করোনা দেখাচ্ছে কিভাবে গলা কাটে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অথচ দোষ হয় ডাক্তারের

দু চারদিন চিকিৎসা নিয়েই প্রাইভেট হাসপাতালের লাখ টাকার বিল নেওয়ার কাহিনী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মারফত সবাই জানেন। এর মধ্যে চিকিৎসকদের বিল খুবই নগন্য। চিকিৎসক কনসাল্টেন্সি ফি দুই দিন হলে দুই হাজার, তিন দিন হলে তিন হাজার টাকা আসে হয়ত। কিন্তু দিনশেষে নাম হয় চিকিৎসকরা কসাই। আসলে কি বেসরকারি হাসপাতালের ফি নির্ধারণে চিকিৎসকদের কোন ভূমিকা থাকে? এসমস্ত অনেক প্রশ্নই পাঠকের কাছে উন্মোচন হয়েছে এই করোনা কালে। চিকিৎসক কেবল ওষুধ লিখে যান, এর বিল থেকে শুরু করে সবকিছু নির্ধারণ হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হাতে।

একটি প্রাইভেট হাসপাতালে করোনা টেস্ট করতে দিয়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেন এক চিকিৎসক। কিভাবে ৩৫০০ টাকার বিলকে কারসাজি করে ৫০০০ টাকা করা হয়েছে এর বিস্তারিত তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান তিনি। এছাড়াও নানান ঘটনায় বেসরকারি হাসপাতালের মালিকদের রক্তচোষা মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে গণমাধ্যমে, আলোচিত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এর মাধ্যমে জনগণ নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন তাদের হাতে গলাকাটা বিল কে ধরিয়ে দিচ্ছে।

নিচের ছবিটি খেয়াল করুন, প্রায় ৫০ হাজার টাকা বিলের মধ্যে স্পেশাল চার্জ বলে যে ১০ হাজার টাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এটা আসলে কি? এত টাকা বেড ভাড়া কেন সে প্রশ্ন নাহয় বাদই দিলাম৷ আবার সার্ভিস চার্জ রাখা হয়েছে ১০%, কিন্তু সব চার্জই বিলে ইতিমধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের শুরুতে অনেকটা গর্তেই লুকিয়ে ছিল বেসরকারি হাসপাতালগুলো। করোনার ভয়ে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা পর্যন্ত করেনি। বিশেষজ্ঞরা যখন ঘোষণা দিলেন ‘করোনাভাইরাস যাবে না, সীমিত পর্যায়ে থেকে যাবে’। তখন ব্যবসা ধরে রাখতে করোনা রোগীদের চিকিৎসার করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় তারা। জাতীর সংকটময় মূহুর্তে করোনা চিকিৎসার জন্য সরকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে দিক-নির্দেশনাও দেয়। কিন্তু এতদিনের লালন করা মানসিকতা নিয়ে ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। দেশের করোনা চিকিৎসায় রোগীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকার ভুয়া বিল নেয়ার খবর বিশ্বের প্রভাবশালী মিডিয়াগুলোতে ফলাও করে প্রচার হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটাকে ‘চিকিৎসার নামে ডাকাতি’ হিসেবে অবিহিত করেছেন অনেকে।

করোনা ছিল না তারপরও টাকা খসাতে হাসপাতালের করোনা ইউনিটে নেয়া হয়। রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে পরে যা ঘটলো তা হলো মুক্তিযোদ্ধা ভেরনোন অ্যান্থনি পলসহ ৫ জন মারা গেলেন আগুনে পুড়ে। শুধু তাই নয় রোগী মারা যাওয়ার পর ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৫১ টাকার বিলও পাঠানো হয় মৃতদের পরিবারের কাছে। সরকার নির্ধারিত কোভিড-১৯ হাসপাতাল রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল। সব ধরণের চিকিৎসা ব্যয় ফ্রি। অথচ করোনায় আক্রান্ত সাইফুর রহমান নামে এক রোগীর কাছ থেকে ১১ দিনে বিল করা হয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ টাকা। ওই রোগী জানান, তার কোনও অপারেশন হয়নি। আইসিইউতেও ছিলেন না। অক্সিজেন নেয়া লাগেনি। দুটি এক্সরে ও দুটি রক্ত পরীক্ষা করিয়েছে। কেবল নাপা ও গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেট দেয়া হয়েছে। বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনেছি। অথচ বিল এসেছে ১ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ টাকা! বিষয়টি মিডিয়াতে প্রচার হওয়ার পর করোনা আক্রান্ত রোগীকে ‘সরি’ বলে তার কাছ থেকে নেয়া টাকা বুধবার রাতে ১ লাখ ১৫ হাজার ৯৯৫ টাকা ফেরত দিয়েছে ঢাকার আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এখানেই শেষ নয়; সাইফুর রহমানের ঘটনা প্রকাশের পর ফকিরাপুলের দোকানি হুমায়ুন কবিরও বলেছেন, তার কাছ থেকেও অতিরিক্ত অর্থ নিয়েছে মডার্ন হাসপাতাল। গত ১৭ মে জ্বর নিয়ে ধানমন্ডির এই হাসপাতালে ভর্তি হন হুমায়ুন। নমুনা পরীক্ষা করে ২০ মে তার করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে। ওই দিনই হাসপাতালের কোভিড-১৯ ইউনিটে স্থানান্তর করা হয় তাকে। সেদিনই তার কাছ থেকে ৭৫ হাজার টাকা বিল নেওয়া হয়েছিল জানান হুমায়ুন। অথচ করোনাভাইরাসের চিকিৎসা ফ্রি বলেই জানতেন তিনি। তবে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়ার আগে গত মঙ্গলবার ২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭১ টাকার বিল ধরিয়ে দেয়া হয় তাকে। এত অর্থ দিতে না পারায় রাতে আর হাসপাতাল ছাড়তে পারেননি তিনি। তিনি বলেন, আমি ছোট একটা দোকান চালাই। ৭৫ হাজার টাকা দিতেই হিমশিম খাইছি। আমাকে কোনো অক্সিজেন দেয়নি। খুব বেশি ওষুধও দেয়নি। আমরা একটা রুমে পাঁচজন রোগী ছিলাম। কিন্তু এত টাকা বিল অযৌক্তিক মনে হইছে। তাই এইটা নিয়া আমি বাড়াবাড়ি করলাম। কিন্তু তারা বলে কিছু করার নাই। এক সময় হাসপাতালের ম্যানেজার আমারে কয়, ২০-২৫ হাজার টাকা কমায়া দিতে পারব। কিন্তু আমি এত টাকা দিব কেমনে আর আসব কেমনে? রাতে হাসপাতালের বেডেই থেকে যাই।

