স্বার্থ হাসিল শেষ; এখন থেকে আর করোনা টেস্ট করবেনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

করোনাভাইরাস সংকটে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত করোনাভাইরাস রেসপন্স কো-অর্ডিনেশন কমিটি গত ২৯ মার্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে তিনটি প্রস্তাব জানিয়ে চিঠি দেয়। এতে স্বল্প খরচে আরটিপিসিআর কিট তৈরির সক্ষমতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা করা এবং এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজনে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

প্রায় এক মাস পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন পেয়ে ৫ মে থেকে নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়। এরই মধ্যে জীববিজ্ঞান অনুষদের একদল গবেষক বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে স্থাপিত কোভিড-১৯ গবেষণাগার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পাঁচটি ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করেছেন বলে দাবি করেন। প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থান সাপেক্ষে ধাপে ধাপে আরও ১০০টি ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করা হবে বলেও জানান তারা। এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন তারা আর করোনা টেস্ট করবেনা।

অন্তরালের ঘটনা নিয়ে লিখেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্ল্যানিং ও মনিটরিং সেলের কর্মকর্তা ডাঃ তানভীর আহমেদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখেন,

“বাংলাদেশে করোনা পরীক্ষার ল্যাব একটি থেকে দুটি করে আজ অবধি ৫২ টা চালু হয়েছে। (যার ১৪টা পিসিআর মেশিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের) একেবারে শুরু থেকে আমি এ প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত। এ সময়টার ঠিক মাঝামাঝি পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন ফ্যাকাল্টির ডিন লিখিত আবেদন করে নিজ আগ্রহে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এসে পরীক্ষার অনুমতি নিয়ে যান। এ সময় সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্ট এর কেউ উপস্থিত ছিলেন না। তাদের সাথে মোবাইলে কথা বলে সমস্যা সমূহ সমাধান পূর্বক আমি নির্দিষ্ট জেলা ও কিয়স্ক থেকে স্যাম্পল পাঠানো নিশ্চিত করি। পরেরদিন তারা অভিযোগ তোলে তাদের ল্যাবে বেশি স্যাম্পল পাঠানো হচ্ছে এবং ভাইরাল ট্রান্সপোর্ট মিডিয়ার টেস্টটিউব এর সাইজ বড় ইত্যাদি । এগুলো সমাধান করে দেয়ার কয়েকদিন পরে তারা আবার অভিযোগ শুরু করে স্যাম্পল পাঠানোর সময় নিয়ে, মাস্ক, পিপিই,টেস্টিং কিট নিয়ে এবং হুমকি দিতে থাকে তারা সাংবাদিক সম্মেলন করবে যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের সহযোগিতা করছে না।

আজ তারা ঘোষণা দিয়েছে তারা এখন থেকে আর পরীক্ষা করবে না। মূলত তারা জিনোম সিকয়েন্সিং এর প্রয়োজনে পজিটিভ রোগীদের রক্তের নমূনা সংগ্রহের জন্য ল্যাবটি চালু করেছিল। কিন্তু জনস্বার্থে সেবা দেয়ার ভান করে দেশ ও জাতিকে বিভ্রান্ত করেছে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে যেখানে আমরা সবাই নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে করোনা মোকাবেলায় কাজ করছি সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ল্যাবে প্রায় ১৪ টি আর টি পিসিআর মেশিন থাকা সত্ত্বেও তারা পরীক্ষার কাজে অংশগ্রহণ করছে না। এমনকি শুরুতে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডিতে কোন স্যাম্পল কালেকশন বুথ স্থাপনেও রাজি ছিল না আজ অবধি তা স্থাপিতও হয়নি। বিভিন্ন সমাধানযোগ্য অজুহাতে পরীক্ষা বন্ধ করে তারা মূলত আপন মুখোশটি উন্মোচন করেছেন। এরাই নাকি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর, এরাই নাকি জাতীয় বুদ্ধিজীবী।”

গবেষণাগারে দুটি পিসিআর মেশিনে প্রতিদিন প্রায় চারশ নমুনা পরীক্ষা করা হত। এখন থেকে আর টেস্ট না করার সিদ্ধান্ত গত ২৭ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান একটি গণমাধ্যমকে বলেন, “আমাদের তো এটা হাসপাতাল নয়, এটা বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণায় সময় দিতে হবে। ল্যাবের আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি আমাদের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। এগুলো এখন সেখানে গবেষণার কাজে প্রয়োজন হচ্ছে। সেগুলো এখন জীবাণুমুক্ত করে আবার সেখানে স্থাপন করতে হবে। মূলত এজন্য করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার কাজটা আর করা হচ্ছে না।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় করোনাভাইরাস রেসপন্স টেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়ক শরীফ আখতারুজ্জামান জানান, “কয়েকটি কারণে আমরা আর করোনাভাইরাস স্যাম্পল টেস্ট করব না। আগামীকাল (সোমবার) আমরা এই কার্যক্রম বন্ধ করে দেব। ল্যাব পরিচালনা করতে প্রতিমাসে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে, যা বহন করা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে কঠিন এবং বাড়তি চাপ।

“তাছাড়া যারা কাজ করছে, তাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। ভলান্টিয়ারদের অন্তত কিছু প্রণোদনা দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানিয়েও কোনো সাড়া পাইনি।”

Facebook Comments

Related Articles

Close