সন্দেহে মৃত্যু, না জানার হিসাব-নিকাশ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনাভাইরাস আক্রান্ত (কোভিড–১৯) রোগী ভর্তি করা শুরু হয় গত ২ মে। ১৪ দিনের মধ্যে রোগটির উপসর্গে ভোগা ১২১ জন মারা যান। তাঁদের ১৮ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। বাকিদের দাফন ও সৎকার হয় কোভিডে আক্রান্ত সন্দেহে, একই সতর্কতায়।

প্রথম আলো দেশের ৬৪ জেলার প্রতিটিতে অন্তত একটি কবরস্থান বা শ্মশানে ২৮ মার্চ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত মৃত্যুর হিসাব নিয়েছে। এই অনুসন্ধান বলছে, এ সময় কোভিডে আক্রান্ত সন্দেহে অন্তত ৮৬৪ জনের দাফন ও সৎকার হয়েছে। গড়ে দিনে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ১২ জনের বেশি। সরকার কোভিড-১৯ রোগে মৃত ব্যক্তিদের নিরাপদ সৎকারের জন্য নির্দেশনাটি জারি করেছে গত ১৫ মার্চ। রোগটির উপসর্গ, অর্থাৎ জ্বর, কাশি, সর্দি বা শ্বাসকষ্টে ভোগা কারও মৃত্যু হলে একই নিয়ম মেনে দাফন ও সৎকার করা হয়।

মরদেহ থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করার নিয়ম আছে। এই ৮৬৪ জনের প্রায় অর্ধেকের ক্ষেত্রে পরীক্ষার কথা জানা যায়নি অথবা তা হয়নি। কেবল একটি ছোট অংশের মরণোত্তর কোভিড নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিন কোভিডে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের হিসাব দেয়। এখন পর্যন্ত সংখ্যাটা সর্বোচ্চ ৪৫। অধিদপ্তর ১৮ মার্চ থেকে মোট মৃত্যুর হালনাগাদ হিসাবও দিচ্ছে। গতকাল সেই সংখ্যাটা হাজার ছাড়িয়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যানে মরণোত্তর শনাক্তকরণের হিসাব আলাদা করা থাকে না।

প্রথম আলোর অনুসন্ধান বলছে, কোভিডে সন্দেহভাজন অনেক মৃত্যুর মতোই মরণোত্তর শনাক্তকরণের তথ্যও চোখের আড়ালে রয়ে যাচ্ছে। গণমাধ্যমে কোভিডের লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হচ্ছে, তবে বিক্ষিপ্তভাবে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা অবশ্য প্রথম আলোকে বলেন, এটা ইনফ্লুয়েঞ্জা আর ডেঙ্গুরও মৌসুম। সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে কোভিডের উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তিকে একই বিধি মেনে দাফন ও সৎকার করা হচ্ছে। সব সময় পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। তাঁদের সংক্রমণ ছিল কি ছিল না, তা বলা কঠিন।

এদিকে দাফন ও সৎকারের হিসাব নিয়েও দুই রকম তথ্য আছে। ঢাকা-চট্টগ্রামে দায়িত্বপ্রাপ্ত চারটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রথম আলোকে অনুসন্ধানকালে তাদের দাফন ও সৎকারের যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, সেটা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রের দেওয়া মোট হিসাবের চেয়ে যথেষ্ট বেশি।

অনুসন্ধানের ইতিবৃত্ত
প্রথম আলোর প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা দেশের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে কবরস্থান বা শ্মশানে দাফন ও সৎকারকাজ সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ওই ব্যক্তিরা তাঁদের খাতা থেকে কোভিডে আক্রান্ত সন্দেহে দাফন ও সৎকার হওয়া ব্যক্তিদের তথ্য দিয়েছেন।

তবে এই সমন্বয়কারীরা বলেছেন, এর বাইরে আরও দাফন ও সৎকার হয়ে থাকতে পারে। মানুষ সংক্রমণের ভয়ে কখনো লাশ পথেঘাটে ফেলে যায়, অনেক সময় তথ্য গোপন করে।

সরকার ঢাকায় কোভিড আক্রান্ত বা কোভিড সন্দেহে মৃত ব্যক্তির দাফনের জন্য প্রথমে খিলগাঁও কবরস্থানকে নির্দিষ্ট করে। এলাকাবাসী প্রথমে প্রতিরোধ করেছিল। পরে সমঝোতা হয়। তবে কবরস্থানে পানি ওঠার কারণে ৩০ এপ্রিল থেকে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফনের কাজ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দাহ করা হচ্ছে পোস্তগোলা শ্মশানে।

