বুলবুলের তুলনায় সুন্দরবনের তিনগুণ বেশি গাছ ভেঙেছে আম্ফান

আম্ফানে সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণে বন বিভাগ গঠিত ৪টি কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে

গত বছরের ৯ নভেম্বর আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তুলনায় সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় আম্ফান তিনগুণ বেশি ক্ষতি করেছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের। আম্ফানে বনের ১২ হাজার ৩৫৮টি গাছ ভেঙেছে। আর বন বিভাগের অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। আর বুলবুলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সুন্দরবনের ৪ হাজার ৫৮৯টি গাছ। সেবার বন বিভাগের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৬২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।

আম্ফানে সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণে বন বিভাগ গঠিত ৪টি কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।  রবিবার (২৪ মে) বিকেলে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষকের কাছে প্রতিবেদনগুলো দাখিল করে।

প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে,  আম্ফানের আঘাতে পশ্চিম সুন্দরবনের ২টি রেঞ্জ এলাকায় ১২ হাজার ৩৩২টি গাছ ভেঙে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব গাছের মধ্যে গরানের সংখ্যা বেশি। যার মূল্য ১০ লাখ ১০ হাজার ৫৬০ টাকা।

এছাড়া, স্থাপনা, জেটি, উডেন ট্রেইল, ওয়াচ টাওয়ার ও অবকাঠামোর ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

তবে, আম্ফানে বাঘ, হরিণ কিংবা অন্য কোনো বন্যপ্রাণীর ক্ষতি হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

সেখানে আরও বলা হয়, পূর্ব সুন্দরবনের ২টি রেঞ্জ এলাকায় ২৬টি গাছ ভেঙেছে। এ বিভাগের আওতায় জব্দ থাকা বেশ কিছু কাঠ জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে। এতে আর্থিক ক্ষতি ৭ লাখ ৬ হাজার ৮৩০ টাকা। পাশাপাশি পূর্ব বনবিভাগে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বশিরুল আল মামুন জানান, সুন্দরবন থেকে সব ধরনের গাছ কাটা নিষিদ্ধ রয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত গাছগুলো যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকবে। কোনো গাছ কাটা হবে না।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন জানান, সুন্দরবন নিজ থেকেই বুলবুলের ক্ষতি কাটিয়ে উঠেছে। আম্ফানের ক্ষয়ক্ষতিও সুন্দরবন নিজেই কাটিয়ে উঠবে। আমাদের কেবল বন বিভাগের প্রয়োজনে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোগুলোর মেরামত করতে হবে।

বনবিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মো. মঈনুদ্দিন খাঁন বলেন, সুন্দরবনকে সময় দিলে সিডর, আইলা ও বুলবুলের আঘাতের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো করেই এবারের ক্ষয়ক্ষতিও কাটিয়ে উঠবে।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ২৫ মে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার বিএম ব্যারাক, জেটি-মসজিদ, কটকা রেস্ট হাউস-স্টাফ ব্যারাক, সুপতি-শাপলার জেটি, অফিস ঘর, মরা ভোলার স্টাফ ব্যারাক, পানির ঘাট, ভোলা ও তেরাবেকার টহল ফাঁড়িগুলোর টিনের চালা ঝড়ে উড়ে যায়। বগি স্টেশন সংলগ্ন সড়ক ভেঙে যায় ও ডুমুরিয়া ক্যাম্প অফিস, জেটি, চরখালির স্টাফ ব্যারাক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শরণখোলা রেঞ্জের অধীন ৩৬ হেক্টরের ৩টি বাগান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়। ওই বছরের ৩১ মে পর্যন্ত ৩টি হরিণ ও ১টি শুকরের মৃতদেহ উদ্ধার হয়।

চাঁদপাই রেঞ্জের ঢাংমারি স্টেশনের বিএম ব্যারাক, অফিস ভবন, পন্টুন, করমজলের বিএম ব্যরাক ও কুমির প্রজনন কেন্দ্রের দেয়াল ভেঙে যায়। জোয়ারা ক্যাম্পের বিএম ব্যরাক জেটি, মরা পশুর ক্যাম্প অফিস, হাড়বাড়িয়া ওয়াচ টাওয়ার ও গোল ঘরের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

নাংলীর অফিস, ধানসাগর স্টেশন অফিস ঘর, কলমতেজিল, আমরবুনিয়া, বড়ইতলা, কাঁটাখালি, বদ্ধমারি, আন্ধারমানিক ও হরিণটানা ক্যাম্প ঘর এবং রেঞ্জ সদরের বিএম ব্যারাক ও চাঁদপাই স্টেশন অফিসের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

এছাড়া, বন বিভাগের বিভিন্ন অফিস স্টেশনে রাখা জব্দকৃত বিভিন্ন কাঠ জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায়। পাশাপাশি পশ্চিম বন বিভাগের অভ্যন্তরে সংরক্ষিত ১২টি বড় ও ১৩টি ছোট পুকুরের পানি লবণাক্ত হয়ে যায়। মিষ্টি পানির আধার ধ্বংস হওয়ায় বনের জীবজন্তুসহ জেলে বাওয়ালীরা, পানি ও জলের সঙ্কটে পড়ে। ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির শিকার হয় বনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। আইলার কবলে পড়ে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৬টি জেটি। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৫টি এবং ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে একটি গ্যাংওয়ে। পশ্চিম বন বিভাগের আওতায় সুন্দরবনের ৯টি ষ্টেশনের ৩৫টি টহল ফাঁড়ির মধ্যে ১২টি বিগত ঘূর্ণিঝড় সিডরে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেগুলো সংস্কার করার আগেই আইলার কবলে পড়ে আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

Facebook Comments

Related Articles

Close