মেডিকেলের ছাত্রী ও তার পরিবারের সাথে পুলিশের দলবদ্ধ লোমহর্ষক অত্যাচার!

শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ও তার পরিবারের সাথে সার্কেল এসপি, থানার ওসির নেতৃত্বে পুলিশের বিরুদ্ধে লোমহর্ষক শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য সহ দায়িত্বশীল লোকেরা সেটি আমলে নিয়ে ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছেন।

মেডিকেলের শিক্ষার্থীর নিজ ভাষায় সে রাতের ঘটনা তুলে ধরা হলোঃ

“আমি তাসমিম জেরিন তন্না, শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ,জামালপুর এর ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী, বাড়িঃ গ্রাম+থানা টংগীবাড়ি, জেলা
মুন্সিগঞ্জ। আমাদের বাড়িতে টংগীবাড়ি থানার একজন কনস্টেবল, তানজিল হোসেন ভাড়া থাকেন যে কিনা করোনার এই সময়েও ঠিক মত নিজের এবং আমাদের সেফটি মেইনটেইন করে চলতো না। যখন তখন তার বাড়িতে বাইরের অনেক মানুষ আসা যাওয়া করতো যাদের কেউ ই করোনা প্রতিরোধের নিয়ম কানুন মেনে আসা যাওয়া করতো না। তানজিলকে এর আগেও অনেক বার বলার পরও সে করোনা প্রতিরোধের নিয়ম কানুন মানেনি বরং আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করেছে। গত ১৪ মে,২০২০ আনুমানিক বিকেল ৫:৩০ টার দিকে কনস্টেবল তানজিল বাইরের একজন মানুষ কে তার মোটর সাইকেলে করে নিয়ে আসে যার কোন মাস্ক বা কোন ধরনের সেফটি মেইনটেইন করা ছিলনা। আমার বাবা আহসান কবীর খান টংগীবাড়ির সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান এবং আমার মা ঐ সময়ে বাসার সামনের পুকুরপাড়ে বসে দুইজনে কথা বলছিলেন। আমার বাবা তখন তানজিল কে খুব নরম সুরে মাস্ক না পড়া নিয়ে বলেন, “তানজিল তুমি যে বাইরের থেকে একজন লোক এনেছো, সে তো মাস্ক পড়েনি, আমাদের বাড়িতে এতোগুলো মানুষ, বাচ্চা রা বাইরে খেলাধুলা করে,এটা তো ঠিক না”।

এর উত্তরে তানজিল খুব উদ্ধত আচরণ করে আমার বাবার দিকে এগিয়ে আসেন এবং বলেন, “আপনি কে বলার,আপনার কথায়বআমি চলি নাকি।” আমার বাবা যেহেতু কিছুদিন আগে মিনি স্ট্রোক করেছেন এবং তার হার্টে রিং বসানো,আমার মা ভয় পেয়ে তাদের দুইজনের মাঝে গিয়ে দাড়ান এবং তানজিল কে বলেন,”তুমি বেয়াদবি করছো কেন,উনি একজন মুরুব্বি মানুষ”, উল্লেখ্য আমার বাবার বয়স ৬০ ঊর্ধ্ব।

তানজিল তখন আমার মা কে “কুত্তার বাচ্চা তুই কে” বলে তার কাধে ধাক্কা দিয়ে তাকে ফেলে দেয় এবং আমার বাবা কে মারার জন্য হাত বাড়ালে, আমার ভাই মোঃ নাসের খান,দৌড়ে এসে তানজিল কে ধরেন, সে আমার ভাইকে তখন অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে তার মুখে ঘুষি বসালে আমার ভাইয়ের ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ে। এরপর সে আমার ভাইয়ের গলা চেপে ধরলে, বাড়ির প্রায় ৮/৯ জন মানুষ তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলে, তানজিল বলে “আজকে তোরে মাইরাই ফেলুম”। এরপর সবাই ছাড়ানোর জন্য বলে না ছাড়লে কিন্তু সে মার খাবে। এরপর অনেক কষ্টে তানজিল কে ছাড়ানো হলে তাকে তার নিজ ঘরে পাঠানো হয়।এরপর আমার ভাইকে হাসপাতালে পাঠিয়ে আমার বাবা থানার ওসি শাহ মো. আওলাদ হোসেন সাহেব কে ফোন করে সব জানায়।

