১০ গুণ দামে গগলস, ৫ গুণ দামে পিপিই; অস্বাভাবিক খরচের প্রস্তাব কেনাকাটায়!

দেশের স্বাস্থ্য খাত কতটা নড়বড়ে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর তা উন্মোচিত হয়েছে। এমন বাস্তবতায় বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে পিপিই, ভেন্টিলেটর, মাস্ক, গগলসসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু এসব স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনায় যে খরচ ধরা হয়েছে, তা বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।

করোনা সংকট মোকাবেলায় স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কিনতে এখন পর্যন্ত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় দুটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ১১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ঋণ দিচ্ছে ৮৫০ কোটি টাকা। বাকি ২৭৭ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কিনতে আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে এডিবির অর্থায়নে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ ধরা হয়েছে এক হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে এডিবির ঋণ ৮৫০ কোটি টাকা। বাকি ৫১৫ কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। এরই মধ্যে দুটি প্রকল্পের কাজও শুরু হয়েছে।

একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্প দুটিতে আছে ব্যাপক ত্রুটিবিচ্যুতি। টাকা খরচের ক্ষেত্রে আছে দ্বৈততা। অর্থ অপচয়ের আছে প্রচুর সুযোগ। প্রকল্প দুটিতে যে খরচ দেখানো হয়েছে, তাতে আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনও। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি। খরচ কমানো যায়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া ‘করোনাভাইরাস মোকাবেলায় জরুরি সহায়তা’ শিরোনামের প্রকল্পটির আওতায় এক লাখ সেফটি গগলস কেনা হবে। প্রতিটি সেফটি গগলসের দাম ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা। মোট খরচ ধরা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। অথচ বর্তমান বাজারে প্রতিটি সেফটি গগলস বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকায়। এই প্রকল্পের আওতায় মোট এক লাখ সাত হাজার ৬০০ পিপিই কেনা হবে। যার প্রতিটির জন্য খরচ ধরা হয়েছে চার হাজার ৭০০ টাকা। পিপিই কেনায় মোট খরচ হবে ৫০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। অথচ বর্তমান বাজারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সব শর্ত মেনে ওষুধ অধিদপ্তরের সব শর্ত অনুসরণ করে বিভিন্ন কম্পানির তৈরি ভালো মানের পিপিই বিক্রি হচ্ছে এক থেকে দুই হাজার টাকায়। এই প্রকল্পের আওতায় ৭৬ হাজার ৬০০ জোড়া বুট শু কেনা হবে। প্রতিটি শুর খরচ দেখানো হয়েছে এক হাজার ৫০০ টাকা। এই খাতে খরচ ধরা হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। দেশে বর্তমান বাজারে বুট শু ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় মিলছে।
জানতে চাইলে বেক্সিমকো ফার্মার চিফ অপারেটিং অফিসার রাব্বুর রেজা বলেন, ‘জিএসএম ৭০’ পিপিই দেশের বাজারে এখন বিক্রি হচ্ছে এক হাজার টাকায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ওষুধ অধিদপ্তরের সব শর্ত মেনেই মানসম্পন্ন পিপিই উৎপাদন ও সরবরাহ করছে বেক্সিমকো।

পিপিই ও গগলস উৎপাদক প্রতিষ্ঠান সফট-বাংলার স্বত্বাধিকারী কুদরত এলাহী লিটন জানান, প্রতিটি পিপিইর দাম এক থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে। এসব পিপিই আন্তর্জাতিক মানের। দুই হাজার টাকার বেশি কোনো পিপিই নেই। এ ছাড়া প্রতিটি ভালো মানের সুরক্ষা গগলস বিক্রি হয় ৫০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে।

এমন খরচের হিসাব দেখে বিস্মিত পরিকল্পনা কমিশনও। কিন্তু দেশের এই ক্রান্তিকালে প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন দরকার, তাই চিকিৎসা সরঞ্জামের তুলনায় এসব খাত অনাবশ্যক হওয়া সত্ত্বেও প্রকল্পটি অনুমোদন করতে হয়েছে কমিশনের কর্মকর্তাদের।

জানা গেছে, এডিবির অর্থায়নের প্রকল্পের আওতায় অগ্রগামী যোদ্ধা চিকিৎসক ও নার্সদের ঝুঁকিভাতা হিসেবে ৩৩৫ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। অথচ সরকার সরকারি কর্মকর্তাদের করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে পদ অনুযায়ী প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। এখানেও দ্বৈততা দেখা যাচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প দুটির পরিচালক (পিডি) অধ্যাপক ড. ইকবাল কবির বলেন, ‘চিকিৎসক ও নার্সদের ঝুঁকিভাতা হিসেবে আমরা যে টাকা ধরেছি, সেটা প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে চিকিৎসক ও নার্সদের ঝুঁকিভাতা দেওয়া হবে।’ বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে পিপিইর দামের ফারাকের বিষয়ে জানতে চাইলে ড. ইকবাল কবির বলেন, ‘কডিভ-১৯ যখন বাংলাদেশে শনাক্ত হয়, তখন তো কেউ পিপিই, গগলস—এসব সম্পর্কে জানত না। খরচও জানা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজার দেখে দাম ঠিক করা হয়েছিল। অনেক পরে দেশে এসব পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি হচ্ছে। তাই দামে তারতম্য হচ্ছে। আমরা একটা দাম ধরেছি। যখন কিনতে যাব, তখন খরচ নিশ্চয়ই অনেক কম হবে। বেশি দাম ধরা মানে তো কিনে ফেলা নয়।’

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কভিড-১৯ মোকাবেলায় বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ঋণ নিয়ে এগিয়ে এসেছে এটি ভালো খবর। কিন্তু তাদের ঋণের টাকা কোথায় খরচ হয়, সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনা জরুরি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রতিটি গগলস ও পিপিইর জন্য যে টাকা খরচ দেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে বাজারমূল্যের কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে। তাই বলে আকাশ-পাতাল পার্থক্য হতে পারে না। চলমান দুর্যোগের সময় সরকারকে টাকা খরচে আরো সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নিজে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দিয়েছেন, সেটি যাতে কার্যকর হয়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনাকাটায় খরচ যেন বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।’

সূত্রঃ কালের কন্ঠ

Facebook Comments

Related Articles