ব্লিচিং পাউডারের ব্যবহার এবং কিছু সতর্কতা

ব্লিচিং পাউডারের সাথে যদি ডেটল বা স্যাভলন মিশাই তখন কি হবে?

চলুন প্রথমেই জেনেই নেই ব্লিচিং পাউডার কি এবং এর ব্যবহারঃ
করোনা মহামারীর এই সময়ে ব্লিচিং পাউডার ( Formula: Ca(ClO)2
IUPAC ID: Calcium hypochlorite) সবচেয়ে পরিচিত এবং সহজলভ্য জীবাণুনাশক।

ব্লিচিং পাউডার জীবণুকে ধ্বংস করে। ব্লিচিং পাউডার সাদা রঙের একটি অজৈব পদার্থ । ব্লিচিং পাউডার থেকে ক্লোরিনের ঝাঁজালো গন্ধ পাওয়া যায় । এটি জলীয় বাষ্প শোষণ করে, পানির সঙ্গে আংশিক বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড ও ক্যালসিয়াম হাইপো-ক্লোরাইট উৎপন্ন করে । ব্লিচিং পাউডার অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়ায় ক্লোরিন উৎপন্ন করে ।

ক্লোরিন বিভিন্ন রূপে পানির জীবাণুনাশ করার জন্য বহুল ব্যবহৃত একটি ক্যামিকেল। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে পানিশোধনে ক্লোরিন ব্যবহার শুরুর করার পর সারা বিশ্বে পানিজনিত রোগে মৃত্যূহার অনেক হ্রাস পেয়েছে। একটি ভালো জীবাণুনাশকের অনেক বৈশিষ্ট্যই ক্লোরিনে রয়েছে ।
পানিতে কিছুটা ক্লোরিন তথা ব্লিচিং পাউডার টাইপের গন্ধ থাকে। গৃহস্থালীতে এভাবে পানি শোধন করে সেই পানিকে সামান্য গরম করলেই সমস্ত গন্ধ চলে যাওয়ার কথা। আমাদের দেশে মানুষ পানিতে ক্লোরিন তথা ব্লিচিং-এর গন্ধ পেলে নাক সিটকায়, অথচ উন্নত বিশ্বে বরং এই গন্ধ পেলেই পানি পান করতে নিরাপদ বোধ করে মানুষ, আর সরবরাহকৃত পানিতে ক্লোরিনের গন্ধ না থাকলেই সেই পানি পান করতে ইতস্তত করে।

জীবাণুনাশক হিসাবে পানিকে বিশুদ্ধ করতে ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করা হয়। ক্লোরোফর্ম প্রস্তুতিতে ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করা হয়। কাগজশিল্পে এবং বস্ত্র বিরঞ্জন করতে ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করা হয় ।

বাড়ির আশপাশে ভেজা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় বা টয়লেটের কমোড, ঘরের মেঝে ইত্যাদি জায়গা থেকে জীবাণু ধ্বংস করার জন্য ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করা যায়। ব্লিচিং পাউডারকে যখন ভেজা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় ছিটিয়ে দেওয়া হয় বা টয়লেটের কমোড, বেসিনে দেওয়ার পর পানি যোগ করা হয়, তখন ব্লিচিং পাউডার পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে হাইপোক্লোরাস এসিড (HOCl) এবং ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড উৎপন্ন করে। পরবর্তীতে হাইপোক্লোরাস এসিড ভেঙে গিয়ে জায়মান অক্সিজেন তৈরি করে যা জীবণুকে ধ্বংস করে।

এছাড়া বাসা-বাড়ির নিচতলায় এবং ছাদে পানির ট্যাংকিগুলো পানিতে জীবাণু প্রবেশের অন্যতম পথ। তাই এই ট্যাংকিগুলো এবং ব্যবহারের শুরুতে পুরা পানি সরবরাহ পাইপগুলোকে জীবাণুমুক্ত করে নেয়া জরুরি। অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে একটা জেরিকেনে ব্লিচিং গুলে সেখান থেকে ট্যাংকির পানিতে ফোটায় ফোটায় পড়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নিয়মিতভাবে দৈনিক ফ্রেস ব্লিচিং দ্রবণ দিলে জীবাণুর সম্ভাবনা তো কমবেই, বরং পানি ফুটিয়ে খাওয়ার প্রয়োজনীয়তাও ফুরাতে পারে।

