বাসে চড়ার ঝুঁকি এড়াতে মোটরসাইকেলে ঝোঁক

করোনার প্রাদুর্ভাবের মধ্যে বাসে চলাচল করার ঝুঁকি এড়াতে অনেকেই মোটরসাইকেল কিনছেন। ফলে মন্দার বাজারেও মোটরসাইকেল কিছু কিছু বিক্রি হচ্ছে।

যেমন মিউচুয়্যাল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) কর্মী শাহাদুর রহমান ভূঁইয়া গত ৩১ মে টিভিএস ব্র্যান্ডের একটি স্কুটার কেনেন। সেটা চালিয়ে তিনি এখন অফিসে যাতায়াত করেন। বাসা খিলক্ষেতে, অফিস গুলশানে। তিনি বলেন, ‘এই সময় বাসে ওঠা তো ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করার জন্য স্কুটারটি কিনে নিলাম।’

শাহাদুর রহমান আরও বলেন, ‘মোটরসাইকেল আগে চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল না। দুর্ঘটনার ঝুঁকির জন্য পরিবার থেকেও বাধা দিত। এখন পরিবার মানছে, কারণ গণপরিবহন ব্যবহার করলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। আমারও সুবিধা হয়েছে। এখন আর বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না।’

দেশে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ ও পবিত্র ঈদুল ফিতর ঘিরে মোটরসাইকেলের কেনাবেচা সবচেয়ে বেশি হয়। মার্চ থেকে শুরু করে জুন পর্যন্ত ভরা মৌসুম কাটান বিক্রেতারা। এ বছর করোনাভাইরাস ব্যবসার পুরো মৌসুমটিই কেড়ে নিয়েছে।

আবার করোনার কারণে যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির তৈরি হচ্ছে, তাতে মোটরসাইকেলের মতো একটু বেশি খরুচে পণ্যের বাজারে সহজে আগের মতো গতি ফিরবে না বলেই আশঙ্কা। কারণ এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষের আয় কমে যায়। মানুষ ব্যয় কমিয়ে দেয়। মন্দার সময় দামী ও বিলাস পণ্য কেনা আগে বাদ দেয় মানুষ। এ তালিকায় মোটরসাইকেলও রয়েছে।

অবশ্য এরই মধ্যে কোম্পানিগুলোর জন্য একটু স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে ‘মানুষের সচেতনতা’। অনেকেই ঢাকা, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা-উপজেলা শহরে গণপরিবহনের ব্যবহার এড়াতে মোটরসাইকেল কিনছেন।

জানতে চাইলে টিভিএস অটো বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিপ্লব কুমার রায় বলেন, ‘বর্তমানে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তিনটি যানবাহনকে তুলনামূলক নিরাপদ বলছেন। মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি। আমরা কিছু চাহিদা দেখছি, যাতে মনে হচ্ছে মানুষ এই বিষয়টি নিয়ে সচেতন।’

বিপ্লব কুমার রায় আরও বলেন, ঢাকায় এমনিতেই বাসে ওঠা দায়। তারওপর এখন বাসে ৫০ শতাংশ আসন খালি রাখতে হচ্ছে। তাতে সময়মতো অফিসে যাওয়াও তো কঠিন। তিনি জানান, টিভিএস তাদের কয়েকটি মডেলের মোটরসাইকেলের দামও কমিয়ে দিয়েছে।

যেমন টিভিএস মেট্রো ইলেকট্রিক স্টার্টের (১০০ সিসি) দাম ধরা হয়েছে ৮৩ হাজার ৯০০ টাকা, যার নিয়মিত দর ছিল ৯৪ হাজার ৯০০ টাকা। আর কিক স্টার্টের দাম ধরা হয়েছে ৭৮ হাজার ৯০০ টাকা, এ ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা কমানো হয়েছে। অন্যদিকে টিভিএসের ১০০ সিসির (ইঞ্জিন ক্ষমতা) এক্সএল হান্ড্রেড আই টাচ স্টার্ট মডেলের দাম ৫ হাজার টাকা করে কমিয়ে ধরা হয়েছে ৬৪ হাজার ৯০০ টাকা (ইলেকট্রিক স্টার্ট) ও ৫৪ হাজার ৯০০ টাকা (কিক স্টার্ট)।

