মুনাফাখোর স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চিকিৎসকরা আসলে কারখানার শ্রমিকের সমতুল্য

বলুন তো দেখি, একজন গ্রসারির দোকানদার বা কারখানা কর্মী আর একজন চিকিৎসকের মধ্যে পার্থক্য কতটুকু?
আজ থেকে কয়েক মাস আগে এই প্রশ্ন করলে আপনারা আমাকে পাগল ঠাওরাতেন! অপমানিতও বোধ করতেন হয়তো। কিন্তু করোনা বৈশ্বিক মহামারি দেখিয়ে দিয়েছে যে আমাদের মুনাফাখোর স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চিকিৎসকরা আসলে কারখানার শ্রমিকের সমতুল্য।

উৎপাদন আর মুনাফার চালান ঠিক রাখার জন্য আমরা যেমন শ্রমিকদের কারখানায় পাঠাই, যে কোন বিপদজনক পরিস্থিতিতে, বেশির ভাগ সময় অরক্ষিত রেখেই , প্রয়োজনে নির্ধারিত সময়ের চাইতে বেশি ঘন্টার পর ঘন্টা তাদের শ্রম দিতে বাধ্য করি, চিকিৎসকদের সাথেও তাই করি। আমাদের জোড়াতালি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দাড়িয়েঁ থাকে নিচের সারির এই সব শ্রমিক চিকিৎসকদের জীবনের ওপর। কথাটা শুনে চমকে উঠছেন অনেকে, কিন্তু এটা মোটেও পুরনো কথা নয়। সেই কবে কার্ল মার্ক্স তার কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতে চিকিৎসকদের সম্পর্কে মন্তব্য করে গেছেন-‍ বুর্জোয়া সংস্কৃতি আমাদের চিকিৎসকদের-যারা কিনা আসলে বিজ্ঞানী আর বুদ্ধিজীবি-তাদের পরিণত করেছে মজুরি ভোগী লেবার বা শ্রমিকে।

আমি জানি সমাজে চিকিৎসকদের স্বচ্ছলতা আর সম্মানের বিপরীতে তাদেরকে যখন শ্রমিক বা ওয়ার্কিং ক্লাস বলছি তখন অনেকেরই অবাক লাগতে পারে। কিন্তু সত্যি বলতে কি, পুজিঁবাদী অর্থনীতিতে চিকিৎসকদের এই শ্রম আর মর্যাদার মূল্য পরিশোধ করা হয় সামান্যই, আর তা যে চড়া মূল্যে বিকানো হয় অন্যদের কাছে তার বাকি পুরোটাই লাভ বা মুনাফা হিসেবে চলে যায় অন্য কারো পকেটে। এমনকি যেসব চিকিৎসকরা স্বাধীনভাবে কেবল প্র্যাকটিস করেন বা নন প্রফিট প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তাদের বেলায়ও একথা সত্য, কারণ তারাও ফার্মাসিউটিক্যাল, মেডিকেল সাপ্লাই ইন্ডাস্ট্রি আর ইনসুরেন্স কোম্পানিগুলোর হাতের পুতুল।

এখন দেখা যাক কিভাবে তাদের এক্সপ্লয়েট করা হয়। তাদের হিসেবহীন শ্রমঘন্টা, পরিবারের সাথে দুরত্ব সৃষ্টি বা সন্তোষজনক কাজের পরিবেশ নষ্ট করা থেকে শুরু হয়ে সেটা শেষ পর্যন্ত গড়ায় চিকিৎসকদের মধ্যে বার্ন আউট, মানসিক সমস্যা আর আত্নহত্যার উচ্চ হারে। এই এক্সপ্লয়টেশনকে জনগণ আর খোদ চিকিৎসক সমাজের চোখে ধোঁকা দেবার অন্যতম হাতিয়ার হল তাদের পেশাগত আত্নম্ভরিতা বা মহত্ব তৈরি ব আরোপের অন্তহীন প্রচেষ্টা। আমাদের সমাজের বেশির ভাগ চিকিৎসকই আদর্শগত ভাবে এই এক্সপ্লয়টেশনরে শিকার। নিজেদের তারা ওয়ার্কিং ক্লাসের এমনকি অন্য পেশার ওপরেই ভাবতে ভালবাসেন। এই মানসিকতা তাদের এক্সপ্লয়েট করতে আরও সাহায্য করে। অনেকেই অতিরিক্ত শ্রম দেবার পরও নানা সেবামূলক, স্বেচ্ছাসেবী কাজে জড়িয়ে পড়েন, সুনাম আর খ্যাতির জন্য কাঙালিপনা করেন, এমনকি অবসরের পরও আরও বেশি বেশি কাজ করেন নিজেদের পেশার মহত্ব প্রমাণ করবার জন্য। এই পেশাগত মহত্ত্ব তাদের নিজেদের মধ্যেও নানা ভাবে বিভেদ সৃষ্টি করতে থাকে। কেউ সরকারি কেউ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, কেউ কম বেতনে কেউ অতিরিক্ত বেতনে, কেউ ইউনিয়ন করেন কেউ কেবল এমপ্লয়ি, আর রাজনীতি তো আছেই। তাদের এক অংশ কিছুটা ক্ষমতাবান আরেক অংশ ক্ষমতাহীন। এবং তারা এভাবে ক্রমেই বিভক্ত হতে থাকেন।

