করোনাকালে দিনমজুরদের জন্য কর্মসূচি

বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসে সংক্রমণের তিন মাস হতে চলল। যদিও যথেষ্ট পরীক্ষা করা হচ্ছে না, এখন প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার শনাক্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ জন করে। শুরুতে রাস্তাঘাটে মানুষ মোটামুটি নিয়ম মেনে চলেছে, এই শৃঙ্খলাতে যাতে ঢিলেমি না আসে, রাস্তায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতিও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাকে উৎসাহিত করেছে। শুনছি, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার মতো সমৃদ্ধিশালী দেশের সুপারমার্কেটগুলোয় শুরুতে টয়লেট টিসুর সংকট দেখা দিয়েছিল। আমাদের এই সীমিত সম্পদের, সীমিত আয়ের দেশে মানুষ কতই-না অসাধারণ। আমাদের এই সমস্যা নেই, আমাদের মানবিক গুণাবলি অন্ততপক্ষে সিংহভাগ মানুষের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিতদের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসাযোগ্য।

বিত্তশালী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লকডাউন করার পর তা উঠিয়ে নিয়েছে, আমাদের অর্থনীতিও দীর্ঘদিন লকডাউনে টিকে থাকতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক। করোনাভাইরাসের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, মানুষ বেকার হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে যারা দিনমজুরি করে, তাদের অন্নসংস্থান কীভাবে হবে। বিষয়টি নিয়ে সরকারকে যেমন আশ্বস্ত করার মতো কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, একই সঙ্গে বিত্তবান এবং নানা সংস্থা তার অধীনস্থদের দিয়ে কিছু মানুষকে আর্থিক কিংবা খাদ্যসাহায্যের ব্যবস্থা করবে, এটাও কাম্য। অত্যন্ত আনন্দের বিষয়, ছাত্ররা বেশ কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানও অসহায় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসছে—এই এগিয়ে আসা অব্যাহত থাকুক। আশা করি, আমাদের সাধারণ মানুষের সুবিবেচনাপ্রসূত শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন এবং করোনা সংক্রমণ রোধে সরকারের উপদেশ মানার ফলে খুব দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

করোনার নেতিবাচক প্রভাবে বাংলাদেশ স্বভাবতই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রবাসীরা ফিরে আসছে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রেমিট্যান্সের ওপর। আমাদের খেটে খাওয়া মানুষেরা আরবভূমি, মধ্যপ্রাচ্য এবং মালয়েশিয়ায় কাজ করে। প্রতিটি দেশই এখন করোনার শিকার এবং এই কারণে অনেকেই চাকরি হারাবে। সুতরাং ওই দেশগুলো থেকে আগামী দিনে রেমিট্যান্স কমে আসা অপ্রত্যাশিত নয়। আবার যে দিনমজুরেরা এত দিন কাজ না পেয়ে করোনা–পরবর্তী সময়ে কাজের জন্য বের হবে, তাদের জন্য কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়াও স্বাভাবিক। যেমন তৈরি পোশাক খাতে চাহিদা কমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। সুতরাং এসব মানুষ যাতে প্রতিদিন তাদের শ্রম দিতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। একজন মানুষ যদি এক দিন শ্রম না দিতে পারে, সেই শ্রম কিন্তু এর পরদিন তার থেকে নেওয়া সম্ভব নয়। অথচ কাজ না করলেও কোনো না কোনোভাবে তাকে খাবারের চাহিদা মেটাতে হবেই। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতিতে ওই মানুষটির অবদান হবে ঋণাত্মক।

সুতরাং কোনো মানুষই যাতে তার অনিচ্ছায় দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক হয়ে দেখা না দেয়, তার জন্য খুব শিগগির পরিকল্পনা করতে হবে। গণচীনের প্রত্যন্ত এলাকার শহরে যাওয়ার পথে দেখেছি, সারি বেঁধে শত শত ১৫/২০ তলা ভবন তৈরি হয়েছে। সবই ফাঁকা। তারপরও আরও তৈরি হচ্ছে, কোনো সময়ে কাজে লাগবে। একইভাবে তৈরি হচ্ছে রাস্তার পর রাস্তা, যার শেষ প্রান্তে না আছে কোনো স্থাপনা, না আছে লোকালয়। কখনো হবে, তবে শুধু পরিকল্পনা নয়, এখনই বাস্তবায়িত হচ্ছে।

