ইংরেজি যেসব শব্দের মূল উৎস আরবি

স্পেনীয় মুসলমানদের প্রায় আট শ বছরের শাসনের বহু দিক ইউরোপীয় সমাজকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। এ প্রভাব জ্ঞান-বিজ্ঞান, ভাষা-সাহিত্য, জীবনাচার সব দিকে বিস্তৃত। এর একটি প্রমাণ হলো, ইউরোপীয় সমাজে প্রচলিত ভাষাগুলোর মধ্যে এখনো বহু আরবি শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। এমন কিছু শব্দ হলো—

 

পৃথিবী (Earth)

ইংরেজি ‘আর্থ’ মানে পৃথিবী। এটি অন্যতম বহুল প্রচলিত শব্দ। কিন্তু এ শব্দের মূল উৎস আরবি। আরবি ‘আরদ’ শব্দটি খুবই পুরনো। পবিত্র কোরআনে বহু জায়গায় এ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ইংরেজি ‘আর্থ’ শব্দটির ব্যবহার হয়েছে প্রায় এক হাজার বছর আগে। পঞ্চম শতাব্দীতে ব্রিটেনে কিছু জার্মান উপজাতির স্থানান্তরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি ভাষা যেমন ‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ (ইংরেজি-জার্মান) থেকে বিকশিত হয়েছিল, তেমনই ‘আর্থ’ শব্দটি অ্যাংলো-স্যাক্সন শব্দ ‘ইরদা’ থেকে এসেছে।

একটু চিন্তা করলে বোঝা যায়, আরবি ‘আরদ’ ও ইংরেজি ‘আর্থ’ খুবই কাছাকাছি।

 

সাফারি (Safari)

সাফারি মানে অবকাশযাপন। এর মাধ্যমে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা হয়। ইংরেজি অভিধানে সাফারি শব্দটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘বিশেষত আফ্রিকায়, শিকার অভিযানের সরঞ্জামে সুসজ্জিত বাহন।’ সাধারণ অর্থে, পশুদের অবলোকন বা শিকারের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ।’ এই শব্দটির মূল হলো আরবি ‘আস-সাফারি’। যা সফর (ভ্রমণ) বিষয়ক কোনো বিষয়কে নির্দেশ করে। ইংরেজি সাফারি শব্দটি সুস্পষ্টভাবে এর আরবি মূলের দিকে ইঙ্গিত করে।

 

ম্যাগাজিন (Magazine)

ম্যাগাজিন শব্দটি আরবি শব্দ ‘মাখাযিন’ থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ গুদাম ঘর। ‘মাখাযিন’ শব্দটি ‘মাখযান’ শব্দের বহুবচন। কালক্রমে ‘মাখাযিন’ ইতালিয়ান ‘ম্যাগাযিনো’-তে পরিণত হয়, যা মধ্য ফ্রান্সে ম্যাগাসিনে রূপান্তরিত হয়। অবশেষে ১৬ শতাব্দীতে ম্যাগাজিন নামে ইংরেজিতে স্থান লাভ করে।

 

প্যারাডাইস (Paradise)

ঈমানদারের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য পরকালের মুক্তি। আর এই মুক্তি লাভের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন হলো জান্নাত। জান্নাতের শ্রেষ্ঠতম স্থানের নাম ‘ফিরদাউস’। কালক্রমে এই ‘ফিরদাউস’ থেকে এসেছে ইংরেজি ‘প্যারাডাইস’। এর অর্থ নন্দনকানন। এটাকে Garden of Eden অভিধায় ভূষিত করা হয়। আরবি ‘ফিরদাউস’ শব্দটি গ্রিক, প্রয়াত লাতিন, প্রাচীন ফ্রেঞ্চ হয়ে অবশেষে ইংরেজিতে প্যারাডাইসে পরিণত হয়েছে।

 

সিরাপ (Syrup)