কোভিডে আক্রান্ত সন্দেহে সবচেয়ে বেশি দাফন ও সৎকার হয়েছে ঢাকা মহানগরে। পুরো জেলায় এমন দাফন ও সৎকার হয়েছে অন্তত ২২৪ জনের, ২০৫ জনেরই মহানগরে। তাঁদের ১২৩ জনের দাফন হয়েছে রায়েরবাজারে। আর খিলগাঁওয়ে হয়েছিল ৫২ জনের। পোস্তগোলায় দাহ করা হয়েছে ৩০ জনকে।

এ ছাড়া কেরানীগঞ্জ উপজেলায় কোভিড সন্দেহভাজন অন্তত ১৭ জনকে আর নবাবগঞ্জে উপজেলায় দুজনকে দাফন করা হয়। এই প্রতিবেদক মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরসহ একাধিক কর্তৃপক্ষের কাছে খোঁজ করেছেন, কিন্তু ঢাকা জেলার এই মৃত ব্যক্তিদের মরণোত্তর করোনা পরীক্ষা সম্পর্কে কোনো তথ্য পাননি।

বাদবাকি ৬৩ জেলায় একইভাবে কোভিডে আক্রান্ত সন্দেহে অন্তত ৬৪০ জনকে দাফন ও সৎকারের হিসাব পাওয়া গেছে। জেলা কর্তৃপক্ষের সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, তাঁদের ৮৪ শতাংশের মরণোত্তর নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।

ফলাফল খোঁজ করে জানা যায়, অর্ধেকের মতো ব্যক্তির দেহে সংক্রমণের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। কোভিড হয়েছিল ১২২ জনের। ৬ জুন পর্যন্ত ছোট একটা অংশের পরীক্ষার ফল জানা যায়নি। আরও ১০২ জনের পরীক্ষার ব্যাপারে কিছুই জানা যায়নি।

নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কাজে যুক্ত সরকারি-বেসরকারি অন্তত ২০ চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী বলেছেন, মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নমুনা নিতে হয়। নমুনা সংগ্রহে ত্রুটি থাকলে কোভিড ধরা না-ও পড়তে পারে। পরীক্ষার চাপ বাড়ায় এখন মৃতের জন্য নমুনা সংগ্রাহকই পাওয়া যাচ্ছে না।

নারায়ণগঞ্জ জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সদস্যসচিব ও জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ইমতিয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, মার্চের শুরুর দিকে মৃত ব্যক্তির নমুনা নেওয়া হতো। তারপর থেকে আর নেওয়া হচ্ছে না। চট্টগ্রামেও সংশ্লিষ্টজনেরা বলেছেন, মৃত ব্যক্তির নমুনা নেওয়া হয় না। দুটি জেলাতেই সংক্রমণের ঝুঁকি ব্যাপক।

সংবাদে সন্দেহভাজন মৃত্যু

করোনা পরিস্থিতি নিয়ে দেশের ২৫টি গণমাধ্যমের সংবাদ বিশ্লেষণ করেছে বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি (বিপিও)। এটি জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ (সিজিএস) বিভাগের একটি প্রকল্প।

বিপিওর বিশ্লেষণ বলছে, ২৮ মার্চ থেকে ৩০ মে সময়কালে দেশে কোভিডের লক্ষণ বা উপসর্গ নিয়ে ৭২০ জনের মৃত্যু ঘটেছে। বিশ্লেষণ আরও বলছে, পর্যবেক্ষণের শেষ ছয় সপ্তাহ ধরে এমন মৃত্যুর সংখ্যা কমে এসেছে। সবশেষ সপ্তাহে ৫৪ জনের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছে, যাঁদের কোভিডের লক্ষণ ছিল কিন্তু শনাক্ত হয়নি।

বিভাগটির পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, করোনা পরীক্ষা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শনাক্তকরণ বাড়ছে। তাতে কোভিডের সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা কমছে। তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ মিলিয়ে দিনে অন্তত ৩৫ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা দরকার।