একটি কোম্পানির বাজার জরিপ অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০১৯ সালে দেশে মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৫ লাখ ৪৯ হাজার। যা আগের বছরের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি। চার বছরের মধ্যে গত বছরই বিক্রির প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে কম ছিল। চার বছর মিলিয়ে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৩০ শতাংশ।

দেশের বাজারে এখন প্রায় ১০টি ব্র্যান্ড মোটরসাইকেল বিপণন করছে। ভারতীয় ও জাপানি ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের বাজার হিস্যা বেশি। তারা এখন দেশেই মোটরসাইকেল উৎপাদন করে।

দেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি শুরু হয়। এরপর ১০ মে পর্যন্ত মোটরসাইকেল বিক্রি একেবারেই বন্ধ ছিল জানিয়েছে কোম্পানিগুলো। পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে কিছুদিনের জন্য বিপণি খুলে দেওয়ায় মোটরসাইকেল কিছু কিছু বিক্রি হয়। ওই সময় সব কোম্পানি মিলে ২০ হাজারের মতো মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। দেশে মাসে বছরে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ হোন্ডা লিমিটেডের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা গিয়াস উদ্দিন বলেন, এখন দুই শ্রেণির ক্রেতা দেখা যাচ্ছে। এক শ্রেণি আগে থেকেই কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। তারা মূল্যছাড় পেয়ে কিনছে। আরেক শ্রেণি করোনার ঝুঁকি এড়াতে মোটরসাইকেলে চলাচলে আগ্রহী হচ্ছে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে সাধারণ পরিবহনের চেয়ে মোটরসাইকেল বেশি কার্যকর। তিনি বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ হোন্ডা তার কর্মীদের কিস্তিতে মোটরসাইকেল কেনার সুযোগ দিচ্ছে, যাতে তারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অফিসে যাতায়াত করতে পারে।

কোম্পানিগুলো বলছে, মোটরসাইকেলে চলাচলের খরচও তুলনামূলক কম। টিভিএস অটোর হিসাব অনুযায়ী, ১০০ সিসির মেট্রো মোটরসাইকেলে চলাচলে প্রতি কিলোমিটারের জ্বালানি ব্যয় মাত্র দেড় টাকা। বিপরীতে ঢাকায় বাসের নিয়তিম ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৭০ পয়সা। করোনাকালে নতুন ভাড়া ৬০ শতাংশ বেশি। ফলে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া দাঁড়ায় ২ টাকা ৫৬ পয়সা। সিএনজি চালিত অটোরিক্সা ও রাইড শেয়ারিংয়ে খরচ অনেক বেশি।

ঢাকায় গত জানুয়ারি থেকে মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, ‘শেওড়াপাড়ার বাসা থেকে বাসস্ট্যান্ডে যেতে ২০ টাকা রিক্সাভাড়া লাগত। মৎস্যভবন পর্যন্ত বাসভাড়া লাগত ২৫ টাকা। ফলে অফিসে যাওয়া-আসায় দিনে ৯০ টাকা খরচ হতো। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, অফিস সময়ে শেওড়াপাড়া থেকে বাসে ওঠা যেত না। এখন খরচও কম, দুর্ভোগও নেই।’

মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকির প্রশ্নে শাহাদাত হোসেন বলেন, দ্রুতগতিতে না চালানো, অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হওয়া এবং ভালো হেলমেটসহ নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করে মোটরসাইকেল চালালে ঝুঁকি কমে যায়।

Facebook Comments

Related Articles