ওয়েবসাইট-ডাটাবেজ-সফটওয়্যারে বিশ্বের সর্বোচ্চ খরচ করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে পিপিই, ভেন্টিলেটর, মাস্ক, গগলসসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু চলমান মানবিক দুর্যোগের সময় যেখানে চিকিৎসা উপকরণের দিকে জোরালো নজর দেওয়া দরকার, সেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বেশি ঝোঁক চিকিৎসাবহির্ভূত খাতে। চিকিৎসা সরঞ্জামে যত টাকা খরচ করা হচ্ছে, তার চেয়ে তুলনামূলক বেশি টাকা খরচ হচ্ছে সফটওয়্যার, ওয়েবসাইট, সেমিনার, কনফারেন্স ও পরামর্শক খাতে। আর চিকিৎসা সামগ্রীর ক্রয়ে যে দাম ধরা হয়েছে তা অস্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অর্থায়নে প্রকল্প দুটির পরিচালক (পিডি) অধ্যাপক ড. ইকবাল কবির, তাকে স্বাস্থ্য খাতের লুটপাটের জনক হিসেবে সবাই চিনে । তিনি সাবেক ছাত্রদলের ক্যাডার ছিলেন, এমনকি বর্তমান ড্যাব নেতা।

দেখা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে করোনা মোকাবেলার প্রকল্পে স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনার চেয়ে সফটওয়্যার, ওয়েবসাইট, সেমিনার, কনফারেন্স ও পরামর্শক খাতে তুলনামূলক বেশি খরচ হচ্ছে। গবেষণার জন্য খরচ হবে ২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ইনোভেশন নামের আলাদা একটি খাত তৈরি করে সেখানে ৩৬ কোটি টাকা খরচ করা হবে। চলমান করোনা সংকটের মধ্যে যেখানে সব কিছু স্থবির, সেখানে এই প্রকল্পে ভ্রমণ ব্যয় ধরা হয়েছে এক কোটি ২০ লাখ টাকা। মাত্র ৩০টা অডিও-ভিডিও ফিল্ম তৈরির খরচ দেখানো হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ৮০টা সেমিনার ও কনফারেন্স করে খরচ করা হবে দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা। সবচেয়ে বেশি অস্বাভাবিক খরচ দেখানো হয়েছে ওয়েবসাইট উন্নয়ন খাতে। মাত্র চারটি ওয়েবসাইট উন্নয়ন করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খরচ হবে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পাঁচটি ডাটাবেইস তৈরিতে খরচ দেখানো হয়েছে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পাঁচটি কম্পিউটার সফটওয়্যার কেনায় খরচ ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া ৩০টি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জন্য খরচ হবে আরো ৪৫ কোটি টাকা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের আনা-নেওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া নেওয়া হবে। সেই গাড়িভাড়া বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ৩৭ কোটি টাকা। দেশে যতগুলো স্থলবন্দর আছে, সেখানে যাতায়াত করা মানুষের শরীরের তাপমাত্রা দেখতে নির্মাণ করা হবে অনাবাসিক ভবন। সেসব ভবন নির্মাণে খরচ দেখানো হয়েছে ১৯০ কোটি টাকা।

পৃথিবীর সবচেয়ে দামী দুইটি সফটওয়ার হচ্ছে Cry Engine (1.2m$), Unreal Engine 7,50,00$। এই দুইটি সফটওয়্যার হচ্ছে গেম বানানোর সফটওয়্যার। পৃথিবীর তৃতীয় দামী সফটওয়্যারটা হচ্ছে New World System Public Administration (5,00,000$) বিভিন্ন দেশের সরকার এইটা ব্যবহার করে। এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই সফটওয়ার ক্রয় করলেও পাঁচটার দাম হয় ২৫ লাখ ডলার অর্থাৎ ২১ কোটি টাকা। অথচ অধিদপ্তর ৫ টি সফটওয়্যার কিনছেন ৫৫ কোটি টাকা দিয়ে।

একটি ওয়েবসাইট তৈরিতে প্লাটফর্ম, হোস্ট, ডিজাইন, ডেভলাপমেন্ট, ব্রান্ডিং, ওয়েব এপস সব মিলিয়ে বিশ্বের সর্বাধুনিক রিসোর্স এবং ওয়েব এপ ব্যবহার করলেও প্রতিটি সাইটে ১ লাখ ডলারের বেশি খরচ করার উপায় নাই। এ হিসেবে চারটি ওয়েবসাইট তৈরির খরচ ৪ লাখ ডলার বা বাংলাদেশী টাকায় ৬.৫ কোটি টাকা। অথচ ৪ টি ওয়েবসাইটের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খরচ হচ্ছে ১০ কোটি টাকার বেশি।

৩০ টি অডিও-ভিডিও ক্লিপ বানাতে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকার বাজেট। অথচ দেশের সাম্প্রতিককালের ব্যবসা সফল আয়নাবাজি মুভি বানাতে খরচ হয়েছিল ১.৫ কোটি টাকা। দেশের অন্যতম বিগ বাজেটের সিনেমা ‘ঢাকা এটাকের নির্মাণ ব্যয় ৫ কোটি টাকা। দেশের যে কোন স্টুডিওতে সর্বোচ্চমানের অডিও ক্লিপ বানাতে ১ লাখ টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়।

এমন খরচের হিসাব দেখে বিস্মিত পরিকল্পনা কমিশনও। কিন্তু দেশের এই ক্রান্তিকালে প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন দরকার, তাই চিকিৎসা সরঞ্জামের তুলনায় এসব খাত অনাবশ্যক হওয়া সত্ত্বেও প্রকল্পটি অনুমোদন করতে হয়েছে কমিশনের কর্মকর্তাদের।

এডিবির অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পটির নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পে প্রাক্কলন করা খরচের সঙ্গে বেশ কিছু অসংগতি রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের প্রকল্পটিতে অডিও-ভিডিও ফিল্মে যেখানে খরচ দেখানো হয়েছে ১১ কোটি টাকা, এডিবির অর্থায়নের প্রকল্পটিতে একই খাতে খরচ ধরা হয়েছে মাত্র এক কোটি ৫৫ লাখ টাকা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পে গবেষণা খাতে খরচ দেখানো হয়েছে ২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা, এডিবির অর্থায়নের প্রকল্পটিতে সমজাতীয় খাতে খরচ দেখানো হয়েছে মাত্র চার কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া পাঁচটি কম্পিউটার সফটওয়্যার কেনায় খরচ দেখানো হয়েছে ৫০ লাখ টাকা, যেখানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের প্রকল্পটিতে সমানসংখ্যক সফটওয়্যার কেনার খরচ ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। এডিবির অর্থায়নে এই প্রকল্পের আওতায় সেমিনার কনফারেন্স ও ওয়ার্কশপ খাতে ৪৫ কোটি টাকা ধরা আছে।

প্রকল্প দুটির পরিচালক (পিডি) অধ্যাপক ড. ইকবাল কবির গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ‘আমরা একটা দাম ধরেছি। যখন কিনতে যাব, তখন খরচ নিশ্চয়ই অনেক কম হবে। বেশি দাম ধরা মানে তো কিনে ফেলা নয়।’

তথ্যসূত্রঃ কালের কন্ঠ

Facebook Comments

Related Articles