ইসলাম যে কারণে এগিয়ে

ইসলামী শরিয়তের অন্যতম উদ্দেশ্য ‘মাসলাহা’ বা জনকল্যাণ। মানুষের টেকসই কল্যাণ নিশ্চিত করতে দ্বিন, জীবন, বংশধারা, মেধা ও বুদ্ধি এবং সম্পদ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। জীবন সংরক্ষণে মনোজগৎ ও বহির্জগৎ দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মনোজগতের সার্বিক প্রভাব তার বহির্জগতের যাবতীয় কার্যক্রম ও চিন্তায় প্রতিফলিত হয়। করোনা মহামারিতে মানুষের মনস্তত্ত্বে ব্যাপক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। জীবন ও জগৎ নিয়ে মানুষের যে বদ্ধমূল ধারণা ছিল, করোনা তাতে পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানে ইসলামের মনোজাগতিক চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলনামূলক বেশি সহায়ক।

ইসলাম জীবনের এই খণ্ডকালীন ও খণ্ডিত চিন্তায় বিশ্বাস করে না; বরং পার্থিব জীবনের ভোগ-বিলাসিতা থেকে মানুষের নির্ভরতা কমিয়ে আনতে চায়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা কুফরি করে তাদের কাছে পার্থিব জীবন সুশোভিত করা হয়েছে। তারা মুমিনদের ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করে কিয়ামতের দিন তারা তাদের ঊর্ধ্বে থাকবে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবিকা দান করেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২১২)

পশ্চিমা মনোবিজ্ঞানে ‘সুখে থাকার’ মূলনীতি হলো উন্নত গুণাবলি ও মূল্যবোধের সমন্বয়ে ইতিবাচক জীবন যাপন করা, যা ‘ইউডাইমোনিক’ নামে পরিচিত। এই মূলনীতি ইসলামী মনস্তত্ত্বের সঙ্গে আংশিক সামঞ্জস্যশীল হলেও বৃহদাংশে সাংঘর্ষিক। কেননা ইসলাম ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে উৎসাহিত করলেও নেতিবাচক পরিস্থিতিতে ব্যক্তিকে সহনশীল থাকার নির্দেশ দেয়।

পশ্চিমা মনোবিজ্ঞানের মূলনীতির তুলনায় মনোজগতে ইসলামের অবস্থান বেশি সুসংহত ও সুবিস্তৃত। ইসলাম জাগতিক জীবনে কল্যাণ অর্জনে উৎসাহিত করলেও সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরকালীন জীবনকেই স্বীকৃতি দেয়। আধ্যাত্মিক বা মনোজাগতিক ব্যবস্থাপনার কথা বলেছে। আধ্যাত্মিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো, আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস, তাঁর প্রতি সার্বিক নির্ভরশীলতা, তাকদিরের ভালো-মন্দে বিশ্বাস ও ধৈর্য।

আল্লাহর প্রতি ঈমান মুমিনকে মনস্তাত্ত্বিক শক্তি জোগায়। কেননা একজন মুমিন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে পৃথিবীর সব মানুষ যদি তার কোনো কল্যাণ করতে চায়, আল্লাহ না চাইলে তারা সে কল্যাণ করতে পারে না কিংবা পৃথিবীর সব মানুষ যদি তার ক্ষতি করতে চায়, আল্লাহ না চাইলে কোনোভাবেই কেউ তার ক্ষতি করতে পারে না। (তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৬)

বিপদে মুসিবতে মুসলিম মনস্তত্ত্বের আরেকটি ইতিবাচক মাধ্যম হলো আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতা। আল্লাহর ওপর নির্ভরতার তিনটি ধাপ যথাক্রমে প্রস্তুতি বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, মূল কাজ সম্পাদন এবং চূড়ান্ত ফলাফলের (ভালো-মন্দ) জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। কিন্তু যখন প্রথম দুটি ধাপের মাধ্যমে বিপদমুক্ত হওয়া অসম্ভব হয়ে যায়, তখন মুসলিম মনস্তত্ত্ব নির্ভরতার চূড়ান্ত সত্তা আল্লাহ তাআলার ওপর নির্ভর করে বিপদ মোকাবেলায় নিজেকে সর্বদা প্রস্তুত রাখে। তাকদিরের ভালো-মন্দে সন্তুষ্ট থাকা মুসলিম মনস্তত্ত্বের আরো একটি ইতিবাচক দিক। ভালো-মন্দে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর অবিচল অনুগত থেকে মুমিন প্রশান্তি লাভ করে।

ধৈর্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মহা নিয়ামত। মুমিন ব্যক্তি তার জীবনের কষ্ট, প্রতিকূলতা, সংকট এবং বিপর্যয় আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদান আশা করে। মূলত মুসলিম মনস্তত্ত্ব ভালো ও মন্দ দুই অবস্থার জন্যই আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, যখন সে কল্যাণপ্রাপ্ত হয় আল্লাহর প্রশংসা করার মাধ্যমে তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করে। আবার যখন বিপদে আপতিত হয়, ধৈর্য ধারণ করার মাধ্যমে আল্লাহর সিদ্ধান্তে অটুট থেকে মনস্তাত্ত্বিক বিজয়ের পরিচয় দেয়। সুতরাং অন্যান্য মনস্তত্ত্বের তুলনায় ইসলামী মনস্তত্ত্বের ধারণা অনেক বেশি টেকসই ও প্রশান্তিময়।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব মালায়া, মালয়েশিয়া

Facebook Comments

Related Articles

Close