বেপরোয়া গাছখেকো, অভিনব কৌশলে চলছে গাছ কাটা

যশোরের চৌগাছায় গাছখেকোদের কোনোক্রমেই থামানো যাচ্ছে না। বিভিন্ন পাকাসড়কে কৌশলে গাছ কাটা অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পরিবেশ বিরুদ্ধ এহেন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। করোনা পরিস্থিতির সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ইদানীং গাছখেকোরা সড়কের গাছ সাবাড় করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। নির্বিচারে গাছ নিধনের ফলে পুলিশ বাহিনী, বন বিভাগ ও প্রশাসনের আশু দৃষ্টি কামনা করেছেন এলাকার সচেতন মানুষ।

জানা গেছে, চৌগাছা-কোটচাঁদপুর, চৌগাছা-যশোর, চৌগাছা-ঝিকরগাছা, চৌগাছা-মহেশপুর পাকা রাস্তার দুই পাশে এক দেড় দশক আগে জেলা পরিষদের কয়েক হাজার বিভিন্ন প্রজাতির বনজ গাছ রোপণ করা হয়। গাছগুলো এখন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ গাছের মূল্য প্রায় ২০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু স্থানীয় কতিপয় দুর্বৃত্ত গাছখেকো সংঘবদ্ধ হয়ে রাতে গাছের বাকল চারপাশ গোলাকৃতিভাবে কেটে দিচ্ছে। গাছের গোড়া থেকে দেড় থেকে দুই হাত ওপরে এমনটি করা হচ্ছে। এ ছাড়া গাছে কেরোসিন ঢেলে দিয়ে পুড়িয়ে ফেলছে। কোনো কোনো গাছে এসিডও ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি গাছের গোড়ায় রাসায়নিক সার অতিমাত্রায় ব্যবহার করা হচ্ছে। সেই সাথে দেওয়া হচ্ছে লবণ। এসব পদ্ধতির ফলে ধীরেধীরে কিছুদিনের মধ্যে গাছ শুকিয়ে মারা যায়। পরবর্তীতে ওই গাছ রাতে কেটে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হয় বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সরেজমিন গাছ পরিদর্শনে গেলে দুর্বৃত্তদের নিষ্ঠুরতার প্রমাণ পাওয়া যায়। চৌগাছা-ঝিকরগাছা পাকাসড়কের আমজামতলা বাজারের সন্নিকটে সড়কের দুই ধারে ১০টি কড়ই ও সেগুন গাছ দুর্বৃত্তদের ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে। দুর্বৃত্তরা প্রত্যেকটি গাছের নিচের অংশের দেড় থেকে ২ ফিট ওপরে গোলাকৃতিভাবে বাকল এমনকি গাছের কাণ্ড কেটে ফেলেছে। এভাবে কাটার কারণে ৬টি কড়ই গাছ এর মধ্যে মারাও গেছে।

স্থানীয়রা জানান, কিছুদিনের মধ্যেই এই গাছ সেখানে থাকবে না। রাতেই কে বা কারা কেটে নিয়ে যাবে। ইতিপূর্বে এই সড়কের জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের ফাঁকা মাঠে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মূল্যের ৩টি কড়ই গাছ গোলাকৃতিভাবে বাকল কাটা হয়। চৌগাছা-মহেশপুর সড়কের ঋষিপাড়ার পাশেই একটি বড় কড়াই গাছের চারপাশের বাকল এমনকি গাছের কাণ্ড নিখুঁতভাবে কেটে রাখা হয়। চৌগাছা-কোটচাদপুর সড়কে কয়েকটি কড়ই গাছ পেট্রল দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়ারও ঘটনা ঘটে। গাছগুলোর খবর নিতে গেলে ওই গাছের কোন হদিস পাওয়া যায়নি। যেখানে গাছ ছিল তার চিহ্ন পর্যন্ত নেই।

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয়রা বলেন, বাইরের লোকজন এ কাজ করতে আসিনি। স্থানীয় দুর্বৃত্তরা এ নিষ্ঠুর কাজ করে। গাছের ওপর এসব পদ্ধতি প্রয়োগ করার ফলে ধীরে ধীরে গাছ মারা যায়। এই সুযোগে রাতে সংঘবদ্ধরা দ্রুত গাছ কেটে মাঠের মধ্যে বিভিন্ন ফসলি জমিতে নিয়ে রাখে। পরে সুযোগ বুঝে তা বিক্রি করে। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে উপজেলার বিভিন্ন সড়কে গাছ নিধন বেড়ে গেছে।

এদিকে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, রাস্তার মূল্যবান গাছ কাটার জন্য রাস্তার ধারের জমির মালিকরা বেশি দায়ী। তারা এই গাছকে বিষফোঁড়া মনে করে সংঘবদ্ধ চক্রের সাথে আঁতাতের মাধ্যমে গাছ নিধন করছে। এর সাথে মিল মালিক বা কাঠ ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ আছে বলেও অনেকে জানান।

গাছের বাকল কেটে ফেললে বা পুড়িয়ে ফেললে কি ক্ষতি সাধন হয়, এমন প্রশ্নে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দীন বলেন, গাছের বাকল খাদ্য তৈরি ও খাদ্য সরবরাহে সহায়তা করে। এ ছাড়া সালোক সংশ্লেষণ একটি জৈবনিক প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্ভিদ সূর্যের আলোর সাহায্যে পানি ও কার্বন ডাই অক্সাইড দিয়ে শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরি করে। গাছের উপরিভাগ ও মূলভাগের কোনেটিই সংকট দেখা দিলে গাছ বা উদ্ভিদ মারা যায়। সে কারণে গাছের বাকল না থাকলে সেই গাছ বেঁচে থাকতে পারে না।

জেলা পরিষদ সদস্য দেওয়ান তৌহিদুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উপজেলার বিভিন্ন সড়কে জেলা পরিষদের গাছ অভিনব কৌশলে কাটা হচ্ছে যা দুঃখজনক। চৌগাছা-ঝিকরগাছা সড়কে গাছ ক্ষতিসাধনের খবরটি আমি শুনেছি। যারা এই কাজের সাথে জড়িত তাদের খোঁজখবর নিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদুল ইসরামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গাছের সাথে এমন নিষ্ঠুরতা মেনে নেওয়া যায় না। বিষয়টি খতিয়ে দেখে এদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে জনগণকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।

Facebook Comments

Related Articles