ওসি সাহেব ইফতারের কিছুখন আগে আমাদের বাড়িতে আসেন এবং সব কথা শুনে আমাদের উপর দোষ চাপান আর বলেন যে তানজিল self defense এ আমার মায়ের গায়ে হাত উঠায় অথচ আমার মা যার বয়স কিনা প্রায় ৫৪,তিনি প্রায় ৬ ফুট এর কাছাকাছি লম্বা তানজিল এর গায়ে স্পর্শ ও করেননি। ওসি সাহেব আমার মা কে উদ্দেশ্য করে বলেন, হাউজ ওয়াইফ বাইরে কি করে, সে থাকবে ঘরের ভেতরে। তিনি আমার বাবা কেও আজেবাজে কথা বলে উত্তেজিত করার চেষ্টা করেন। তখন আমার বোন এসে উনার সাথে কথা বলতে চাইলে, উনি তার সাথে খারাপ আচরণ করেন এবং আমাদের হুমকি দেন, “আপনাদের আমি দেখিয়ে দিব আমি কি জিনিস” এই কথা বলে উনি তানজিল কে নিয়ে চলে যান।

এরপর আমার বোন রত্না কবীর, মুন্সিগঞ্জের সদরের এসপি সাহেব কে ফোন দিয়ে সব জানালে তিনি আশ্বস্ত করেন যে তিনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এরপর রাত আনুমানিক ৮ : ৩০ টার দিকে আমাদের বাসায় সার্কেল এসপি রাকিবুল ইসলাম আসেন এবং আমাদের সবার কথা শুনে তিনি আমাদের কাছে তার কনস্টেবল এর হয়ে মাফ চান এবং বলেন, “আমি বাংলাদেশের আড়াই লাখ পুলিশের পক্ষ থেকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য আপনাদের কাছে মাফ চাচ্ছি।” আমার বাবা জিডি করতে চাইলে তিনি বলেন, ” আমি ই আপনাদের জিডি, আমার জিম্মায় আপনারা ব্যাপার টা ছেড়ে দিন।ও একজন ছোট কর্মচারী, ওর চাকরি নিয়ে টানাটানি লাগবে পরে। আমার উপর একটু ভরসা রাখেন,আমি দেখতেসি ব্যাপার টা।এরপর কোন সমস্যা হলে ওসি কে বলার দরকার নাই,directly আমাকে ফোন দিবেন।” আমরা তাকে আসার জন্য ধন্যবাদ জানাই এরপর তিনি চলে যান। আমরাও এসপি সাহেবেকে সম্মান করে আর মানবিক দিক দিয়ে চিন্তা করে আর জিডি করিনি, কোন আইনী পদক্ষেপ ও নেইনি। উল্লেখ্য যে, এসপি সাহেব যখন আমাদের জিজ্ঞেস করেন আমারা কি চাই কিনা তানজিল বাড়ি ছেড়ে দিক তখন আমরা এসপি সাহেব কে বলেছি যে তানজিল বাড়িতে থাকুক, কিন্তু তাকে সেফটি মেইনটেইন করতে হবে এবং তিনি বাইরের লোক এভাবে আনতে পারবেন না।

এরপর রাত আনুমানিক ১ : ৩০ টার দিকে সার্কেল এসপি, থানার ওসি এবং ডিবি পুলিশসহ প্রায় ২৫-৩০ জন পুলিশ নিয়ে আমাদের বাড়ি ঘেড়াও করেন আর দরজা খুলতে বলেন, না খুললে দরজা ভেঙ্গে ফেলার হুমকি দেন। আমার বাবা কারন জিজ্ঞেস করলে বলেন, তারা কথা বলতে এসেছেন। আমরা দরজা খুলার সাথে সাথে তারা ঘরে ঢুকে আমাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় আর একে একে আমার বাবা, ভাই, বোন, মা এবং আমাকে ধরে নিয়ে বাসা থেকে বের করেন। আমার ভাইকে বাসা থেকে তারা মারতে থাকে, আমার বাবা কেন মারছেন বললে তাকেও আঘাত করেন আর ডিবি পুলিশ হুমকি দেয় যে কথা বললে ক্রস ফায়ার দিয়ে দিবে। আমার মা আর বোনকে তারা টানা হ্যাচড়া করে মারতে মারতে নিতে থাকে। আমাকে মহিলা পুলিশ ধরলেও আমার পিঠে ঘারে কোমড়ের নিচে পুরুষ পুলিশ আঘাত করে। আমি মারছেন কেন,আমরা তো যাচ্ছি বললে, তারা বলে শব্দ করলে গলা টিপে মেরে ফেলবো। আমি আমার গায়ের ওড়না ঠিক করতে চাইলে, টংগিবারি থানার পুলিশ এস আই বলে,” মা*** ওড়না ফালায় দে”। ওসি সাহেব যখন আমাদের বাসায় এসেছিলেন, তখন তাকে বলেছিলাম আমরা শিক্ষিত মানুষ, এর জের ধরে তিনি বলেন, “শিক্ষা ওদের পাছায় লাঠি দিয়ে ভরে দে।” এরপর থানায় নিয়ে তারা আমার ভাইকে আরো মারে, আমাকেও চড় থাপ্পর দিয়ে আমার চশমা ভেঙে ফেলে। আমি বার বার আকুতি করি যে আমি চশমা ছাড়া চোখে দেখিনা। থানায় নিয়ে মহিলা পুলিশ আমার thigh, inner thigh, mons pubis এ লাঠি দিয়ে আঘাত করে। এরপর ওসি সাহেব ভিডিও অন করে আমাদের বলতে বলে যে তারা আমাদের মারেনি। এরপর আমার মা ও আমাকে জোর করে থানা থেকে বের করে দেয়। এরপর আমার বাবা, ভাই, বোন এবং আমার ছোট কাকা কে আসামী দিয়ে একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করে রাত ২: ৩০ টার মধ্যে আমার বাবা আর ভাইকে ডিবি পুলিশের গাড়ি দিয়ে মুন্সিগঞ্জের সদর থানায় পাঠিয়ে দেন আর আমার বোন কে ২ ঘন্টা জেরা করার পর একটা কাগজে সাইন করার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ার কথা বলেন।