গ্রামাঞ্চলের কিছু জায়গায় এখনও পাতকুয়া বা ইন্দারা খাবার পানির উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এমনকি কোনো কোনো জায়গায় সংরক্ষিত পুকুরের পানিও রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়। এই উৎসগুলোও মাঝে মাঝে জীবাণুমুক্ত করার দরকার হয়ে পড়ে। এই উৎসগুলোতে পানি প্রাকৃতিকভাবে উন্মুক্ত থাকে বলে অবিরত জীবাণুনাশ করা প্রয়োজন। এজন্য এখানকার পানিতে অবিরত স্বল্পমাত্রায় ক্লোরিন বা ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে কলস পদ্ধতির মাধ্যমে পানি জীবাণুনাশ করা হয়।

কিন্তু অনেকের কাছে মনে হতে পারে, ব্লিচিং পাউডারের সাথে অন্য যেকোন পরিষ্কারক (ডেটল, স্যাভলন) কিংবা জীবাণুনাশক (স্যানিটাইজার) মিশিয়ে নিলে এর শক্তি বাড়তে পারে। হয়তো আরও বেশি জীবাণু ধ্বংস হবে।

এই ক্রান্তিলগ্নে এটি নিতান্তই স্বাভাবিক একটি চিন্তা।

কিন্তু না অবশ্যই এটি করবেন না!
যদি করেন তাহলে কি হতে পারে?
স্বল্প পরিসরে কয়েকটি বিক্রিয়া উল্লেখ করছি যেগুলো ব্লিচিং পাউডারের মাধ্যমে সংঘটিত হয়ে থাকেঃ

১। ব্লিচিং পাউডার + সেনিটাইজার (Rubbing alcohol) = বিষাক্ত ক্লোরোফরম ( যা চেতনানাশক ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী)

২। ব্লিচিং পাউডার + ভিনেগার = বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাস

৩। ব্লিচিং পাউডার + গ্লাস ক্লিনার (Ammonia) = ক্লোরো-অ্যামিন ( যার জন্য শ্বাসকষ্ট ও বুকব্যথা হতে পারে)

৪। হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড + ভিনেগার = পার-অক্সি-এসিটিক এসিড (ক্ষয়কারক)

৫। ব্লিচিং পাউডার + হারপিক = বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাস

ব্লিচিং পাউডারের সাথে যে কোন পরিষ্কারক বা জীবানুনাশক মেশালে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাস উৎপন্ন হয়। আর ক্লোরিন গ্যাস যা মাত্র ৩০ সেকেন্ডেই চোখ, ন্যাজাল প্যাসাজ (নাক) এবং ফুসফুসকে মারত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
কেউ যদি মাত্র ৩০ সেকেন্ডও এই গ্যাস নিশ্বাসের সাথে গ্রহণ করে তবে তার ফুসফুস স্বাভাবিক হতে ৭-৮ ঘন্টা সময় লাগবে। এই বিষাক্ত গ্যাস ফুসফুসে ঢোকার সাথে ফুসফুস মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অক্সিজেন নেয়া বন্ধ করে দিবে।এমনকি ভিনেগার (সিরকা/Acetic Acid)ও মেশানো যাবে না ব্লিচিং পাউডারের সাথে।

কোন রাসায়নিক দ্রব্যাদিকেই সাধারণভাবে নেওয়া যাবেনা। না জেনে করা ছোট কোনকিছু থেকেই ঘটে যেতে পারে বড় রকমের দূর্ঘটনা।
নিজে সতর্ক থাকুন, যথাসম্ভব অন্যকে সতর্ক করার চেষ্টা করুন।

মনে রাখবেন সচেতনতা মানে সঠিক জ্ঞান লাভ ও তার চর্চা। তাই জানুন ও অপরকে জানতে সাহায্য করুন।

Facebook Comments

Related Articles