এই সময়ে, এক বিরাট বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়ে এই কঠিন সত্যের পর্দা ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হচ্ছে। আমরা দেখতে পেলাম যে একটা বিপর্যয় বা দুর্যোগে একজন চিকিৎসক কতটা সুরক্ষা পাবেন, কতটা নিরাপদ থাকবেন বা কীভাবে সামাল দেবেন তার চাবিকাঠি তার নিজের কাছে নয়, বরং বিভিন্ন হুকুমদাতা প্রতিষ্ঠান, করপোরেট আর আমলা ভিত্তিক কতৃপক্ষের হাতে, নিজের জীবনের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ এই সব সিদ্ধান্ত মোটেও তাদের নিজেদের নয়। এই জরুরি অবস্থায় একজন কারখানা কর্মী, একজন গ্রসারির দোকানদার বা একজন কৃষকের মতই তিনি একজন এসেনিশয়াল ওয়ার্কার মাত্র। তাকে সব ঝুকিঁ নিয়ে কাজে যেতে হচ্ছে কেবল। যদিও এরকম একটা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ের মোকাবিলার নেতৃত্বে তাদের থাকার কথা ছিল, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বা বাস্তবায়নে থাকার কথা ছিল সামনের সারিতে। কিন্তু তারা নেমে এসেছেন শ্রমজীবিদের কাতারে, যেখানে তিনি কেবল হুকুম তামিল করবেন।

অবশ্য নিঠুর হলেও এই সত্য উন্মোচনের কিছু লাভও আছে। এটা স্বাস্থ্যকর্মীদের নিজেদের মধ্যেকার বিভেদ আর দুরত্ব দূর করার একটা সুযোগ। দুনিয়া জুড়ে নানা লেভেলের স্বাস্থ্যকর্মীরা- চিকিৎসক, নার্স, পরিচ্ছন্নতাকর্মি, টেকনিশিয়ান ও আরও সংশ্লিষ্ট অনেকে, এ সময়ে এসে একতাবদ্ধ হচ্ছেন কিছু অভিন্ন দাবীতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নার্সদের ইউনিয়ন থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী আর সংগঠিত আন্দোলন গড়ে উঠছে আর এতে সানন্দে বিভেদ ভুলে যোগ দিচ্ছেন চিকিৎসকরাও। চাকুরি হারানো, ছাঁটাই, বেতন না দেয়া, অবরুদ্ধ করে রাখা, সামাজিক উচ্ছেদ আরও নানা কিছুর বিরুদ্ধে এক সাথে কথা বলতে শুরু করেছেন সব শ্রেণীর স্বাস্থ্যকর্মীরা। স্বাস্থ্য খাতে ঐক্য বা সলিডারিটির এক উদাহরণ তৈরি হতে যাচ্ছে। নিজেদের উচ্চ আয় আর চাকুরির নিরাপত্তা থেকে যে আত্নশ্লাঘা ছিল চিকিৎসকদের মধ্যে তা থেকে তারা শ্রেণীচ্যুত হচ্ছেন আর এখন গোটা কমিউনিটির সাথে তাদের সংহতি হতে যাচ্ছে।

আসছে দিনগুলোয় এই সংহতি আর ঐক্য কেবল সকল স্বাস্থ্যকর্মিকেই ক্ষমতাবান করবে না, বরং পুজিঁবাদী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিপরীতে মানুষের অধিকারের কথা বলতে শেখাবে। বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যে আসলে উপশমের চাইতে মুনাফাকেই বেশি গুরুত্ব দেয় আর জনস্বাস্থ্যের কল্যাণকামী ধারণাকে নস্যাৎ করতে চায় তা এর আগে এত স্পষ্ট ভাবে দেখা হয় নি কারো। তার চাইতে বড় কথা হাসপাতালে কে আগে টেস্ট করার বা ভর্তি হবার সুযোগ পাবে বা কে ভেন্টিলেটর পাবার যোগ্যতা রাখে তা নিয়ে বিশ্ব জুড়ে যে নিকৃষ্ট রেসিজম, সেক্সিজম আর আর্থিক সক্ষমতার বৈষম্যের নজির তৈরি হল তা পুজিঁবাদের নগ্নতা প্রকাশ করে দিয়েছে।
কোভিড১৯ আমাদের গোটা স্বা্সথ্য ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর এক সুযোগ এনে দিয়েছে। লাভ বা মুনাফা নয়, কমিউনিটির ইচ্ছা আর চাহিদার আলোকে এই নতুন ব্যবস্থা গড়ে উঠুক। মার্ক্স এর মতে, বিপ্লব হাসিল করার জন্য ওয়ার্কিং ক্লাসকে লাভের জন্য উৎপাদনের ধারণা থেকে সরিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে তা হল অবকাঠামো আর রিসোর্স।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মানেই কেবল এগুলো নয়। আরও গভীর কিছু।
সন্দেহ নেই যে এক ভীতিকর, ট্রাজিক এবং গোলমেলে সময় পার করছি আমরা। ক্রমশ জানছি যে মানুষের জীবন আর পৃথিবী নামের এই গ্রহের ভবিষ্যতের চেয়ে পুজিঁবাদী সমাজ তার টিকে থাকাটাকে বেশি মূল্যবান মনে করে। আশা করি মহামারি কেটে গেলে চিকিৎসকরা এই সমাজে তাদের শ্রেণীগত অবস্থানকে পুর্নমূল্যায়ন করবেন এবং সকল স্বাস্থ্য কর্মী বা ওয়ার্কারদের সাথে সংহতি প্রকাশ করবেন। একটা বৈষম্যহীন সমঅধিকারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলবার নেতুত্ব এবার তাদেরই দিতে হবে।

অনুবাদ: তানজিনা হোসেন, চিকিৎসক ও কথাসাহিত্যিক।
সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ। গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ।

Facebook Comments

Related Articles