জিন প্রকৌশলীরা উপেক্ষিত কেন?

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিষয়টি সিকি শতাব্দী পার করেছে। পাবলিক ও প্রাইভেট মিলিয়ে ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয় পড়ানো হয়। প্রতিবছর প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী এ বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। যাত্রার শুরু থেকেই জীবপ্রযুক্তিবিষয়ক বিভাগগুলো সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শীর্ষস্থানীয় শিক্ষার্থীদের গন্তব্যে পরিণত হয়। সেই ধারা এখনো অব্যাহত আছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এই মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেশের কাজের লাগানোর ব্যাপারে জাতীয় কোনো নীতি এখনো তৈরি হয়নি। দেশের চাকরিবিধিতে বায়োটেকনোলজি বা জীবপ্রযুক্তি বিষয়টিকে উল্লেখ করা হয় না। ফলে, জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে আধুনিক বিষয়টিতে পড়াশোনা করেও দেশের মেধাবী জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ অনেক চাকরিতে অংশ নেওয়ারই সুযোগ পান না।

একুশ শতককে বলা হয় জীববিজ্ঞানের শতাব্দী। স্বাভাবিকভাবেই এর সবচেয়ে অগ্রসর শাখা হিসেবে জীবপ্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থীরা এ সময়ের আধুনিক গবেষণা ও জ্ঞানের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। সেটা হালের সবচেয়ে আলোচিত জিন এডিটিং হোক কিংবা রোগ শনাক্ত বা ওষুধ তৈরি বা ভ্যাকসিন উদ্ভাবন হোক—সব ক্ষেত্রেই জীবপ্রযুক্তি সবচেয়ে অগ্রসর জ্ঞানের চর্চা করে।

সম্প্রতি কোভিড-১৯ সংকটে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপ্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পিসিআর প্রযুক্তি থেকে শুরু করে সিকোয়েন্সিং প্রজেক্ট, কম্পিউটেশনাল অ্যানালাইসিস সব জায়গায় তাঁরা দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। মলিকুলার বায়োলজিবিষয়ক অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে জীবপ্রযুক্তির শিক্ষার্থীরাও দেশের এই ক্রান্তিকালে ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে এসেছেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এই শিক্ষার্থীদের কোনো স্বীকৃতি নেই। সরকারি কোনো প্রণোদনায় তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। শুরু থেকে তাঁরা স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন, এখনো তা-ই রয়ে গেছেন। এই ধারা থেকে নিশ্চিত করেই বলা যায়, ভবিষ্যতে যদি সরকার কোনো নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়, তখনো এসব শিক্ষার্থী উপেক্ষিত থাকবেন।

সাম্প্রতিক কালের এই যে উপেক্ষা এটাকে বলা যায় মাত্র ‘টিপ অব দ্য আইসবার্গ’। দেশে জীবপ্রযুক্তির শিক্ষার্থীরা আরও নানানভাবেই উপেক্ষিত। তাঁদের অর্জিত দক্ষতা ও জ্ঞান বৃহৎ পরিসরে ব্যবহারের না আছে কোনো সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, না আছে বিদ্যমান চাকরির ক্ষেত্রে তাঁদের আত্তীকরণের ব্যবস্থা।

স্বাভাবিক কারণেই, স্নাতকোত্তর প্রাক্তন—এবং বর্তমানে অধ্যয়নরত—শিক্ষার্থীদের ভেতর ক্রমে হতাশা তৈরি হয়েছে। সেই হতাশা যে কেবল তাঁদের চাকরির অপ্রাপ্তি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা ক্যারিয়ার পরিকল্পনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে সেটা নয়, বরং মূল কষ্টটা হচ্ছে এত চেষ্টা–সাধনা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে ওপরের দিকে একটি বিষয়ে পড়াশোনা করেও সেই জ্ঞানটাকে উপেক্ষিত হতে দেখা। অর্থকড়ি হয়তো কোনো না কোনো চাকরি, কোনো ব্যবসা থেকে হয়ে যাবে কারও কারও, হয়তো খেয়েপরে জীবনটা চলে যাবে, কিন্তু নিজের জীবনের সেরা সময়টায় অর্জিত জ্ঞানকে ব্যবহার করতে না পারার আক্ষেপটা আমৃত্যু রয়ে যাবে।

এত বছরেও জীবপ্রযুক্তি বিষয় থেকে স্নাতক/স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে কোথায় কোথায় নিযুক্ত হবেন, তার কোনো নির্দেশনা তৈরি হয়নি। নামের সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ার শব্দটি থাকার কারণে কখনো কখনো তাঁদের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই গ্রুপে ফেলা হয়েছে। এই ভ্রান্তির বাইরে তাঁদের আলাদা করে আর কোথাও উল্লেখ করা হয় না। কলেজ বা স্কুল পর্যায়ে জীববিজ্ঞানের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দুনিয়ার তাবৎ বিষয়ের উল্লেখ থাকলেও জীবপ্রযুক্তি থাকে না। যেন এই বিষয়টির অস্তিত্বই নেই। ফলে এ বিষয়ের শিক্ষার্থীরা নিয়োগ পরীক্ষায় অবতীর্ণই হতে পারে না। এ রকম আরও অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যাবে, যেখানে জীবপ্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ আছে, কিন্তু তাঁদের বেমালুম উপেক্ষা করা হচ্ছে।

