ভাড়াও নিচ্ছে বেশি, দিচ্ছে না টিকিটও

মঙ্গলবার দুপুর ১২ টা ৫ মিনিট। যাত্রাবাড়ীর মোড়। বাস চালকের সহকারী রাজুর বাম হাতে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল। রাজু হাঁক দিচ্ছেন, ‘ওই মিরপুর, মিরপুর।’ যাত্রীরা যখন বাসের ভেতর উঠতে যাচ্ছেন, তখন রাজু তাদের হাতে হ্যান্ড স্যানিটাইজ করছেন। রাজুর মুখে মাস্ক না দেখে এক যাত্রী বললেন, ‘মুখে মাস্ক নেই কেন?’ তখন রাজু পকেট থেকে বের করে মাস্ক পরলেন। রাজুর মতো অপর বাস চালকের সহকারীদের একই অবস্থা। অনেকের মুখে মাস্ক নেই। তবে হাতে আছে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল। তবে অধিকাংশ চালক মুখে মাস্ক পরছেন। তবে কারওরই হাতে গ্লাভস দেখা যায়নি।

যাত্রাবাড়ী থেকে যাত্রী তোলার পর ট্রান্সসিলভা পরিবহনের বাসটি মিরপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয় দুপুর ১ টার দিকে। বাসটি সায়েদাবাদ পর্যন্ত আসার পর বাস চালকের সহকারী রাজু ভাড়া তোলা শুরু করেন।

তখন সোহানুর রহমান নামের এক যাত্রী বাস চালকের সহকারীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘ভাই, এত টাকা ভাড়া রাখলেন কেন। আমি যাব সিটি কলেজের সামনে। আপনি ৪০ টাকা ভাড়া রাখলেন কেন?’
জবাবে রাজু বলেন, ‘আপনি জানেন না, বাসের ভাড়া অনেক বেড়ে গেছে। যাত্রাবাড়ী থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি এখন ৪০ টাকা ভাড়া। ৪০ টাকার কম দিলে হবে না।’ একচোট যাত্রী সোহানুর ও রাজুর মধ্যে কথা-কাটাকাটি চলল।

যাত্রী সোহানুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইচ্ছামতো বাসের ভাড়া আদায় করছে বাসগুলো। অনেক দিন থেকে আমি যাত্রাবাড়ী থেকে মিরপুর রোডে যাতায়াত করি। আগে যাত্রাবাড়ী থেকে মিরপুর পর্যন্ত যেতে ভাড়া লাগত ৩০ টাকা। করোনার এই সময়ে বাসগুলো এখন ভাড়া দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৬০ টাকা আদায় করছে।’

তবে চালকের সহকারী রাজু দাবি করলেন, ‘বাস ভাড়া ৬০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি টাকা আদায় করছি না।’
অপরদিকে, টিকাটুলি যাওয়ার উদ্দেশ্যে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে থেকে ট্রান্স সিলভা পরিবহনে ওঠেন যাত্রী সিরাজুল ইসলাম। বাসটি আসাদ গেটে আসার পর বাস চালকের সহকারী তাঁর কাছ থেকে ৬০ টাকা আদায় করেন।

সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনার এই সময়ে বাসগুলো ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করছে। প্রায় সময় আমি সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল থেকে টিকাটুলিতে যাই। করোনার আগে বাস ভাড়া লাগত ৩০ টাকা। এখন আদায় করছে ডাবল ভাড়া।’ যাত্রী সিরাজুলের মতো আরও অনেক বাসের যাত্রীর অভিযোগ, করোনাকালে বাসগুলো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে।

এই রুটে চলাচলরত বিভিন্ন পরিবহনগুলোও ৬০ শতাংশের বেশি বাস ভাড়া বাড়িয়েছে।

করোনা সংক্রমণরোধে কম যাত্রী নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাসগুলো যাতে যাত্রী পরিবহন করে, সে জন্য বাসের ভাড়া ৬০ ভাগ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। গত ১ জুন থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আন্তজেলা ও দূরপাল্লার রুটে বাস/মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটার ১ দশমিক ৪২ টাকা থেকে ৬০ শতাংশ বাড়বে। আর ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাস/মিনিবাস চলাচলের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ভাড়া প্রতি কিলোমিটার যথাক্রমে ১ দশমিক ৭০ টাকা ও ১ দশমিক ৬০ টাকা থেকে ৬০ শতাংশ বাড়বে।

মঙ্গলবার সরেজমিনে যাত্রাবাড়ী টু মিরপুর রুটে দেখা গেল, সিটিং সার্ভিস হলেও ট্রান্স সিলভা পরিবহন কোনো যাত্রীকে বাসের টিকিট দেননি। বাসগুলো যাত্রীদের কাছ নিয়মের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। তবে বাসগুলো অর্ধেক যাত্রী পরিবহন করার নিয়মটি মেনে চলতে দেখা গেছে।
ট্রান্স সিলভা পরিবহনের একটি বাসের চালক মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে টিকিটের মাধ্যমে বাস ভাড়া আদায় করা হতো। এখন কোনো টিকিটের সিস্টেম নেই। যে কারণে ভাড়া আদায়ের সময় যাত্রীদের কাউকে টিকিট দেওয়া হয় না।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্বে) মো. ইউছুব আলী মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাস ভাড়া আদায় করতে হলে বাস কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই টিকিট দিতে হবে। টিকিট দেওয়া ছাড়া বাসের ভাড়া আদায় করা যাবে না। যেসব বাস টিকিট না দিয়ে বেশি ভাড়া আদায় করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত আজ-কালকের মধ্যে ব্যবস্থা নেবে। যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কোনো সুযোগ নেই।’

টিকিট ছাড়া ভাড়া আদায়ের ব্যাপারে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন প্রথম আলোকে বলেন, ‘টিকিট ছাড়া ভাড়া আদায় বাসগুলো করতে পারে না। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি। সেই বেআইনি কাজটি প্রকাশ্যে দিনের পর দিন বাসগুলো করে আসছে। করোনার কারণে ৬০ ভাগ বাস ভাড়া বাড়ানোর সময় তো বলা হয়নি যে, টিকিট ছাড়া বাস ভাড়া আদায় করা যাবে না। টিকিট ছাড়া বেশি বাসের ভাড়া যারা আদায় করছে, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

Facebook Comments

Related Articles