লকডাউনের নিরাপদ প্রত্যাহারঃ ভাইরাসের সাথে বসবাস।

নভেল করোনা কোভিড-১৯ আতংকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য জীবন-জীবিকা-অর্থনীতি, বেচেঁ থাকার স্বপ্ন, সব কিছু লকডাউনের শিকলে বন্দি থাকাটা কোন সমাধান নয়। আমরা প্রত্যকেই কখনো না কখনো করোনা কোভিড-১৯ -আক্রান্ত হবো, ঠিক যেমনটি আমরা কখনো না কখনো সাধারণ সর্দি-কাশিতে (কমন-কোল্ড) আক্রান্ত হয়েছি।

একই ভাবে, জীবন কালে কখনো না কখনো আমরা চিকেন-পক্স এ আক্রান্ত হই । যে কোন মেয়াদের লকডাউন কি আমাদের উল্লেখিত সংক্রমনগুলো থেকে মুক্তি দিতে পারে ? উত্তর টি হলো “না”। কেননা, জীবাণু টি যখন ভাইরাস , আর এর বিস্তার যখন হাঁচি/কাশিঁ/বায়ু বাহিত, তখন সংক্রমণ এড়ানোর কোন সুযোগ নেই , ভ্যাকসিনের ব্যবহার ছাড়া। আমরা যে সাধারণ সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হই সেটাও কিন্ত একটি করোনা ভাইরাসের কারনেই।

কিন্তু কভিড-১৯ একটা নুতন ধরনের করোনা ভাইরাস বিধায় আমাদের শরীরে এর বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ (এন্টিবডি) আগে থেকে তৈরী নেই। এজন্য আমরা সহজেই সংক্রমিত হচ্ছি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সংক্রমণ উপসর্গহীন, নিজের অজান্তেই রোগী আক্রান্ত হন এবং নিরাময় লাভ করেন। বড়ো জোর সাধারণ সর্দিকাশিতে ভুগে থাকেন কেউ কেউ। গুরুতর অসুস্থ হচ্ছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অত্যন্ত বয়স্ক, এবং যারা আজমা, ডায়াবেটিস, কীডনি বা হৃদরোগে ভুগছেন। বয়োবৃদ্ধরা কিন্তু ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস ঘটিত নিউমোনিয়াতেও আক্রান্ত হন, মারাও যান। কিন্তু কভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে প্রকোপ (ভিরুলেন্স) অত্যন্ত বেশী, কারন আগেই বললাম, এটি নুতন প্রকৃতির।

এক-দুই বছর পর আমাদের দেশে এই ভাইরাসটির সংক্রমণ ক্ষমতা এবং প্রকোপ (ভিরুলেন্স) ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সমতুল পর্যায়ে নেমে আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। বলা যেতে পারে ভাইরাসের সাথে বসবাস এবং সংক্রমনেই মুক্তি (হার্ড ইম্যুনিটি)। আমেরিকা-ইউরোপের দিকে তাকিয়ে আতংকিত হওয়ার কোন কারন দেখি না। ওদের এথনিক গ্রুপ আলাদা, আবহাওয়া ভিন্ন। ওঁদের ভ্যাক্সিন না দিলে, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস দিয়েও সব বয়সের ক্ষেত্রেই নিউমোনিয়াতে প্রানহানি ঘটে, আমাদের ক্ষেত্রে কিন্তু তা হয় না। কভিড – ১৯ আক্রান্ত হয়ে প্রানহানির পরিসংখ্যান বাংলাদেশে ইউরোপ, আমেরিকার তুলনায় যে অনেক কম (আলহামদুলিল্লাহ) এর পেছনে সম্ভবত এথনিসিটি এবং জলবায়ুর বিভিন্ন নিয়ামকের ভিন্নতাই দায়ী।

কোন র‍্যাপিড ডিটেকশন-কিট ব্যবহার করে মাত্রাতিরিক্ত জনঘনত্বের এই দেশের উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক মানুষকে টেস্টের আওতায় আনতে পারলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যাটি হয়তো অনেক বড় দেখাতো এবং প্রমাণিত হতো বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমনে মৃত্যুহার বর্তমানে অনুমিত মৃত্যুহার অপেক্ষা আরো অনেক কম এবং আমেরিকা ও ইউরোপের তুলনায় নগন্য। এখন দেশ লকডাউনে আছে। দেশের একটি বৃহৎ শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী কর্মহীন হয়ে পড়ায় মৌলিক-চাহিদা মেটাতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন, মানবেতর জীবন যাপন করছেন। দারিদ্রের সাথে রোগ-প্রতিরোধ ও চিকিৎসা-ব্যয় নির্বাহের ক্ষমতার সম্পর্ক বিপরীতমুখী। দৈনিক উপার্জন না থাকায় ক্ষুদে ব্যাবসায়ীবৃন্দ এখন সচ্ছল অবস্থা থেকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীতে পরিনত হয়েছেন। এই মানুষগুলো কারো কাছে হাত পাততে পারেন না। ত্রানের সারিতে দাড়াতে তাঁরা অভ্যস্ত নন। একসময়ে যে মানুষটি দৈনিক ৩০০০ টাকা মুনাফা করে ৫০০ টাকা ব্যয় করতেন নিজের ও পরিবারের ঔষধের খরচের পেছনে তাঁর এখন কোন আয় নেই।

