অলৌকিক এইভাবে ঘটে!

এই দিনে ব্রায়ান লারার অপরাজিত ৫০১

হানিফ মোহাম্মদ একটা দু:খ নিয়ে মারা গেছেন। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসাবে এক ইনিংসে ৫০০ রান করতে না পারার দু:খ। এই দু:খটাতে তাঁর ছিল একক অধিকার। এখনো তা-ই আছে। আর কোনো ব্যাটসম্যান যে ৪৯৯ রানে রান আউট হননি!

৫০০তম রানটি নিতে গিয়ে যে রান আউট হয়েছেন, সেটি অবশ্য জেনেছেন একটু পরে। আউট হয়ে ফেরার সময় হানিফ জানতেন, তিনি করেছেন ৪৯৭। মাঠ থেকে বেরোনোর সময় স্কোরবোর্ডের দিকে তাকিয়ে রীতিমতো চমকে যান। কারণ সেটিতে তাঁর রান দেখাচ্ছে ৪৯৯। যা ভেবেছিলেন, তার চেয়ে ২ রান বেশি করলে এমনিতে ব্যাটসম্যানের খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে তো ঘটনা অন্যরকম, হানিফের দু:খ তাতে আরও বেড়ে যায়।

২০০১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় করাচির ইউনিভার্সিটি রোডে হানিফ মোহাম্মদের ছিমছাম বাংলোমতো বাড়িতে বসে সেই দু:খের কথা শুনেছিলাম তাঁর নিজের মুখেই। এত বড় অর্জনের এত কাছে এসে রান আউট হয়ে যাওয়াটাই বাকি জীবন অনেক বড় একটা দু:খ হয়ে থাকার জন্য যথেষ্ট। হানিফের দু:খটা আরও বেশি ছিল একটা ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছিলেন বলে। দিনের খেলার দুই বল বাকি থাকতে স্কোরবোর্ডে নিজের রান দেখেছিলেন ৪৯৬। পঞ্চম বলটিকে ডিপ একস্ট্রা কাভারে পাঠিয়ে সেখানে মিস ফিল্ডিং হওয়ায় স্ট্রাইক ধরে রাখতে দ্বিতীয় রান নিতে তাই প্রাণপণে দৌড় লাগান। ক্রিজে পৌঁছুতে পারেননি। তার মানে তো তিনি ৪৯৭ রানেই আউট। সেটি তাহলে ৪৯৯ হলো কীভাবে? নাম না জানা যে কিশোর কায়েদ-ই-আজম ট্রফির সেই করাচি বনাম ভাওয়ালপুর সেমিফাইনালের ম্যাচে স্কোরবোর্ডের দায়িত্বে ছিল, এই দায় আসলে তার। ঠিক অংকের বোর্ডটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না বলে ৪৯৬-কে ৪৯৮ বানাতে সে দেরি করে ফেলে। ছোট্ট ওই ভুলটাই হয়ে যায় হানিফের আমৃত্যু দু;খের কারণ। প্রায় ৪৩ বছর পরও যেটি বলার সময় দু:খ ঝরে পড়ছিল তাঁর কণ্ঠে, ‘তখন আমি এত সেট ছিলাম যে, রান ৪৯৮ জানলে পঞ্চম বলটিতে ঝুঁকি না নিয়ে ২ রান নেওয়ার জন্য শেষ বলটি পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম।’

ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে সর্বোচ্চ স্কোরের রেকর্ড গড়ার আনন্দটা তাই সেভাবে উদযাপন করা হয়নি হানিফ মোহাম্মদের। সেই আনন্দ যে মুছে দিয়েছিল মাত্র ১ রানের জন্য প্রথম ব্যাটসম্যান হিসাবে ৫০০ রান করতে না পারার দু:খ। সেই ম্যাচে করাচি দলের অধিনায়ক ছিলেন হানিফের বড় ভাই ওয়াজির মোহাম্মদ। ক্রিকেটের সব রেকর্ড ঠোঁটস্থ থাকত বলে যাঁকে সতীর্থরা যাঁকে ডাকতেন ‘উইজডেন’ বলে। ট্রিপল সেঞ্চুরি হয়ে যাওয়ার পরই হানিফকে তিনি বলেন, ‘তোমাকে ব্র্যাডম্যানের বিশ্ব রেকর্ড ভাঙতে হবে।’

হানিফ জানতে চান, ‘বিশ্ব রেকর্ডটা কত?’

