কবি-সাহিত্যিকেরা যখন ক্রিকেটার

আজ থেকে ১২০ বছর আগে দক্ষিণ লন্ডনে দেখা হয়েছিল দুই চিকিৎসকের।

তাঁদের একজনের বয়স তখন ৫২, পাস করেছেন ব্রিস্টল মেডিকেল স্কুল থেকে। তাঁর চেয়ে বছর দশেকের ছোট অন্যজন, ওই ভদ্রলোক ছিলেন এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল স্কুলের ছাত্র। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুনাম ছিল একজনের, অন্যজন চক্ষুবিশেষজ্ঞ। ৫০ পেরোনো ভদ্রলোক তত দিনে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত রয়্যাল কলেজ অব সার্জনের (এমআরসিএস) সদস্য হয়ে গেছেন, অন্যজন মাত্র ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় দ্বিতীয় বোয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এসেছেন চিকিৎসক হিসেবে।

২৫ আগস্ট, ১৯০০ সালে আপার নরউডের ক্রিস্টাল প্যালেস পার্কে তাঁদের সাক্ষাতে অবশ্য চিকিৎসাসংক্রান্ত কোনো ব্যাপারে ছিল না। তাঁরা মুখোমুখি হয়েছিলেন একটি ক্রিকেট ম্যাচে! বয়স্ক ভদ্রলোক খেলছিলেন লন্ডন কাউন্টি ক্লাবের হয়ে। অন্যজন ছিলেন প্রতিপক্ষ মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) দলে।

ঘটনাটা ঘটল ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে। লন্ডন ক্রিকেট ক্লাবের ওপেনার মেডিসিনের চিকিৎসক ভদ্রলোককে আউট করা যাচ্ছে না কিছুতেই। ১৫টি চারে ১১০ রান হয়ে গেছে তাঁর। কিছু একটা করা দরকার—এই ভেবে এমসিসি অধিনায়ক চক্ষুবিশেষজ্ঞ নিজেই বল তুলে নিলেন হাতে। অফ স্টাম্পের ওপর হাফ ভলি বল, ফিল্ডারদের বেশির ভাগও অফ সাইডে। বুড়ো চিকিৎসক ভাবলেন অন সাইডে সুইপ করবেন। ব্যাটে-বলে হলো না। ওপরের কানায় লেগে বল গেল উইকেটরক্ষকের হাতে। ঠিক সেই মুহূর্তে জন্ম হলো ক্রিকেট কুইজের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রশ্নটার।

‘প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের একমাত্র শিকার কে?’

উত্তরটা আজকাল আর কারও অজানা বলে মনে হয় না। বুড়ো সেই চিকিৎসকের নাম—ডব্লু জি গ্রেস!

শার্লক হোমসের স্রষ্টা হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে যিনি অমর হয়ে আছেন, তিনি নিজেও বোধ হয় ক্রিকেটার পরিচয়টা খুব বেশি প্রকাশ করতে চাইতেন না। নইলে কোনান ডয়েলের ৫৬টি ছোটগল্প আর ৪টি উপন্যাস মিলিয়ে ক্রিকেটের প্রসঙ্গ মাত্র দুইবার আসবে কেন! তা-ও খুব সাদামাটাভাবে। ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব প্রিয়রি স্কুল’ গল্পে একটা ক্রিকেট ক্যাপের কথা এসেছে, আর ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব থ্রি স্টুডেন্টস’ গল্পে এক ছাত্রকে দেখা যায় তার কলেজের হয়ে ক্রিকেট খেলতে। কোনান ডয়েলের পুরো সাহিত্যকর্মে ক্রিকেট স্রেফ এটুকুই!

অথচ খুব ভালো ক্রিকেটার না হলেও ক্রিকেটটা তিনি লেখালেখির চেয়ে কম ভালোবাসতেন না। ১০ ম্যাচের প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারে ২৩১ রান করা ডয়েল ক্রিস্টাল প্যালেস পার্কে সেদিন কিংবদন্তি ডব্লু জি গ্রেসকে আউট করে এতটাই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন যে পরে এটা নিয়ে রীতিমতো ৭৬ লাইনের একটা কবিতাও লিখেছিলেন। এমনকি ধারণা করা হয়, ‘শার্লক হোমস’ নামটিও আসলে নটিংহ্যামশায়ারের এক ক্রিকেটারের নাম থেকে নেওয়া। শার্লকের বড় ভাই মাইক্রফট হোমসের নামও এসেছে ডার্বিশায়ারের এক ক্রিকেটারের নাম থেকে।