আমার বোন তার আড়াই বছরের বাচ্চার কথা চিন্তা করে সাইন করে চলে আসে। আসার সময় ওসি সাহেব আমাদের কে হুমকি দেন যে, আমরা এসব ব্যাপার কাউকে বললে আরো খারাপ হবে,হিতে বিপরীত হবে। এরপর আমরা ১৫ মে ২০২০, কোর্টে ভাই আর বাবার জামিন এর জন্য আপিল করলে শুধু ভাইয়ের জামিন হয়। এরপর আমার ভাইকে মুন্সিগঞ্জের সদর হাসপাতালে ভর্তি করতে গেলে আমরা দেখি কনস্টেবল তানজিল এক হাতে ডাব আরেক হাতে ব্যাগ নিয়ে সুস্থ ভাবে হেটে বেড়াচ্ছে অথচ ওসি সাহেব বলেন আমরা নাকি তাকে মেরে রক্তাক্ত করে ফেলেছি।

গত ৩১ মে ২০২০ আমার বাবার জামিন হয়।
আমার পরিবার একটি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে যে অত্যাচারের মধ্য দিয়ে গেছে এবং আমি একজন মেয়ে, একজন শিক্ষার্থী আর আসামী না হয়েও যে মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার সহ্য করেছি এর বর্ণনা ভাষায় প্রকাশে আমি অক্ষম। প্রশাসন তো জনগণের জন্য অথচ আমাদের থানা প্রশাসন যে দৃষ্টান্ত দিয়েছে তাতে তাদেরকে ১৯৭১ এর পাক বাহিনীর উত্তরসুরী মনে হয়।
আমি এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছি এবং আশা করছি আপনারাও এ অন্যায় মেনে নিবেন না।”

এই স্ট্যাটাস দেওয়ার পর এটি ভাইরাল হয় এবং কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেই শিক্ষার্থী এ নিয়ে আরো একটি পোস্ট দিয়ে সে ব্যাপারে আজ জানিয়েছেন। তিনি লিখেন,

“আসসালামু আলাইকুম, আমি তাসমিম জেরিন তন্না, শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ, জামালপুর এর ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী।

আমি প্রথমেই আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ জানাই আপনাদের সহযোগিতার জন্য। গতকালই আপনাদের সকলের সহযোগিতায় আমার এবং আমার পরিবারের উপর হওয়া নির্যাতনের কথা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মন্ত্রণালয় সহ দেশের মানুষ জেনেছেন। ইতিমধ্যে টংগীবাড়ি থানার ওসি শাহ মোঃ আওলাদ হোসেনকে টংগীবাড়ি থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আমাদের মুন্সিগঞ্জের ২ নং আসনের এমপি মহোদয় অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন ও মুন্সিগঞ্জের পুলিশ সুপার মহোদয় আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে এ অন্যায়ের বিচার এর কাজ চলছে, এর সাথে সংযুক্ত সকলের বিচার হবে এবং তারা উপযুক্ত শাস্তি পাবে।
আমি আশাবাদী যে প্রশাসন থেকে আমরা ন্যায় বিচার পাবো।বিচার এখনো সম্পুর্ন নয় তবে প্রক্রিয়াধীন।

আমি আবারো আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমার পাশে দাড়ানোর জন্য।
আমি আপনাদের কাছে খুবই কৃতজ্ঞ।”

Facebook Comments

Related Articles