ওয়াজির বলেন, ‘মাত্র ৪৫২।’

বড় ভাইয়ের মুখে ‘মাত্র’ শুনে হানিফ হেসে ফেলেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই রসিকতা করছেন। আমার মাত্র ৩০০ হয়েছে, তাছাড়া আমি এখনই খুব ক্লান্ত।’

ওয়াজির কথাটা কানেই নিলেন না, ‘আজ রাতে আমি তোমাকে দারুণ একটা ম্যাসাজ দেব। ভালো একটা ঘুম দিয়ে উঠলেই তোমার ক্লান্তি চলে যাবে।’

পরদিন বিশ্ব রেকর্ড ভাঙার আনন্দের চেয়ে ৫০০ করতে না পারার দু:খে কাতর ছোট ভাইকে সান্ত্বনা দিতেও এগিয়ে আসেন ওয়াজিরই। সান্ত্বনাটা একটু ব্যতিক্রমীই ছিল, ‘ভালোই হয়েছে। ৫০০ করলে কোনো সঙ্গী থাকত না তোমার। একেবারে নি:সঙ্গ হয়ে যেতে।’

ব্রায়ান লারা সেই ভয় পাননি। হানিফ মোহাম্মদ অল্পের জন্য যা পারেননি, ৩৫ বছর পর ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান বাঁহাতি তা ঠিকই করে ফেলেছেন। সেটি ১৯৯৪ সালের আজকের এই দিনেই। এক ইংলিশ সাংবাদিকের ফোনে হানিফ যখন নিজের রেকর্ড হারানোর খবরটা পান,করাচিতে তখন অনেক রাত। মন খারাপ তো হয়েছিলই। সান্ত্বনা খুঁজেছিলেন একটা কথা ভেবেই। রেকর্ডটা যে ভেঙেছে, সে স্যার গ্যারি সোবার্সের দেশের লোক। দুজনই ওয়েস্ট ইন্ডিজের, কিন্তু দেশ যে আলাদা, সোবার্সের বারবাডোজ আর লারার ত্রিনিদাদ ও টোব্যাগো, এটা হানিফ মোহাম্মদের অজানা থাকার কোনো কারণ নেই। দেশ বলতে এখানে তিনি দলই বুঝিয়েছেন। সোবার্স যে দলের হয়ে খেলেছেন, সেই দলেরই একজন তাঁর রেকর্ড ভেঙেছেন, দু:খের মধ্যেও এটাই ছিল তাঁর শান্তি। কারণ ক্রিকেট নিয়ে কথা হলে হানিফ মোহাম্মদের কাছে ‘সবার উপরে সোবার্স সত্য, তাহার উপরে নাই।’ হানিফ নিজে এভাবে বলবেন কিভাবে! তিনি বলেছিলেন, ‘ক্রিকেটে সোবার্সের মতো কেউ ছিল না, আর আসবেও না।’ লারা এক এবং অদ্বিতীয় সেই সোবার্সের রেকর্ড ভেঙে দেওয়ার পরই তাঁর মন একটু ‘কু’ ডেকেছিল, ‘কে জানে, এ হয়তো একদিন আমার রেকর্ডও ভেঙে দেবে।’

লারা সত্যি সত্যিই তা ভেঙে দিয়ে ৫০০ রানের এভারেস্টে প্রথম পা রাখার কিছুক্ষণের মধ্যেই ফোনে অভিনন্দন জানিয়েছেন তাঁকে। লারাকে ফোনে ধরিয়ে দিয়েছিলেন ছোট ভাই মুশতাক মোহাম্মদ। হানিফের ৪৯৯ রানের ম্যাচে বড় ভাই ওয়াজিরের মতো ছোট ভাই মুশতাকও ছিলেন তাঁর সতীর্থ। মুশতাক তাই ৪৯৯-এর প্রত্যক্ষদর্শী। লারার রেকর্ডের দিকে ধাবমান জেনে সেটিরও প্রত্যক্ষদর্শী হতে তড়িঘড়ি করে পাশের শহর থেকে এজবাস্টনের দিকে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু পৌঁছুতে একটু দেরি হয়ে যায়। ৪৯৯ আর অপরাজিত ৫০১ দুটিই দেখার গর্ব নিয়ে নিয়ে বাকি জীবন গল্প করার সুযোগটা অল্পের জন্য হাতছাড়া হয়ে যায় মুশতাকের।

