সামাজিক নিরাপত্তায় নগর–দরিদ্রদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন

কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় যে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলো, এর মধ্যে ঢাকার মানুষ নানা নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। পাড়ায় বা বড় রাস্তার মোড়ে যাঁরা জুতা সেলাই ও পলিশ করেন, তাঁরা কখনো হাত পেতে বলতে পারেন, ‘মামা, এক কেজি চাল কেনার টাকা দেন।’ এমন কথা অনেকেই কখনো ভাবেননি। জরুরি প্রয়োজেন বা অন্য কোনো কারণে যাঁরা বের হয়েছেন, তাঁরা সবাই কমবেশি এই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন।

সাধারণ ছুটির সময় শহরে কাজ ছিল না। আর তাই শহরের দরিদ্র, অরক্ষিত ও দারিদ্র্যসীমার ওপরে বাস করা মানুষের আয়ও ছিল না। এতে সাধারণ ছুটির সময়ে অনেক নিম্নবিত্তের মানুষকেও রাস্তায় নেমে হাত পাততে হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে যা হয়তো তাঁদের কাছে অকল্পনীয়।

কোভিড-১৯-এর প্রভাবে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। কাজ হারানোর কারণে যেসব মানুষ কোনোরকমে দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকত, তাদের একটি অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। বিশেষ করে বিশ্বের বড় শহরগুলোতে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শহরে মানুষের কাজ না থাকলে আয়ও থাকে না। অনেকেই রিকশা চালিয়ে বা সবজি বিক্রি করে দারিদ্র্যসীমার ওপরে মাথা জাগিয়ে রাখতেন। সাধারণ ছুটির মধ্যে তা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতিতে দেশে ৭৪ শতাংশ পরিবারের আয় কমে গেছে বলে ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে। ঢাকা শহরে সাধারণ সময়ে একজন রিকশাচালক ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা আয় করতেন, সাধারণ ছুটির সময়ে তা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় নেমে আসে। তবে সরকার জরুরি ভিত্তিতে এই মানুষদের ত্রাণ দিয়েছে এবং শহরের সচ্ছল মানুষেরাও তাঁদের সহযোগিতা করেছে।

এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিসর বাড়াতে যাচ্ছে সরকার। চলতি অর্থবছরে যেখানে ৭৪ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেখানে আগামী অর্থবছরে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

কিন্তু সাধারণত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নগর–দরিদ্রদের লক্ষ্য করে প্রণীত হয় না, এর লক্ষ্য গ্রামীণ দরিদ্র মানুষ। জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তাকৌশলে বলা হচ্ছে, বিদ্যমান কর্মসূচিতে নগরের দরিদ্ররা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে তাদের জন্যও পৃথক কর্মসূচি থাকা দরকার। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রণীত হয় শুধু দরিদ্রদের কথা মাথায় রেখে। অরক্ষিত মানুষদের কথা বিবেচনা করা হয় না। মহামারির মতো দুর্যোগের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয় না।

গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র মানুষ সাধারণত মানুষ বাড়ির পাশে কলা-মুলা-মরিচ-বেগুনসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ করে খাদ্যের সংস্থান করতে পারে। যারা মূলত গ্রাসাচ্ছদনের জন্য চাষাবাদ করেন, তাঁরাও এই দুর্যোগের সময় খাদ্যের অভাবে পড়েননি। কিন্তু নগর–দরিদ্রদের এই সুযোগ নেই। আর সে জন্যই সম্ভবত তথাকথিত লকডাউনে এত শিথিলতা দেখা গেছে। আর যখন রোগাক্রান্ত হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি, তখনই সব খুলে দেওয়া হলো।

বিশ্লেষকেরা বলেন, নগর–দারিদ্র্য বহুমুখী। বাসস্থান, সুপেয় পানি, পয়োনিষ্কাষণ, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা—এসব চাহিদা মেটাতে নগর–দরিদ্রদের হিমশিম খেতে হয়। অন্যদিকে তাদের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসার একটি সমস্যা হলো, তারা সাধারণত এক জায়গায় থাকে না। কে কোথায় থাকে, এর হিসাবও থাকে না। আবার শহরে সমস্যা হলো গ্রামে চলে যায়। সে জন্য ভারতের আধার কার্ডের মতো সমন্বিত ব্যবস্থা থাকলে এই সমস্যা দূর করা যায়। এতে একজনের একাধিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশা বলেন, জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির (এনএসএসএস) দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। এনএসএসএসএ-তে বর্ণিত জীবনচক্র–পদ্ধতির মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় ঢেলে সাজানো দরকার। সামাজিক নিরাপত্তাজালের পরিধি শহরাঞ্চলে বাড়াতে হবে। বস্তি এলাকার দরিদ্র পরিবার, বিশেষ করে শিশুদের এর আওতায় আনতে হবে। এ জন্য বিশেষ কর্মসূচির দরকার, বাজেটে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে। সরকারের বিভিন্ন ভাতায় সুনির্দিষ্টভাবে বস্তিবাসী ও ভাসমান জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত ও অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি, যা এই মুহূর্তে অনুপস্থিত।

গত কয়েক বছরে দেশে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরে জিডিপির ২ দশকি ৫৮ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের পেনশন ও শিক্ষাবৃত্তিও এর আওতায় পড়ে, যা বাদ দিলে এটা দাঁড়ায় ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এ দুটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষেকেরা বলেন, এ দুটি বাদেই সামাজিক নিরাপত্তা খাতে জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া উচিত, মোট ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ।

জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তাকৌশলে বলা হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রচলনের উদ্দেশ্য কেবল দারিদ্র্য মোকাবিলাই নয়, যেসব ঝুঁকি, অভিঘাত ও সংকটের কারণে মানুষ সহজেই দারিদ্র্যের শিকার হতে পারে বা আরও গভীর দারিদ্র্যে পতিত হতে পারে, সেগুলো থেকে তাদের সুরক্ষা দেওয়াও এর উদ্দেশ্য। যেমন অসুস্থতা অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অর্থনেতিক মন্দাজনিত যৌথ অভিঘাতের মতো কিছু সংকট আছে, যেগুলো যেকোনো সময় আঘাত হানতে পারে। এ ছাড়া রয়েছে সেসব ঝুঁকি, যা একজন ব্যক্তি তার জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে (জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত) মোকাবিলা করে থাকে। জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তাকৌশলেই বলা হয়েছে, জীবনচক্রের ঝুঁকি মোকাবিলা করতেই বিভিন্ন দেশে সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

বর্তমানে দেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ১২৫টি কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয় পেনশন, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং বা ভিজিএফে।

Facebook Comments

Related Articles