বেশির ভাগ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে গিয়ে সেখানেই রয়ে যাচ্ছেন, দেশে ফিরছেন না। সত্যিকার অর্থে বলতে হয়, চাইলেও ফিরতে পারছেন না। কারণ, তাঁদের কর্মসংস্থানের কোনো জায়গা এখানে নেই। দেশের জন্য এই বিষয়টি অনেক বড় একটি ক্ষতি। দেশের সবচেয়ে মেধাবী গোষ্ঠীর একটা বড় অংশকে কোনো কাজেই লাগানো যাচ্ছে না। দেশে যাঁরা থাকছেন, তাঁদের একটা অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তাঁদের বাইরে কেবল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি ছাড়া আর কোথাও জীবপ্রযুক্তিবিদদের জন্য আলাদা করে কখনো বিশেষায়িত অবস্থান নেই। বিসিএসআইআর, বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে কিছু কিছু নিয়োগ হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অন্য বিষয়ের শিক্ষার্থীরাই এসব জায়গায় প্রাধান্য পান। এমনকি সর্বশেষ বিসিএসআইআরের একটি নিয়োগে জীবপ্রযুক্তিবিদ বিষয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে অন্য একটি বিষয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশের চাকরিক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক বৈষম্য রয়েছে। যোগ্যতার বিচারে না গিয়ে বিষয় বা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আনুকূল্য এখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই দেখা যায়। এটি অত্যন্ত গর্হিত এবং অন্যায় একটি আচরণ। আমাদের শিক্ষার্থীরা এর নিষ্ঠুর শিকার।

সর্বশেষ এ রকম আরেকটি অত্যন্ত দৃষ্টিকটু দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে, যেখানে কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় শুরু থেকে সম্পৃক্ত থাকলেও জীবপ্রযুক্তিবিদদের কোনো স্বীকৃতি দেয়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ১০ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অস্থায়ীভাবে ২০ জনকে কোভিড-১৯ শনাক্তকরণের জন্য সবেতনে নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু সেখানে এত দিন ধরে কাজ করে আসা জীবপ্রযুক্তিবিদদের কাউকে নিয়োগ দেয়নি। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় থেকে নেওয়া হয়েছে, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু জীবপ্রযুক্তি বিষয়ের একজন শিক্ষার্থী এই তালিকায় ঢুকতে পারল না, সেটা একটা সুস্পষ্ট অন্যায়। এর একটা বিহিত হতে হবে।

সময় এসেছে এই আগল ভাঙার। জীবপ্রযুক্তিবিদদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি, পুরোনো সেক্টরগুলোয় আত্তীকরণের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন এখন অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে। এ ব্যাপারে উদারতার সঙ্গে চিন্তা করা এবং আবিষ্কার ও উদ্ভাবন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া দরকার।

পৃথিবীর আর কোথাও কর্মসৃষ্টির সব দায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো হয় বলে আমার জানা নেই। বাংলাদেশে আগে সাবজেক্ট খুলে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়, তারপর দেখা যায় তাঁদের ওই দক্ষতাসংক্রান্ত কোনো কর্মক্ষেত্র নেই। এই ধারায় আজ হয়তো জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং সংকটে পড়েছে, ভবিষ্যতে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে। সুতরাং উচ্চশিক্ষার বিষয়গুলো দেশের কর্মক্ষেত্রে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে জন্য নিয়মিত পর্যালোচনা হওয়া দরকার। এ বিষয়ে যে বিষয়গুলো অতি সত্বর বাস্তবায়ন করতে হবে, তা হচ্ছে—

১. সরকারি কর্মকমিশনের চাকরি নীতিমালা পরিমার্জন ও সংশোধন, যেখানে জীবপ্রযুক্তি বিষয়টির প্রাসঙ্গিকতা আধুনিক সময়ের আলোকে বিবেচনা করে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করে দিতে হবে।

২. সরকারের কৃষি, স্বাস্থ্য, বন ও পরিবেশসংক্রান্ত অধিদপ্তরগুলোকে জীবপ্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে পর্যালোচনা করতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে স্নাতক/স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের নিয়োগ দিতে হবে। বর্তমানে এই ক্ষেত্রগুলো কেবল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজগুলোর জন্য একচেটিয়াভাবে সংরক্ষিত হয়ে আছে। বর্তমান সময়ের প্রয়োজনে ব্যাপ্তি বাড়ানো দরকার।

৩. সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করার প্রকল্প হাতে নিতে হবে। বেসরকারি পর্যায়ের উদ্যোগের জন্য সরকারি সহায়তা বা প্রণোদনা দিতে হবে।

৪. দেশীয় গবেষণা থেকে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রয়োজন মেটানোর মতো পণ্য ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিনিয়োগ পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।

৫. বিদেশে যাঁরা এ বিষয়ে ভালো অবস্থান তৈরি করেছেন, তাঁদের দেশের সংশ্লিষ্ট খাত উন্নয়নে পরামর্শক বা উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যাঁরা দেশে ফিরতে চান, তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

কোভিড-১৯ আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়ছে। সারা পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের মেধাবী প্রজন্মকে সেই যাত্রায় শামিল করতে হবে। জীবপ্রযুক্তির মতো সর্বাধুনিক বিষয়কে উপেক্ষা করে আমরা সেই যাত্রায় অংশ নিতে পারব না। এই সত্যটি স্বীকার করে সব বৈষম্য দূর করা হোক, শুরু হোক নতুন এক উদার ও সম্ভাবনাময় পথচলা।

ড. মুশতাক ইবনে আয়ূব সহকারী অধ্যাপক, জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ই–মেইল: [email protected]

Facebook Comments

Related Articles