করোনা-ছোবলে দারিদ্র-জনিত চিকিৎসা সংকট এবং মানবিক বিপর্যয়ের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। করোনা-ই একমাত্র প্রানঘাতি রোগ নয়। WHO এবং ICDDR, B এর হিসাব মতে এইদেশে ২০১৮-১৯ সালে বছরে গড়ে যক্ষা, শিশু-নিউমোনিয়া, ও ডায়রিয়াজনিত রোগে যথাক্রমে ৪৭০০০, ১২০০০ এবং১৯০০০ মানুষ মারা গেছেন। নিশ্চয় উল্লেখিত রোগগুলোতে আক্রান্ত হয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঐ বছর চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ্যও হয়েছেন। লকডাউন যদি মানুষকে বুভুক্ষু রাখে, আর্থিক সামর্থ্যকে বিকলাঙ্গ করে দেয়, তাহলে উল্লেখিত রোগগুলোতে প্রানহানীর সংখ্যাও বাড়বে।

কিন্তু এতো ত্যাগের পরেও কোভিড-১৯ এর আখ্যান শেষ হবে না। আমরা অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত লকডাউনে থেকে যেমন সাধারণ সর্দি-কাশি , চিকেন-পক্স ও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস নির্মুল করতে পারবো না, ঠিক তেমনি কভিড- ১৯ এর জন্য ও লকডাউন কোন সমাধান বয়ে আনবে না। তাহলে কি লকডাউনের কোনই কার্যকারিতা নেই ? অবশ্যই আছে, লকডাউনের কারনে হাসপাতাল গুলোতে রোগীর চাপ সামলানো গেছে, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ঘূরে দাড়ানোর সময় পেয়েছে এবং কোভিড-১৯ সনাক্তকরণ কেন্দ্র মাত্র একটি থেকে বিয়াল্লিশটিতে সম্প্রসারিত হয়েছে।

এবার সময় এসেছে এই লকডাউনের কবল থেকে জাতিকে পরিকল্পনা মাফিক নিরাপদে, পর্যায়ক্রমে বের করে আনা এবং বহুল উচ্চারিত হার্ড-ইম্যুনিটির দিকে জনগোষ্ঠীকে নিয়ে যাওয়া। এক্ষেত্রে সরকারকে মহামারী বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, ও চিকিৎসা-ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সংগে আলোচনা করে লকডাউন-মুক্তির কর্মপরিকল্পনা করতে হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালগুলোর সেবাদান সামর্থ্যের সাথে সংগতি রেখে অন্তরবর্তিকালিন বিরতিসহ লকডাউন আরোপ করা যেতে পারে ।

আবার লকডাউন থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে কোন একটি এন্টিবডি-ভিত্তিক র‍্যাপিড-ডিটেকশন কিট ।এই কিটের মাধ্যমে অঞ্চল ভেদে জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধ ক্ষমতা যাঁচাই করে ক্রমে ক্রমে প্রথমে তরুন ও যুবসম্প্রদায় কে ঘর থেকে বের করে আনতে হবে। এছাড়া ইমিউন-নন এমন তরুন/যুবসম্প্রদায় ও যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন তাহলে পরিবেশে মাত্রা-স্বল্প জীবিত (Sub-infection dose ) ও মৃত, উভয় প্রকারের ভাইরাস দিয়ে সংক্রমিত হবেন এবং উপসর্গবিহীন বা অল্প সর্দি- কাশিতে ভুগে দেহে প্রতিরোধে তৈরি করবেন।

প্রথমে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেয়া যেতে পারে। পর্যায়ক্রমে স্কুল ও বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এসময়ে সর্বাত্মক প্রচারণার মাধ্যমে বয়োজ্যেষ্ঠ এবং অন্যান্য ঝুঁকিপুর্ন নাগরিকগনকে ( ডায়াবেটিস /আজমা/কিডণী /হৃদরোগী) সর্বোচ্চ সতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে র‍্যাপিড-ডিটেকশন কিটের মাধ্যমে প্রতিরোধ ক্ষমতা যাঁচাই-জরিপ করে ক্রমে ক্রমে অন্তঃ ও আন্তঃজেলা যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এইভাবে আমাদের জনসমষ্টি ধীরে ধীরে কভিড-১৯ সহিষ্ণু জনসমষ্টিতে পরিনত হবে আমাদের মনে রাখতে হবে কভিড-১৯ ভাইরাসের সাথে বসবাস ও সংক্রমণেই মুক্তি, অন্তত বাংলাদেশে যতদিন কোন ভ্যাক্সিন না আসছে।

লেখাঃ অধ্যাপক ডঃ মোঃ হাসিবুর রহমান ; মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Facebook Comments

Related Articles