ডয়েলের ক্রিকেটপ্রেম এখানেই শেষ নয়। ১৮৯১ সালে বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার-সাহিত্যিক মিলে গড়ে তুলেছিলেন ‘অথারস ক্রিকেট ক্লাব’, ডয়েল সেটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ক্লাবের অন্য সদস্যদের নাম শুনবেন? টেডি বিয়ার ‘উইনি দ্য পুহ’-এর স্রষ্টা অ্যালান আলেকজান্ডার মিলনে, দলের সবচেয়ে ভালো ফিল্ডার মনে করা হতো তাঁকে। ছিলেন ক্যারি অন, জিবস-এর লেখক পি জি উডহাউজ, অলরাউন্ডার হিসেবে যাঁর খ্যাতি ছিল সতীর্থদের মধ্যে। ‘পিটার প্যান’-এর স্রষ্টা জে এম ব্যারি অবশ্য বাকিদের মতো এত ভালো ছিলেন না, তবে খেলাটা এত ভালোবাসতেন যে তাঁকে একাদশে রাখতেই হতো সব সময়। এঁরা প্রায় দুই দশক নিয়মিত প্রীতি ম্যাচ খেলেছেন। এ রকমই একটা প্রীতি ম্যাচে ডয়েলের সেঞ্চুরি করা ব্যাটটা এখনো আছে লর্ডসের জাদুঘরে।

মূল দলটা ভেঙে যাওয়ার প্রায় ১০০ বছর পর ২০১২ সালে ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক নিকোলাস হগের নেতৃত্বে আবার পুনর্গঠিত হয় ‘অথারস ক্রিকেট ক্লাব’। এরপর থেকে তাঁরা আবার প্রীতি ম্যাচ খেলছেন। কখনো সাংসদদের দল, কখনো অভিনেতা বা রাজপরিবারের সদস্যদের বিপক্ষে।

সাহিত্যিক-ক্রিকেটার নিয়ে যেহেতু গল্প হচ্ছে, স্যামুয়েল বেকেটের নামটা না বললেই নয়। ওয়েটিং ফর গডোখ্যাত আইরিশ ঔপন্যাসিক সাহিত্যে নোবেল পান ১৯৬৯ সালে। তবে তারও প্রায় চার দশক আগে ডাবলিন বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে যে দুটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচও খেলেছেন বেকেট, সেটা অনেকেরই হয়তো অজানা। ইতিহাসের একমাত্র নোবেলজয়ী প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার হিসেবে বেকেট স্মরণীয় হয়ে থাকবেন সব সময়।

ঔপন্যাসিকেরা ক্রিকেট খেলবেন, কবিরা পিছিয়ে থাকবেন কেন! সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইংলিশ কবি মনে করা হয় যাঁকে, সেই লর্ড বায়রন ক্রিকেট খেলেছেন নিয়মিত। ডান পায়ের পেশি ও অ্যাঙ্কেলে জন্ম থেকে সমস্যা ছিল রোমান্টিক কাব্যান্দোলনের পুরোধা এই কবির। কিন্তু সেটি তাঁর ক্রিকেটপ্রেমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। লর্ডসে ১৮০৫ সালে ইটনের বিপক্ষে হ্যারোর প্রথম ম্যাচেই খেলেছেন হ্যারোর হয়ে। খুব একটা ভালো ক্রিকেটার অবশ্য ছিলেন না ডন জুয়ান-এর লেখক। পায়ের জন্মগত সমস্যার কারণে তাঁকে দলে নিতে চাইতেন না অধিনায়কেরা।

আরেক নোবেলজয়ী নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টারের কথা না বললেই নয়। তিনিও খুব একটা ভালো ক্রিকেটার ছিলেন না। শখ করে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতেন। প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলেননি। তবে পিন্টারের ক্রিকেটপ্রেম ছিল ভীষণ। যেকোনো লেখায় ক্রিকেটের উপমা দিতে ভালোবাসতেন। ইয়র্কশায়ার ক্রিকেট ক্লাবের সমর্থকেরা মিলে গড়ে তুলেছিলেন ‘গাইয়েটিস ক্রিকেট ক্লাব’ নামে একটি সংঘ, পিন্টার ছিলেন সভাপতি। ক্রিকেট এতটাই তাঁর জীবনজুড়ে যে ছিল একবার বলেছিলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীতে যে কয়েকটি ভালো জিনিস সৃষ্টি করেছেন, ক্রিকেট তার মধ্যে সেরা। এটা এমনকি যৌন সম্ভোগের চেয়েও আনন্দময়।’
ক্রিকেট কতটা ভালোবাসলে এ কথা বলা সম্ভব!

Facebook Comments

Related Articles