নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে খরচ কম, তবু কয়লাতেই আস্থা সরকারের

সৌর ও বায়ুর মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের খরচ প্রতিবছর ১৩ শতাংশ করে কমছে। গত ১০ বছরে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ৮২ শতাংশ আর বায়ুবিদ্যুতের ৩৯ শতাংশ কমেছে। ফলে নতুন যেসব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে, তার উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে নতুন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে খরচ কম। বিশ্বে পাঁচ লাখ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তে যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়, তাহলে বছরে ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাশ্রয়ের পাশাপাশি ১৮০ কোটি টন কার্বন নিঃসরণ কম হবে। সে ক্ষেত্রে পৃথিবীতে মোট কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ পাঁচ ভাগ কমে আসবে।

গত মঙ্গলবার জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিনিউবল এনার্জি এজেন্সির (আইআরইএনএ) এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়। বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর ১৮৩টি দেশ এ সংস্থার সদস্য।

আইআরইএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ গড়ে ৬ দশমিক ৮ (প্রতি সেন্ট ৮৫ পয়সা ধরলে বাংলাদেশি টাকায় ৫ টাকা ৭৮ পয়সা হয়)। প্রতিবছরে এ উৎপাদন ব্যয় গড়ে ১৩ শতাংশ হারে কমছে। স্থল ও সাগরভাগে স্থাপিত বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয়ও প্রতিবছর কমছে। স্থলভাগে স্থাপিত বায়ুবিদ্যুতের ইউনিট–প্রতি উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩ সেন্ট (৪ টাকা ৫০ পয়সা) ও সাগরভাগে স্থাপিত কেন্দ্রের ব্যয় ইউনিট–প্রতি ১১ দশমিক ৫ সেন্ট (৯ টাকা ৭৭ পয়সা)। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে যেসব সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসবে, তার ব্যয় আরও কমে যাবে। সারা দুনিয়ায় আগামী বছর স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয় হবে ৩ দশমিক ৯ সেন্ট (৩ টাকা ৩১ পয়সা), যা ২০১৯ সালের ব্যয় থেকে ৪৩ ভাগ কম।

আইআরইএনএ সদস্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চিলি, ইথিওপিয়া, মেক্সিকো, পেরু জানিয়েছে, এখনই তাদের দেশে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ৩ সেন্টের নিচে রাখা সম্ভব। তবে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় কিছুটা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। বলা হয়, আগে প্রতি ইউনিট জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় ছিল ৪ দশমিক ৭ সেন্ট (৩ টাকা ৯৯ পয়সা), যা ১০ বছর আগে ছিল ৩ দশমিক ৭ (৩ টাকা ১৪ পয়সা) সেন্ট।

আইআরইএনএ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগে তেল-কয়লার মতো জ্বালানি থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ছিল ৭ দশমিক ৬ সেন্ট (৬ টাকা ৪৬ পয়সা), যা এখন ৬ দশমিক ৬ সেন্ট (৫ টাকা ৬১ পয়সা)। তবে জীবাস্ম জ্বালানির এই হিসাব সারা দুনিয়ার ক্ষেত্রে গড়। যে দেশে নিজেদের কয়লা ও তেল রয়েছে, সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ কম। আর বাংলাদেশের মতো দেশে সেই খরচ আরও বেশি। কারণ বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিলের সঙ্গে জ্বালানির মূল্য, কেন্দ্রভাড়া (বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকলেও দেওয়া হয়), বিদ্যুৎতের মূল্য ও কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ দেওয়া হয়। ফলে বাংলাদেশে আমদানি করা কয়লা দিয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে সাড়ে আট টাকা থেকে নয় টাকা পড়ছে।

আইআরইএনএ প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, সারা দুনিয়ায় সৌরবিদ্যুতের ব্যয় কমে গেছে কিন্তু বাংলাদেশে সেটা ১৩ সেন্ট ও ১০ সেন্টের নিচে নামছে না। সে কারণে সরকারিভাবে আপাতত সাড়ে ছয় শ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি সংস্থা সৌরবিদ্যুৎ ব্যর্থ হওয়ায় এখন সরকারি ব্যবস্থাপনায় কয়েক বছরের মধ্যে অন্তত ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে।

মন্ত্রী বলেন, ১০ বছরে সস্তার জ্বালানি কয়লাকে হার মানিয়ে দিয়েছে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ। সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম কয়লার থেকে কম। অথচ বাংলাদেশ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র নির্মাণে জোর দিয়েছে। তিনি বলেন, আমদানি করা কয়লা দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম অনেক বেশি পড়বে, অন্যদিকে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের কারণে পরিবেশের ভয়াবহ ক্ষতি হবে। এর সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যজনিত ক্ষতি যোগ করলে ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বাড়বে।

শুধু উৎপাদন নয় কেন্দ্র নির্মাণের খরচও কমেছে

আইআরইএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু উৎপাদনে নয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয়ও কমে গেছে। ২০১০ সালে ইউনিট–প্রতি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে খরচ পড়ত ৪ হাজার ৬৯৫ ডলার। সেটি ২০১৯ সালে এসে মাত্র ৯৯৫ ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। আর স্থলভাগে বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ২০১০ সালে খরচ ছিল ইউনিট–প্রতি ১ হাজার ৮৪৯ ডলার, যা এখন ১ হাজার ৪৭৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের সঙ্গে কয়লা, তেল, গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র নির্মাণের তুলনা করলে এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে খরচ কম। তা ছাড়া সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা কেন্দ্র ভাড়া দেওয়া হয় না। বিদ্যুৎ না দিলে বিল নেই বা নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট শর্তে বিদ্যুৎ কিনে থাকে সরকার।

বাগেরহাটের রামপালে সুন্দরবনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে ও দীর্ঘদিন নবায়নযোগ্য জ্বালানির পক্ষে আন্দোলনকারী সংগঠন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জতীয় কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকির বিষয়টি ধরলে কয়লা ও পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় সব সময়ই অনেক বেশি ছিল। আর এখন তো দেখা যাচ্ছে, এসব ঝুঁকি বাদ দিয়ে শুধু উৎপাদন ব্যয় ধরলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাম কম। সরকারের উচিত বিদেশিদের স্বার্থ না দেখে দেশের অর্থনীতি, মানুষ ও পরিবেশের স্বার্থ দেখা। তাহলেই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে এ দেশে ভালো কিছু করা সম্ভব।

Facebook Comments

Related Articles