নিজ উদ্যোগে চলন বিলে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করলেন অপ্রতিরোধ্য নারী চিকিৎসক

সময়টা ২০১৫ সাল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে সবে মাত্রই তার কেরিয়ারের শুরু হয়েছিলো। গভীর রাতে ফারজানা রহমানের কাছে নাটোরের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কল এসেছিলো,যেখানে তিনি পার্ট টাইম আল্ট্রাসনোলজিস্ট হিসেবে কাজ করতেন।

এক গর্ভবতী মহিলা প্রসব করছিলেন। ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না যে তার সিজারিয়ান সেকশনের প্রয়োজন কিনা। এটি মূলত নির্ভর করে শিশুর হার্টবিট এবং গর্ভের অবস্থানের উপর।

ফারজানা বললেন, “আমি সেখান থেকে অনেক দূরে ছিলাম বলে  যেতে পারিনি, তাছাড়া সেসময় অন্ধকারে বের হওয়া নিরাপদ ছিল না”

পরের দিন শিশুটির মৃত্যুর সংবাদটি তার কাছে একটি শক হিসাবে আসে, যাকে তিনি বলেন “আমার জীবনের ঘুরে দাড়াবার মুহূর্ত” কারণ সেদিনের সেই ঘটনাই তাকে তার মানুষদের জন্য মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য উৎসাহী করেছিলো

ফারজানা তখনই সিদ্ধান্ত নিলেন নাটোর শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে সিংরাইতে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলবেন এবং তাই করলেন,পরবর্তীতে এটি হাসপাতালে রূপান্তরিত হয়।তার প্রথম উদ্দেশ্য ছিল দরিদ্র অঞ্চলে প্রসবের সময় নবজাতক এবং মায়েদের মৃত্যুর হার হ্রাস করা। তিনি তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য গাইনোকোলজিতে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন।

বর্তমানে “ডিপ মেডিকেল সার্ভিসেস” নামক তার হাসপাতালটির চিকিৎসার খরচ সর্বনিম্ন বলা যায়, এমনকি রোগীর অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হলে বিনামূল্যেই চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন।এছাড়া,মুক্তিযোদ্ধা এবং ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তিরা রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার জন্য পান বিশেষ ছাড়।

“আমার হাসপাতালে এমন আধুনিক মেশিন আছে যা অনেক হাসপাতালে নেই,  এমনকি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলিতেও নেই I আমি এই গ্রামাঞ্চলে থেকে লোকজনেকে চিকিৎসা সেবা দেয়া বেছে নিয়েছি কারণ এখানে শহরের মত পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই” বললেন ফারজানা।

স্বাস্থ্যসেবা সেবার অভাবে স্থানীয় লোকজন হাতুরি ডাক্তার দের সরনাপন্ন হতে বাধ্য হন। ফারজানা চান এই প্রবণতাকে দূর করতে।

তার উদ্দেশ্যটি অত্যন্ত স্পষ্ট – যদি এলাকার লোকজন মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পায় তবে তারা সুস্থ জীবনযাপন করবে, যার ফলস্বরূপ তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বয়ে আনতে সক্ষম হবে।তার সাথে দু’জন চিকিৎসক, ছয় জন নার্স এবং ১১ জন স্বাস্থ্য কর্মী (বেশিরভাগ মহিলা) কাজ করে যাচ্ছেন, তার এই স্বপ্ন পূরনে।

গত বছর তিনি বিপুল সংখ্যক লোককে স্বাস্থ্যসেবা সেবা সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি এখন মাসে একবার কাছাকাছি চারটি ইউনিয়নে গিয়ে মানুষের চিকিৎসা করেন এবং সঠিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতনা বৃদ্ধির কার্যক্রম চালান। প্রতি শুক্রবার, তার হাসপাতালটি সচেতনতা অধিবেশন এবং গর্ভবতী মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে  হেলথ চেকআপের আয়োজন করে। এছাড়া, রোগীদের বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করে থাকেন।

ফারজানা “দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড” কে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “সামাজিক দায়বদ্ধতার বাইরে আমি নিজের অর্থ দিয়ে হাসপাতালটি শুরু করেছি। আমার উদ্দেশ্য সবার সাথে কাজ করা, যাতে কেউ অনাচারের শিকার না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা”

যে দায়িত্ব ফারজানা ৫ বছর আগে নিয়েছিলেন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত খরচে, বর্তমানে অনেক প্রভাবশালী ব্যাক্তি ই তার প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়ে তার সাথে যুক্ত হয়েছেন।

ফারজানা আরও বলেন, “আমি যদি গ্রাম্য অঞ্চলে মানুষের সেবা করার জন্য অন্যান্য ডাক্তারদের অনুপ্রাণিত করতে পারি তবে এটিই হবে আমার কাজের সার্থকতা এবং তখনই দেশের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ঘটবে”

আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন::
লাইক দিন: https://www.facebook.com/eisomoy365/ (‘এই সময়’ ফেসবুক পেইজ)
সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে: https://youtu.be/ZBMTaqUNbh4

Facebook Comments

Related Articles