হুমায়ুন বলেন, রাতে ওই হাসপাতালের বিলিং শাখার একজন ফোনে তাকে জানান, তার বিলে টাকার পরিমাণ কমানো হয়েছে। পরে রাত ২টার দিকে একজন ফোন করে বলেন আমাদের ওপর চাপ আছে, আপনার বিল কমিয়ে দেয়া হয়েছে। পরে বুধবার সকালে ২০ হাজার ৭৪৬ টাকা দিয়ে হাসপাতাল ছাড়েন হুমায়ুন।

হুমায়ুন কবিরের বিলে দেখা গেছে, ২০ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত চিকিৎসকের বিল ২৫ হাজার ৫০০, হাসপাতাল বিল ১ লাখ ৯২ হাজার ৪০, পরীক্ষার বিল ৪ হাজার ৫৩৫, ওষুধের বিল ২৬ হাজার ৮৯২ টাকা ৯০ পয়সা ধরা হয়েছে। সঙ্গে ১০ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ৫০৪ টাকা। হুমায়ুন ও সাইফুর রহমানের মতো আরও অনেক রোগীর কাছ থেকে এমন বিল নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ আছে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশে মহামারী করোনাভাইরাসের মধ্যে বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসার অভাবে প্রতিদিনই রোগী মৃত্যুর অভিযোগও রয়েছে। অনেক রোগী অভিযোগ করেছেন, জ্বর, সর্দি-কাশির মতো লক্ষণ থাকলেই এসব হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেও অন্য রোগের চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না। আবার অনেক বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করেও দেয়া হয়েছে। এক অর্থে অঘোষিত লকডাউন করে রাখা হয়েছে। অথচ সারা বছর হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করছে দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলো। রোগীদের বিভিন্নভাবে চিকিৎসার নামে গলা কেটেও দেশের এই ক্রান্তিকালে সেবার মানসিকতা নেই প্রতিষ্ঠানগুলোর। সেবার নামে বাণিজ্য করার অভিযোগ এই দুর্যোগের সময়েও ঘোচাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানগুলো। করোনার চিকিৎসায় এগিয়ে আসা বেসরকারি

সূত্রমতে, সামর্থবান নাগরিকদের টার্গেট করে দেশেই উন্নত সেবা দিতে এভারকেয়ার (সাবেক অ্যাপোলো), স্কয়ার, ইউনাইটেড, আনোয়ার খান মডার্ন, পপুলার, ল্যাব এইড ও আজগর আলীর মতো কিছু হাসপাতাল গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিকভাবে মুনাফার উদ্দেশ্যে। এর বাইরে কিছু বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে, যারা উচ্চ মুনাফা করছে। যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে সারাদেশের বেসরকারি হাসপাতালে সব ধরণের রোগীর সেবা দিতে নির্দেশ দিয়েছে। অন্যথায় কঠোর পদক্ষেপেরও হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।

করোনা আক্রান্ত নন এমন রোগীদের প্রতিনিয়ত ফিরিয়ে দেয়ার অভিযোগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ ধরনের হাসপাতাল ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিল করার হুঁশিয়ারি দেন। যদিও সেই প্রেক্ষাপটে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মালিকদের একটি সংগঠন বিবৃতি দিয়ে বলেছে, লাইসেন্স বাতিলের হুঁশিয়ারি কোনো সমাধান হতে পারে না।

বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে চিকিৎসাসেবার মান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণার পর দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, বাংলাদেশে ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ বছরে বেসরকারি খাত থেকে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে থাকেন। এখানে বাণিজ্যিক মুনাফাই মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে অভিযাগ উঠেছে সরকারিভাবে করোনা রোগীর সেবা দিয়ে বিল ডাকাতি বা অতিরিক্ত ব্যবসা করতে পারছে না বলে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ৩১ মে থেকে চুক্তি বাতিল করেছে আনোয়র খান মডার্ন হাসপাতাল। আর সুযোগ পেয়েই রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত বিল নেয়ায় মেতে উঠেছেন। অতিরিক্ত বিল নেয়ার বিষয়টি নিয়ে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের দু’জন চিকিৎসক গণমাধ্যমে বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা বিব্রত তবে আমাদের এসবে ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই।

সূত্রঃ ইনকিলাব।

Facebook Comments

Related Articles