পত্রপত্রিকায় প্রকাশ, গত বছরের শেষে একনেকের বৈঠকে পাস হয়েছে, ঢাকা শহরের চারদিকে বৃত্তাকার রাস্তা তৈরি হবে ১৩৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের। জানুয়ারিতে শুরু হয়ে শেষ হওয়ার কথা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। আশা করি, তার পাশ দিয়ে বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে চক্রাকার একটি দৃষ্টিনন্দন খালও তৈরি হবে, যা শুধু নৌপরিবহনেই নয়, নৌবিহারেরও সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে, সঙ্গে রাজধানীর পরিবেশে একটি ইতিবাচক ভূমিকাও রাখতে পারে। মস্কো শহরের ভেতর দিয়ে এ রকম একটি নদী আছে। শুধু তাই নয়, গোটা ইউরোপের শহরগুলোর সৌন্দর্যই হলো নদী এবং তার ওপর অনেক দৃষ্টিনন্দন সেতু, যাতে নাগরিকেরা তাদের অবসর সময় উপভোগ করতে আসে।

রাস্তা তৈরির এই শ্রমনির্ভর কাজের কথা আমরা এখন থেকেই ভাবতে পারি। করোনা-পরবর্তী কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থান এখানেই হতে পারে। শুনেছি, বেড়িবাঁধ নাকি ১২০ ফুট চওড়া হবে, এখন হয়তো মাত্রই ৬০ ফুট। তাই বলে বাকি জায়গাটা তো আর এমনিতেই পড়ে থাকবে না। শক্তিশালী মানুষেরা দখল করে নেবে, তাতে ২০ তলা ভবন তৈরি করবে, আইনকে পাশ কাটিয়ে ওই ভবনগুলোর সংখ্যা ও জৌলুশ বৃদ্ধি পাবে। ২০ বছর পর হয়তো আমরা বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে অসংখ্য ২০/২৫ তলা ভবন ভেঙে ফেলব। সঙ্গে সঙ্গে শুধু সেই মালিকেরাই নয়, গোটা দেশও দরিদ্র হবে। সুতরাং এই বেআইনি কাজ কেন করতে দেব, কেন বাংলাদেশকে ক্ষতির সম্মুখীন করব?

গত জানুয়ারিতেই যে কাজ শুরু হওয়ার কথা, সেই কাজকে বেগবান করার জন্য করোনা-পরবর্তী কর্মসংস্থানের নেতিবাচক পরিস্থিতি বিবেচনা করে কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা এখনই প্রণয়ন করা উচিত। একই সঙ্গে পৃথিবীর গড়ের ২৪ গুণ বেশি জনঘনত্বের দেশে আবাসনের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণের কথা চিন্তা করা উচিত, যা একক কোনো নাগরিকের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার বৃত্তাকার বহুতল ভবন নির্মাণ করে ভেতরে মাঠ, মসজিদ, মন্দির, বাজারহাট, স্কুল-কলেজের জায়গা রেখে পরিকল্পিতভাবে সামাজিক একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যাতে দুর্লভ ভূমির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হয়, উন্নয়ন-অনুকূল নতুন সংস্কৃতির সূচনা হয়। চীনে আবাসনের জন্য এ রকম শত শত বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে অথচ আমাদের জনঘনত্ব চীনেরও তিন গুণ তাহলে কেন তা হচ্ছে না?

আশা করা যায়, খুব দ্রুতই করোনাভাইরাসের অভিশাপ থেকে আমরা বের হয়ে আসব। তখন আমাদের খেটে খাওয়া মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ যাতে আমরা তৈরি করতে পারি। এই মহামারিকে উন্নয়ন অনুকূল সংস্কৃতির সূচনায় বিপরীতে হিত তৈরি করি।

Facebook Comments

Related Articles