এই গল্প এখন আর কারও কাছ থেকেই শুনতে পাবেন না। যে একজনই তা করতে পারতেন, ২০০৭ বিশ্বকাপে জ্যামাইকার হোটেল রুমে রহস্যজনক এক মৃত্যু তাঁকে নিয়ে চলে গেছে অনন্তলোকে। লারার অপরাজিত ৫০১ রানের সময় বব উলমার ওয়ারউইকশায়ারের ড্রেসিংরুমেই ছিলেন। তিনি তখন সেই দলের কোচ। আর হানিফ মোহাম্মদের ৪৯৯? সেটি দেখেছিলেন নেহাতই ঘটনাচক্রে। উলমারের বাবার তখন চাকরি সূত্রে করাচিতে বাস। সেখানে বেড়াতে গেছেন ১১ বছরের উলমার। বাবাও ক্রিকেট ভক্ত। কিন্তু তাঁর সেদিন খেলা দেখার সময় নেই। ছেলেকে তাই করাচির পার্সি ইনস্টিটিউট মাঠে নামিয়ে দিয়ে কাজে চলে যান। খেলায় কী হলো জানতে চেয়ে সন্ধ্যায় ছেলের কাছ থেকে জবাব পান, ‘ওয়েল, সামওয়ান গট ফোর নাইনটি নাইন, ড্যাড।’

‘সামওয়ান’-এর পরিচয় পরে জেনেছেন উলমার। সেই ম্যাচ নিয়ে তখন তার স্মৃতি বলতে প্রচুর দর্শক, ম্যাটিং উইকেট আর একটি রান আউট নিয়ে আলোড়ন।

লারার ইনিংস নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই অনেক স্মৃতি। সে সব বলেছেনও বিভিন্ন উপলক্ষে। লাঞ্চের সময়ই লারা তাঁর কাছে জানতে চান, ‘ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে রেকর্ডটা যেন কত?’

লারার রান তখন ২৮৫, উলমার তাই বিস্মিত হয়ে বলেন, ‘বিশ্ব রেকর্ড ৪৯৯। তুমি নিশ্চয়ই এটা ভেঙে দেওয়ার কথা ভাবছ না।’

লারা পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘কেন, ডিক্লেয়ার করে দেওয়ার চিন্তাভাবনা আছে নাকি?’

ওয়ারউইকশায়ারের অধিনায়ক ডারমট রিভ বলেন, ‘অনেকটা তা-ই। দেখা যাক, কী হয়!’

ওই ম্যাচ তখন বিরক্তকর ম্যাড়ম্যাড়ে ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছে। বৃষ্টির কারণে তৃতীয় দিন কোনো খেলাই হয়নি। শেষ দিনে তখনো চলছে ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংস। প্রথম ইনিংসে ডারহাম করেছে ৮ উইকেটে ৫৫৬। জবাবে দ্বিতীয় দিন শেষে ওয়ারউইকশায়ারের স্কোর ২ উইকেটে ২১০। লারার সেঞ্চুরি হয়ে গেছে সেদিনই। তিনি অপরাজিত ১১১ রানে। আট ইনিংসে লারার সপ্তম সেঞ্চুরি। যেটিতে একটা বিশ্ব রেকর্ডও হয়ে গেছে। তবে এই সেঞ্চুরিটা একদমই লারাসুলভ নয়। প্রথম বলেই প্রায় ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন। ১২ রানে তো লেগ স্টাম্প ইয়র্কারে বোল্ডই হয়ে গিয়েছিলেন, বেঁচে গেছেন বলটা ‘নো’ ছিল বলে। ১৮ রানে ক্যাচ ফেলে দিয়েছেন উইকেটকিপার ক্রিস স্কট। ফেলার পর অস্ফুটে বলেছেন, ‘ও না আবার সেঞ্চুরি করে ফেলে!’ স্কটের ভয় পাওয়া স্বাভাবিকই ছিল। টেস্টে ৩৭৫ রানের বিশ্ব রেকর্ড গড়ে ইংল্যান্ডে যাওয়ার পর কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম চার ম্যাচে পাঁচটি সেঞ্চুরি করেছেন লারা। তবে আরেকটি সেঞ্চুরি পর্যন্তই ভাবতে পেরেছিলেন স্কট। কখনো কেউ যা করতে পারেনি, লারা যে তা-ই করে ফেলবেন, এটা কিভাবে ভাববেন!