সিরাপ শব্দটি এসেছে আরবি ‘শারাব’ থেকে, যার অর্থ পানীয়। আর শেরবেত বা শরবত এসেছে আরবি শব্দ ‘শারাবাত’ বা ‘শুরবাত’ থেকে। এর অর্থ ‘একটি একক পানীয়’। আরবি ‘শারাবাত’ পরে ফারসিতে শরবত ও তুর্কিতে শেরবেতে রূপান্তরিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এটি ‘শেরবেত’ বা ‘শরবত’রূপে ইংরেজিতে স্থান লাভ করে। আর সিরাপ শব্দটি আরবি ‘শারাব’ থেকে ফ্রেঞ্চ ও ইতালিয়ান ভাষায় গৃহীত হয়। ১৪ শতাব্দীতে এটি ইংরেজিতে স্থান পায়।

 

লেমন (Limon)

লেবুর শরবত ভিটামিন ‘সি’সমৃদ্ধ পানীয়। ১০০০ থেকে ১২০০ সালের মধ্যে মুসলিম স্পেনের সুবাদে ইউরোপিয়ানরা লেবুর সঙ্গে পরিচিত হয়। ‘লেমন’ শব্দটি আরবি ‘লাইমুন’ থেকে ইতালিয়ান, এরপর ফ্রেঞ্চ হয়ে অবশেষে ইংরেজিতে প্রবেশ করেছে।

 

কটন (Cotton)

ইংরেজি কটন শব্দটি আরবি ‘কুতন’ শব্দ থেকে এসেছে। প্রাচীন স্প্যানিশ বা ইতালিয়ান হয়ে ফ্রেঞ্চ ও পরে ইংরেজিতে স্থান লাভ করে। মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পরপরই বস্ত্র তৈরির গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস বনে যায় তুলা। এটি এ জন্য যে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় তুলার চাদর ব্যবহার করেছেন। তা ছাড়া ইসলামের প্রসারের আগ থেকেই তুলা ছিল আরবের একটি প্রাচীন শিল্প।

 

ক্যারেট (Carat)

স্বর্ণের গুণগত মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ‘ক্যারেট স্কেল’ বিশ্বে জনপ্রিয় ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা অনুযায়ী স্বর্ণের ১/২৪ অংশকে এক ক্যারেট বলে। তাই ২৪ ক্যারেট স্বর্ণকে সবচেয়ে বিশুদ্ধ স্বর্ণ ধরা হয়ে থাকে। ক্যারেট শব্দটিও উদ্ভব হয়েছে আরবি থেকে। ক্যারেট শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ‘কিরাত’ বা ‘কাইরাত’ থেকে। ‘কিরাত’ শব্দটি তার ইংরেজি প্রতিরূপ থেকে অর্থের দিক থেকে তেমন ভিন্ন নয়।  আরবের এক রীতি অনুযায়ী এটি স্বর্ণের ১/২৪ অংশ, আর অন্য রীতি অনুযায়ী ১/২০ অংশ।

 

কফি (Coffee)

আধুনিক মানুষের জনপ্রিয় পানীয় হলো কফি। আরবরা এই পানীয়কে বলে ‘কাহওয়া’। এর আক্ষরিক অর্থ ‘ওয়াইন’। তারা এই নামটি ব্যবহার করেছে পানকারীর ওপর এর প্রভাব দেখে। আরবি এই শব্দ তুর্কিতে ‘কাহভেহ’ নামে উচ্চারিত হয়। এ থেকে ইতালিয়ানে পরিণত হয় ‘ক্যাফে’তে। সবশেষে ইংরেজিতে ‘কফি’তে রূপান্তরিত হয়।

এ ছাড়া Gause (গ্যাস) শব্দটি আরবি ‘আল-গাযিয়্যি’ থেকে এসেছে। Jar (জার) শব্দটি আরবি ‘আল-জাররাতু’ থেকে এসেছে। Sofa (সোফা) শব্দটি আরবি ‘আস-সুফাতু’ থেকে এসেছে। Suger (চিনি) শব্দটি আরবি ‘আস-সুক্কারু’ থেকে এসেছে। জরপব (চাল) শব্দটি আরবি ‘রুযযুন’ বা ‘আরযা’ থেকে এসেছে।

 

কৃতজ্ঞতা : (১) Muslim Matters

(২) আসরুল আরব ফিল হাদারাতিল উরুবিয়্যাহ, আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ।

(৩) স্পেনে মুসলিম ইতিহাস ও কীর্তি, ড. ফরিদুদ্দিন ফারুক।

Facebook Comments

Related Articles