করোনায় নারায়ণগঞ্জে বেকার ৫ হাজার পোশাক শ্রমিক

মহামারী করোনা সংকটকালে নারায়ণগঞ্জে বেশ কয়েকটি গার্মেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পোশাক করাখানা থেকে চলছে শ্রমিক ছাটাই। এতে বেকার হয়েছে প্রায় ৫ হাজার পোশাক কর্মী। গত তিনমাসে ১০টি গার্মেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। এসব গার্মেন্ট বন্ধের পিছনে রয়েছে ব্যাংকের অসহযোগিতা, বায়ার ও অর্ডার কমে যাওয়া, শ্রমিক অসন্তোষসহ নানা কারণ।

বিকেএমইএ ও বিজেএমইএ সূত্রে জানাগেছে, নারায়ণগঞ্জে নীট গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি সচল আছে ৪০০টি এবং ওভেন কারখানা রয়েছে ১৯২টি। এ ছাড়াও নবায়ন ছাড়া আরো ২০০ গার্মেন্ট জেলার বিভিন্ন এলাকায় চালু রয়েছে। প্রাণঘাতি করোনাভাইরাস সংক্রমণকালে গত তিনমাসে বন্ধ হয়ে গেছে, ফকির গ্রুপের নিটিভো এপারেলস, ফতুল্লার টাগারপাড় এলাকার ডিডিএল গার্মেন্ট, পঞ্চবটি বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত সিএসবি ফ্যাশন, এশিয়া ফ্যাশন, সীমা গার্মেন্ট, ফতুল্লার লোহার মার্কেট এলাকার এসপি ফ্যাশন, পাঠানটুলি এলাকার আনোয়ারা গ্রুপসহ বিসিক এলাকার আরো ৩টি গার্মেন্ট। এসব কারখানায় কাজ করত প্রায় ৪ হাজার শ্রমিক। এরা এখন সবাই বেকার হয়ে গেছে।

অন্যদিকে খোঁজ নিয়ে ও শ্রমিক নেতাদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, ভয়াবহ করোনা সংকটকালে নারায়ণগঞ্জের অনেকগুলো গার্মেন্ট পোশাক কর্মীদের কোন কারণ ছাড়াই ছাঁটাই করেছে। এদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ শহরের সম্রাট গার্মেন্ট ৫০ জন, কেয়ার গার্মেন্ট ৫০ জন, ফতুল্লার গাবতলী এলাকার রহমান গার্মেন্ট ২০০ জন, এন আর ফ্যাশন ১০০ জন, শিবু মার্কেট এলাকার রূপসী গ্রুপ ১০০ জন, সিদ্ধিরগঞ্জের এহসান টেক্স ২৩ জন, খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়াম এলাকার ইউরো টেক্স ২০ জন, বিসিক শিল্পাঞ্চলের মার্টিন ফ্যাশন ৩০ জন, ডেইলী কটন ৩০ জন।

এ ছাড়াও সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁ ও রুপগঞ্জের বেশ কয়েকটি গার্মেন্টেও বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ছাটাই করেছে মালিকপক্ষ। শ্রমিক ছাটাইয়ের কারণে প্রায় এক হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে গেছে। গার্মেন্ট বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের কারণে প্রায় পাঁচ হাজার পোশাক কর্মী করোনার এই মহাদুর্যোগে বেকার হয়ে পড়েছে। যদিও এর মধ্যে কিছু শ্রমিক অন্য কয়েকটি কারখানায় নতুন কাজ পেয়ে যোগদান করেছে তবে অধিকাংশই বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাসের দাবিতে আন্দোলন করায় কিছু গার্মেন্ট তাদের চাকরিচ্যুত করেছে। আবার কিছু গার্মেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের বেকার হতে হয়েছে। তাদের অভিযোগ কিছু গার্মেন্ট শ্রমিকদের পাওনা পুরোপুরি বুঝিয়ে দিলেও কিছু গার্মেন্ট অল্প পাওনা দিয়েই তাদের বিদায় করেছে। বেকার হয়ে এখন তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। এই পরিস্থিতিতে কোন গার্মেন্টও নতুন করে শ্রমিক নিচ্ছে না। অনেকেই গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। এভাবে দিন দিন বেকারের সংখ্যা বাড়ছে।

গার্মেন্ট শ্রমিক জাগরণ মঞ্চের সংগঠক জাহাঙ্গীর আলম গোলক কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনা ও লকডাউনের এই ক্রান্তিকালে নারায়ণগঞ্জে হাজার হাজার পোশাক কর্মী বেকার হয়ে পড়েছে যা অমানবিক। এখন তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। তিনি বলেন, অনেক গার্মেন্ট ছাটাই শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিলেও অনেকেই দেয়নি। এক্ষেত্রে তিনি কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি এম এ শাহীন কালের কণ্ঠকে জানান, সরকার এই দুঃসময়ে গার্মেন্ট ক্ষেত্রে ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছে। তবে কেন শ্রমিক ছাঁটাই করতে হবে। এই ছাটাই মানবতাবিরোধী ও অমানবিক। তিনি অবিলম্বে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি করেন।

নীট পোশাক গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম কালের কণ্ঠকে বলেন, গত এক বছরে শ খানেক গার্মেন্ট বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে মালিকরা। তার মধ্যে গত তিনমাসে প্রায় আরো ১০ গার্মেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। এসবের কারণের মধ্যে রয়েছে ব্যাংকের অসহযোগিতা, বিশ্ব করোনা পরিস্থিতি, বায়ার ও অর্ডার কমে যাওয়া। তিনি বলেন, যে শ্রমিকদের ছাটাই করা হয়েছে কল কারখানা পরিদর্শন অধিপ্তরের মধ্যস্থতায় শ্রম আইন অনুযায়ী তাদের পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে।

কল কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিপ্তর নারায়ণগঞ্জের সহকারি মহাপরিদর্শক (সাধারণ) মো. ওমর ফারুক কালের কণ্ঠকে ব্যর্থতার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমরা শ্রম আইনের বাইরে যেতে পারি না। পাওনা নিয়ে যে শ্রমিকরা লিখিত অভিযোগ দেন আমরা তা সমাধানের চেষ্টা করি শ্রম আইনের ভিত্তিতে। তিনি বলেন, যে সকল শ্রমিক এখনও বকেয়া পাওনা বুঝে পাননি তারা আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলে সেটা সমাধানের চেষ্টা করব।

Facebook Comments

Related Articles