‘লাইফ’ পাওয়ার পরও লারা ছন্দ খুঁজে পাননি। বল ব্যাটের কানায় লাগছে, টাইমিং হচ্ছে না। নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে চা বিরতি হতেই তাই সোজা নেটে চলে যান। সেখানে পনের মিনিট ব্যাটিং করেন। এর আগে লারার এমন অবস্থা যে, দ্বিতীয় উইকেট জুটির সঙ্গী আরেক বাঁহাতি রজার টুজ তাঁর চেয়ে দ্রুত রান করে ফেলে নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছেন। ওয়ারউইকশায়ারে যোগ দিয়েই এই টুজের রসবোধের পরিচয় পেয়েছিলেন লারা। সেখানে প্রথম রাত কাটিয়ে সকালে উঠে দেখেন, তাঁর দরজায় একটা কাগজ সাঁটানো। যাতে লেখা, ওয়েলকাম টু দ্য সেকেন্ড বেস্ট লেফট হ্যান্ডার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। এই স্বাগতম জানানোর কাজটা করেছিলেন রজার টুজ। লারার সেটি খুব একটা পছন্দ হয়নি বলেই শোনা যায়।

কাউন্টি ক্রিকেটে তখন ম্যাচের মধ্যে ম্যাচ হতো। বৃহস্পতিবার শুরু চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচে রোববার বিরতি পড়ত সানডে লিগের জন্য। চ্যাম্পিয়নশিপের দুই দলই মুখোমুখি হতো ৪০ ওভারের ম্যাচে। সেই ম্যাচেও লারা ভালো করেননি। আউট হয়ে যান মাত্র ৬ রানে। ওই মৌসুমে লারার ব্যাটিংয়ে এ এক আশ্চর্য বৈপরীত্য, চার দিনের কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচে রানবন্যা বইয়ে দিচ্ছেন, কিন্তু এক দিনের ম্যাচে শুরু থেকেই ব্যর্থ। এর আগের চার ম্যাচে করেছেন মাত্র ৬৪ রান।

যেদিন লাঞ্চের সময় লারা ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে সর্বোচ্চ স্কোরের রেকর্ডের খোঁজখবর নিচ্ছেন, সেই চতুর্থ দিনের খেলা শুরুর আগেও তাঁর অবস্থা সুবিধার নয়। ইনডোর নেটে লারার ব্যাটিং দেখে বব উলমার ‘শকিং’ পর্যন্ত বলে ফেলেছেন। সেই লারাই খেলা শুরুর পর ভোজবাজির মতো ফিরে এলেন স্বরূপে। প্রথম সেশনেই করে ফেললেন ১৭৪ রান। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে রান তোলার গতিতে রজার টুজ এক সময় তাঁকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন, আর ৩১৪ রানের তৃতীয় উইকেট জুটিতে লারার সঙ্গী ট্রেভর পেনির অবদান মাত্র ৪৪।

লাঞ্চের সময় লারার সঙ্গে কথপোকথনের পর বব উলমার ও ডারমট রিভ ঠিক করেন, লারাকে অন্তত ওয়ারউইকশায়ারের রেকর্ড ৩০৫ ভাঙার সুযোগ দেওয়া হবে। তিন ওভারের মধ্যেই লারার ট্রিপল সেঞ্চুরি হয়ে যাওয়ার পর উলমার মত বদলে রিভকে বলে দেন, ‘ঠিক আছে, ও যদি পারে তো বিশ্ব রেকর্ড করুক।’

দ্বিতীয় সেশনে ১৩৩ রান করে চা বিরতির সময় লারা অপরাজিত ৪১৮ রানে। ভাগ্যদেবী অবশ্য এদিনও লারার পাশে দাঁড়িয়েই হাসছিলেন। লাঞ্চের আগেই ২৩৮ রানে মিড অফে ক্যাচ পড়েছে। যাঁর নো বলে আউট হয়েছিলেন, বোলার এবারও সেই অ্যান্ডারসন কামিন্স। অ্যান্টিগায় লারার ৩৭৫ রানের ইনিংসের ম্যাচে যিনি ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের টুয়েলভথ্ ম্যান। লারার দুটি রেকর্ডেরই তাই সাক্ষী বারবাডিয়ান ফাস্ট বোলার। একটিতে আনন্দে ভেসেছেন, আরেকটিতে পুড়েছেন যন্ত্রণায়।

