিয়ে মানবিক পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করতে পেরেছে।

writer: Arafat Saad Khan
B.Pharm. Professional Year – IV
Department of Pharmacy
University of Dhaka

Facebook Comments

Related Articles