মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ

করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে ১৮৩ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অযোগ্যদের নিয়োগ দেয়ার জন্য সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স, অভিজ্ঞতাসহ অন্যান্য বিষয় শিথিল করা হয়েছে। নিয়োগ বাণিজ্য বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ভেরিফাইড নয় এমন আইডি থেকে তথ্য চাওয়া হয়েছে। এ ধরনের নিয়োগে জনপ্রতি ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। করোনা পরীক্ষায় দক্ষ জনবল সংকট কাটাতেই এদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তাদের দক্ষতা মান অনুযায়ী না হওয়ায় সংকট খুব বেশি কাটবে বলে মনে করেন না জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এর আগে কোভিড-১৯ রোগীদের সেবায় নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত নার্সদের পদায়নে দুর্নীতি হয়। করোনার শুরুতে চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য মাস্ক, পিপিইসহ স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনায় বড় ধরনের দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। এসব কারণে দেশের স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রাষ্ট্রের বিপুল অর্থের ক্ষতিসাধন হচ্ছে। আর দুর্ভোগ বয়ে বেড়াচ্ছেন দেশের সাধারণ মানুষ। করোনার মহামারীর মধ্যেও স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি থামছে না। নিয়োগ, পদায়ন এবং কেনাকাটা- সবকিছুতেই দুর্নীতি জড়িয়ে আছে। দুর্নীতি দমন কমিশন এরই মধ্যে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির তদন্তে মাঠে নেমেছে।

সামগ্রিক বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) এবং মন্ত্রণালয়ের কোভিড-১৯ সংক্রান্ত ফোকাল পার্সন মো. হাবিবুর রহমান বলেন, টেকনোলজিস্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি কোনো অনৈতিক লেনদেন হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এসব অনিয়ম কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। ডাক্তার ও রোগীদের খাবারের বিষয়ে তিনি জানান, এ বিষয়ে তাকে কেউ অবহিত করেননি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, দেশের করোনা আক্রান্তদের নমুনা পরীক্ষার আওতা বাড়াতে সোমবার ১২ শ মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ ২৮১৭টি পদে নিয়োগের অনুমোদন চূড়ান্ত হয়। তবে শুরুতেই বিশেষ ব্যবস্থায় ১৮৩ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। অধিদফতরের মহাপরিচালক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় তড়িঘড়ি এই নিয়োগ সম্পর্কিত কাজ শেষ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে অধিদফতরের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জড়িত। যিনি বর্তমানে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত। এক্ষেত্রে জনপ্রতি মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা যুগান্তরকে জানান।

আর্থিক লেনদেন সম্পর্কিত সংক্রান্ত একাধিক অডিও রেকর্ড গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। এই অডিওতে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পরিষদের মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সামছুর রহমান কথা বলছেন একজন বেকার মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সঙ্গে। সেখানে তিনি বারবার সংগঠনের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি আশিকুর রহমানের অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। কথোপকথনে বলা হয়, ‘চাকরি কনফার্ম হলে টাকা, নইলে নয়। তারা যোগাযোগ করেছে, ২শ’র মতো লোক নেয়ার কথা। জনপ্রতি ১০ লাখের নিচে হলে হবে না। যাদের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট হবে তাদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বয়স শিথিল করা হবে। সংগঠনের মাধ্যমে যারা যাবে, তাদের টাকার সিকিউরিটি সংগঠন দেবে। আজকের মধ্যে তালিকা দিতে হবে। আমাদের টার্গেট যারা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছে, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুযোগ দেয়া হবে। এসব কাউকে বলা যাবে না।’ অপর একটি অডিও রেকর্ডে এক চাকরি প্রার্থীকে বলা হয়, ‘তুমি রাজি থাকলে টাকা রেডি করো, সময় নেই।’ এই অডিও রেকর্ড প্রমাণ করে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এই নিয়োগ সম্পন্ন হচ্ছে। এখানে সদ্যঘোষিত বঙ্গবন্ধু মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান ২০০ জনের টার্গেট নিয়ে কথা বলেছেন। তার মধ্যে ১৮৩ জন নিয়োগ পাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে আশিকুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে এ ধরনের কিছু আমরা করিনি। নিয়োগের সঙ্গে কারা জড়িত, সেটাও আমি বলতে পারব না। এটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানে। তবে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পরিষদের প্যাডে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত কাজ করতে ইচ্ছুকদের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

সূত্রঃ যুগান্তর

Facebook Comments

Related Articles