চা বিরতির ঠিক আগে, ৪১৩ রানে আবার নতুন জীবন পেয়েছেন লারা। এবার বদলি ফিল্ডার মাইকেল বার্নসের সৌজন্যে। মজার ব্যাপার হলো, এই বার্নস আসলে ওয়ারউইকশায়ারের দ্বিতীয় উইকেটকিপার। ডারহামের দ্বাদশ ব্যক্তি আগেই নেমে যাওয়ায় প্রতিপক্ষকে সাহায্য করতে নেমেছিলেন ফিল্ডিংয়ে। ওই ক্যাচ নিয়ে যে কোনো বিতর্ক হয়নি, সেটিই আশ্চর্য।

এত কিছু হচ্ছে, কিন্তু তা দেখছেন কজন! দুই দলের এক ইনিংস করেই যেখানে শেষ হচ্ছে না, কে আসবেন এই খেলা দেখতে! প্রথম দুদিন, এমনকি শেষ দিনের অর্ধেকের বেশি সময় দর্শক এতই কম যে, চাইলে তাঁদের গুণে ফেলা যেত। লারার রেকর্ড গড়ার সম্ভাবনার কথা ছড়িয়ে পড়ায় দর্শক আসতে শুরু করল মাঠে। শেষ সেশনে সংখ্যাটা দাঁড়াল হাজার তিনেকে। অর্থহীন এই ম্যাচেও ডারহামের বোলাররা নিজেদের নিংড়ে দিয়েছেন। সবাই ক্লান্ত-বিধ্বস্ত। তিনজন বোলারের দেড় শর বেশি রান দেওয়া হয়ে গেছে। এর মধ্যে সেই ম্যাচেই অভিষিক্ত বাঁহাতি স্পিনার ডেভিড কক্সের মনে হচ্ছে, লারার বিপক্ষেই কেন নামিয়ে দেওয়া হবে আমাকে! ৩০ ওভারে ১৬৩ রান দিয়ে উইকেটের ঘরে শূন্য। প্রথম ওভারেই লারার ব্যাটে ইনসাইড এজে বল স্টাম্প ঘেঁষে বেরিয়ে গেছে, মনে রাখার মতো কোনো সুখস্মৃতি বলতে এটুকুই।
শুধু লারার রেকর্ডের জন্যই খেলা হচ্ছে বলে বিরক্ত ডারহাম অধিনায়ক ফিল বেইনব্রিজ একটা সময় অনিয়মিত দুই বোলার ওয়েইন লারকিনস ও জন মরিসকে দিয়ে বোলিং করাতে শুরু করেন। জন মরিস যখন ম্যাচের শেষ ওভারটি করতে শুরু করেছেন, লারার রান তখন ৪৯৭ এবং তিনি জানেন না যে, এটাই ম্যাচের শেষ ওভার। প্রথম তিনটি বলে তাই কোনো রানই নেননি। চতুর্থ বলটি গিয়ে লাগে হেলমেটে। টেনেটুনেও যাঁকে মিডিয়াম পেস বোলার বলা কঠিন, সেই মরিস নিজেই যাতে অবাক হয়ে যান। লারার ইনিংসের শেষ ১৬৫ রানে উইকেটে তাঁর সঙ্গী কিথ পাইপার এগিয়ে গিয়ে লারাকে জানান, এটাই ম্যাচের শেষ ওভার এবং ৫০০ করার জন্য আর মাত্র দুটি বলই পাবেন। লারার দুই বল লাগেনি। পরের বলেই কাভার দিয়ে চার মেরে দুই হাত শূন্যে তুলে তিনি ঢুকে যান ইতিহাসে। পরিসংখ্যানের আয়নায় যে ইতিহাসের ছায়া পড়েছে এভাবে—সাত ঘন্টা ৫৪ মিনিট, ৪২৭ বল, অপরাজিত ৫০১। ৬২টি চার ও ১০টি ছয়।