তবে নেদারল্যান্ডসের গ্রনিঙ্গেন ইউনিভার্সিটির স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী অনুপম সৈকতের নেতৃত্বে একটি দল ২৫টি অনলাইন গণমাধ্যমের খবর বিশ্লেষণ করে কোভিড সন্দেহে ৯০০ জনের মৃত্যুর হিসাব দিচ্ছে। এই গবেষণার পর্যবেক্ষণকাল মার্চ থেকে ৩১ মে।

গবেষণাটি বলছে, মৃত ব্যক্তিদের বড় অংশ মারা গেছেন হাসপাতালে ভর্তির পর। এক-চতুর্থাংশের মতো ব্যক্তি মারা গেছেন বাসায়। আর বাসার বাইরে, রাস্তার ধারে, মসজিদে, বাজারে, উপকূলে, চা-বাগানে, বাসার সামনে অথবা হাসপাতালের বাইরে মরে পড়ে ছিলেন ২১ জন। কেউ ধারেকাছে ঘেঁষেনি। পুলিশ বা প্রশাসন গিয়ে লাশ উদ্ধার করেছে।

দাফন ও সৎকার মোট কত

দাফন ও সৎকারে সার্বিক সহযোগিতার বিষয়টি তত্ত্বাবধান করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) মো. সাইফুল্লাহিল আজম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকার চারটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে সরকার কোভিড বা কোভিড সন্দেহে মৃত ব্যক্তিদের দাফন ও সৎকারের অনুমতি দিয়েছে। চট্টগ্রামেও এমন একটি সংস্থা আছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেছেন, মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ২৯ মার্চ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা মোট ৯১৩ জনকে দাফন ও সৎকার করেছে। কর্মকর্তাটি বলেন, অল্প কয়েকজন বাদে মৃত ব্যক্তিদের সবাই কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত ছিলেন।

সরকার অনুমোদিত ঢাকায় তিনটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হচ্ছে আল মারকাজুল ইসলাম, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন ও রহমতে আলম সমাজকল্যাণ সংস্থা। চট্টগ্রামেরটি হলো আল মানাহিল ফাউন্ডেশন। এই চার সংস্থা মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত মোট ১ হাজার ২৮৩টি মরদেহ দাফন ও সৎকারের হিসাব দিচ্ছে। এর মধ্যে কোভিড শনাক্ত ও সন্দেহভাজন দুই-ই আছেন।

আল মারকাজুল ইসলাম ও কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন এক হাজারের বেশি দাফন ও সৎকার করেছে। আল মানাহিল দাফন ও সৎকার করেছে ১৩৫টি মরদেহ। মাত্র কাজ শুরু করেছে ঢাকার আরেকটি সংস্থা, আল রশীদ। তবে এগুলোর বাইরেও দাফন ও সৎকারকাজে শামিল আছেন বিভিন্ন সংগঠন ও প্রশাসনের ব্যক্তিরা।

গত ১৩ এপ্রিল করোনায় সংক্রমিত সন্দেহে মাকে গাজীপুরের জঙ্গলে ফেলে রেখে গিয়েছিলেন সন্তানেরা। উপজেলা প্রশাসন তাঁকে উদ্ধার করে। কখনো মৃত স্বজনের দাফন ও সৎকারেও পরিবারের লোকজন পিছিয়ে যান। তখন স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ বা রাজনৈতিক দলের কর্মীরা এগিয়ে আসেন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার যেমন নিজের উদ্যোগে ৬১টি মরদেহ দাফন ও সৎকার করেছেন।

পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল আলম ৭ জুন একটি দাফনের পর সারা রাত ঘুমাতে পারেননি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মৃত ব্যক্তিটির করোনা সংক্রমণের কথা নিশ্চিত ছিল না। অথচ তাঁকে গোসল দেওয়ার জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি।

কোভিড-১৯-বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটির উপদেষ্টা অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, যাঁরা মারা যাচ্ছেন, হয়তো তাঁদের রোগটি হয়েছিল, হয়তো হয়নি। মৃত্যু-পরবর্তী নমুনা পরীক্ষার ফল এদিক-ওদিক হতেই পারে। এমনিতেও করোনা পরীক্ষার নিশ্চয়তা শতভাগ নয়। তারপরও দ্রুত পরীক্ষার আওতা বাড়ানো গেলে রোগটির পরিস্থিতি আলোয় আসবে।

Facebook Comments

Related Articles