নটরডেম কলেজে কেন পড়বো? পর্ব-২

সোমবার, ৮ জুন, ২০২০

গত সপ্তাহে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলো। পরীক্ষার্থীর আন্তরিক চেষ্টার পরে ফলাফল যত পয়েন্টই হোক না কেন, আমার কাছে সেটাই ভালো ফলাফল। চেষ্টার উপরে তো কিছু নাই। তবে যারা ফাঁকিবাজি করে আর অলসভাবে সময় কাটিয়ে খারাপ ফল করে এখন সহানুভূতি কুড়ানোর চেষ্টা করছে, তাদের জন্য কোন সমবেদনা প্রকাশ করতে পারছি না।


যাই হোক, যেহেতু ফলাফল প্রকাশ হয়েই গেল আর সব কিছু ধীরে ধীরে খুলেও দিবে, তাই ধরে নেওয়া যায় কলেজ ভর্তিরও দেরি নেই। আমি আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতাটুকু ভাগ করে সবাইকে জানাতে চাই কেন ছেলেদের নটরডেম কলেজে পড়া উচিত। যেহেতু মেয়েদের পড়বার উপায় নাই আর মেয়েদের জন্য অনেক ভালো ভালো কলেজ আছে, সেসব কলেজের অভিজ্ঞরা হয়তো সে ব্যাপারে জানাতে পারবেন।


ক্যাডেট কলেজে রিটেনে টিকেও যখন মেডিকেলে আউট হয়ে হয়ে গেলাম চোখের সমস্যাজনিত কারণে, আমার ক্যাডেট কলেজ পড়ুয়া অগ্রজ আমাকে চিঠিতে জানাল, সমস্যা নাই তুমি ক্যাডেট কলেজে চান্স পাও নাই তো কি হইসে, নটরডেম কলেজে পড়বা! তখন থেকে মনে মনে খুব ইচ্ছা ছিল, ইজ্জত রাখতে হইলে নটরডেমেই পড়তে হবে।

এখন ইজ্জত রাখার জন্যই হোক আর যে কারণেই হোক, মহান আল্লাহর রহমতে আমি ২০১০ সালে নটরডেম কলেজে পড়ার সুযোগ পাই (অবশ্যই ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে) এবং দুই বছর এ কলেজে পড়ে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। পড়াশোনার দিকটা বাদ দিয়ে বাকি দিকগুলোও যদি শুধু বিবেচনা করা হয়, নটরডেম কলেজ যে নৈতিক শিক্ষা দেয় তা এই দেশে কেন, পুরো উপমহাদেশে বিরল! আমার নিজের দেখা কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলি।

প্রথম গার্ডিয়ান মিটিংঃ

আমাদের সময়কার কলেজের অধ্যক্ষ ফাদার বেঞ্জামিন কস্টা (প্রয়াত) প্রথম গার্ডিয়ান মিটিং-এ এক অভিভাবকের ‘জিপিএ ৫ আরও বাড়ানো’ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ঢাকায় আরও অনেক কলেজ আছে যারা রেজাল্ট নিয়ে কনসার্নড। আমরা রেজাল্ট নিয়ে মোটেও মাথা ঘামাই না। জিপিএ কত পেল সেটার থেকে আপনার সন্তান কী শিখতে পারল, এটাই আমাদের কাছে বড়। আপনার যদি এতোই রেজাল্ট নিয়ে সমস্যা থাকে, আপনি টিসি নিয়ে আপনার সন্তানকে সেসব কলেজে ভর্তি করাতে পারেন। আমাদের সমস্যা নাই। এই কথাটার মর্ম সত্যিকার অর্থে আমি কলেজের বাকি সময়টা অনুধাবন করেছিলাম! আপনি এ কলেজে ভর্তি হলে যাচাই করে দেখবেন, আমি মিথ্যা বলছি কি না!

অনেস্টলি ফেলঃ

ফার্স্ট ইয়ারে তখন, ফার্স্ট সেন্ট আপ পরীক্ষা শুরু হয়েছে মাত্র। চলাকালীন অধ্যক্ষ বেঞ্জামিন কস্টা স্যার এসে বললেন, তোমরা প্লিজ কেউ অসদুপায় অবলম্বন করে পরীক্ষা দিও না। তার চেয়ে প্রস্তুতি খারাপ থাকলে ‘অনেস্টলি ফেল’ করে আমার অফিসে এসো, আমি পাশ করানোর ব্যবস্থা করে দিব!

কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়াঃ

উদ্ভিদবিজ্ঞানের ল্যাবে একটা পার্টে কৃষ্ণচূরার ডাইসেকশন করার কথা। কিন্তু কলেজে বেশ কয়েকটি বড় বড় রাধাচূড়ার গাছ থাকবার কারণে রাধাচূড়া ফুল সহজপ্রাপ্য ছিল। এসব চিন্তা করে বায়োলিজি ল্যাব সিদ্ধান্ত নেয় রাধাচূড়া দিয়ে ডাইসেক্ট করানোর। বোর্ডের সিলেবাসে কৃষ্ণচূড়া থাকা সত্বেও রাধাচূড়া দিয়ে ল্যাব করানোর জন্য ল্যাব কর্তৃপক্ষকে যে কতবার দুঃখ প্রকাশ করতে দেখেছি তার হিসাব দিতে পারব না। এই অনুশোচনাপূর্ণ আচরণ চমৎকার বিনয়ের শিক্ষা দেয়, যা সাধারণত কল্পনাও করা যায় না। বায়োলজি ল্যাবের আরেকটা ঘটনা বলি।

তেলাপোকার জন্য আত্মত্যাগঃ

যদি ভুল না বলে থাকি তাহলে ডেমোন্সট্রেটর স্যারের নাম ছিল ‘নির্মল অ্যাসেনসেন’। এই লোকের মতো নিবেদিত লোক খুব কম দেখেছি আমি। তেলাপোকার ডাইসেকশন হবে ল্যাবে। দেখা গেল নির্মল অ্যাসেনসেন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত ভঙ্গিতে তেলাপোকা বিতরণ করছেন। পাশ থেকে এক স্যার বললেন, এই লোক ফজরের সময় থেকে গাবতলী গিয়ে অপেক্ষা করছিল। এই তেলাপোকাগুলো উত্তরবঙ্গের কোন জেলা থেকে পাঠানো। সেগুলো তিনি নিজেই ভোররাতে গিয়ে এনেছেন ছাত্রদের জন্য! ভাবা যায়!?

গাইডেন্স ও জরিমানাঃ

নটরডেম কলেজের কোন দেওয়াল, বেঞ্চ, টেবিল বা চেয়ারে কলম-পেন্সিল বা অন্য কোন কিছুর দাগ পাওয়া যাবে না! অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি। স্কুলের টয়লেটে অমুক প্লাস তমুক লেখে আসা ছেলেগুলো ‘গাইডেন্স’ নামক একটি বিশেষ ডিপার্টমেন্টের কারণে অত্যন্ত ‘ভদ্র’ হয়ে যায়! তো একবার গাইডেন্স ঝটিকা অভিযানে আমার হাইবেঞ্চে কলমের একটা আধা ইঞ্ছি বক্ররেখা পেল (আমি দেইনি, কসম)! সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চাশ টাকার একটা জরিমানা রশিদ ধরিয়ে দিয়ে বলা হলো, সময় করে একাউন্টস সেকশনে গিয়ে জমা করে দিতে। একদম আম্রিকান স্টাইল! সেই রশিদখানা আমার কাছে এখনও আছে!

নটরডেম কলেজ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। আপনাকে বরণ করবার জন্য।

লেখক: আজিমুল হক

“নটরডেম কলেজে কেন পড়বো?” এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের সিরিজের বাকি পর্ব গুলো শীঘ্রই আমরা নিয়ে আসবো এই সময়ের মাধ্যমে। সাথে থাকুন।

প্রথম পর্বের লিংক: https://eisomoy365.com/4732/


“এই সময় ৩৬৫” নিউজ পোর্টাল

আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন::


লাইক দিন: https://www.facebook.com/eisomoy365/ (‘এই সময়’ ফেসবুক পেইজ)


সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে: https://youtu.be/ZBMTaqUNbh4

Facebook Comments

Related Articles