ঝড়টা শুধু ডারহামের বোলারদের ওপর দিয়েই যায়নি, ওয়ারউইকশায়ারের স্কোরার অ্যালেক্স ডেভিসও গলদঘর্ম হয়ে গেছেন ৫০১ রান লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে। ঘটনাচক্রে অ্যান্টিগায় লারার ৩৭৫ রানের রেকর্ড ভাঙা ইনিংসের সময়ও ইংল্যান্ড দলের স্কোরার ছিলেন এই ডেভিস। সেখানে অন্য ব্যাটসম্যানরা কম রানে আউট হয়ে যাওয়ায় লারার রানের হিসাব রাখতে স্কোরকার্ডে সমস্যা হয়নি, অন্যদের জায়গাটা নিয়ে নিয়েছেন লারার জন্য। কিন্তু এখানে কিথ পাইপার সেঞ্চুরি করেছেন, টুজ ৫১, পেনি ৪৪—ডেভিসকে তাই লারার রান লেখার জন্য স্কোরকার্ডের আশেপাশে জায়গা খুঁজতে হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল সাংবাদিকদের ফোনের যন্ত্রণা। মাঠে আর তাঁদের কজনই বা ছিলেন, লারার স্কোরের আপডেট দিতে ডেভিসের সঙ্গে ফোনালাপই তাই ভরসা। ডেভিস সেই হাঁসফাস অবস্থার কথা বলেছেন পরে, ‘একের পর এক সাংবাদিক ফোন করে প্রতিটি ফিফটির বিস্তারিত জানতে চাইছে। কেউ কেউ আবার বলছেন, পরের ফিফটিটার জন্য আমি কি লাইনে থাকব?’ মাঠে এই ঝামেলা শেষ করে বাড়িতে গিয়ে পড়েছেন আরেক তোপের মুখে। ডেভিসের স্ত্রী তাঁর সফরসঙ্গী হয়ে অ্যান্টিগায় লারার ৩৭৫ দেখেছেন। এখানে তাঁকে খবর দেওয়া হয়নি বলে স্বামীর ওপর তাঁর প্রচণ্ড রাগ।

এমন কত গল্প জড়িয়ে লারার ওই ইনিংসের সঙ্গে। এমনই আরেকটা গল্প বলে লেখাটা শেষ করি। লারার তখন অনেক স্পনসর, তার মধ্যে একটি ম্যানচেস্টারের পোশাক কোম্পানি জো ব্লগস। ৩৭৫ রানের বিশ্ব রেকর্ডের ফায়দা তুলতে তারা তখন ‘375’ লেখা জিন্স ছাড়ছে বাজারে। এর মধ্যেই লারার ওই অপরাজিত ৫০১। এটাও তো কাজে লাগাতে হয়। কিন্তু সমস্যা হলো ‘501’ তো লিভাইসের ট্রেডমার্ক। এটা ব্যবহার করলে তো ওরা মামলা ঠুকে দেবে। জো ব্লগস তাই অন্য একটা বুদ্ধি বের করল। বাজারে টি শার্ট আর ক্যাপ ছাড়ল, যেটির গায়ে লেখা ‘500 and One’।

সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। ৫০১-ও হলো, লিভাইসেরও বলার কিছু থাকল না।

ওই অপরাজিত ৫০১ রানের পরের ম্যাচে লারা কী করেছিলেন, জানতে চান? পরের ম্যাচে ১৯ ও ৩১ রানে আউট হয়ে গিয়ে নেমে এসেছিলেন মানবীয় পর্যায়ে। এর পরের ম্যাচেই আবার ১৯৭।

কেউ ক্রিকেটীয় রূপকথা লিখলেও ১৯৯৪ সালে ব্রায়ান লারা যা করেছিলেন, তা লেখার সাহস পাবেন বলে মনে হয় না। অ্যান্টিগা টেস্টে ৩৭৫ করার পর কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে ১৫ ম্যাচের ২৫ ইনিংসে ৮৯.৮২ গড়ে ২০৬৬ রান। ৯টি সেঞ্চুরি। সংখ্যাগুলো কেমন অবাস্তব লাগে না!
অথচ লারার সেবার কাউন্টিতে খেলারই কথা ছিল না। অ্যালান ডোনাল্ডকে পাওয়া যাবে না বলে ভারতীয় পেসার মনোজ প্রভাকরকে সাইন করিয়েছিল ওয়ারউইকশায়ার। প্রভাকর হঠাৎ চোট পেয়ে খেলার বাইরে চলে যাওয়ায় সুযোগ পেয়ে যান লারা।
কী বলবেন একে? নরেশ গুহর কবিতার লাইনটা আওড়ালেই তো হয়!
অলৌকিক এইভাবে ঘটে!

Facebook Comments

Related Articles