এই সময় মা হচ্ছেন যাঁরা

যেকোনো বৈশ্বিক মহামারি, যুদ্ধ–বিগ্রহ বা দুর্যোগের প্রথম আঘাতটাই এসে পড়ে নারী ও শিশুদের ওপর। কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারি তার ব্যতিক্রম নয়। এ সময় যাঁরা অন্তঃসত্ত্বা কিংবা যাঁদের প্রসবের সময় ঘনিয়ে এসেছে, তাঁদের মেনে চলতে হবে বাড়তি সতর্কতা, থাকতে হবে সচেতন।

যাঁরা করোনাকালে অন্তঃসত্ত্বা

করোনাকালে বড় কোনো সমস্যা না হলে গর্ভকালে মায়েদের ঘরে থাকতে পরামর্শ দিচ্ছি। খুব প্রয়োজন না হলে ঘর থেকে বের না হওয়াই উচিত। কারণ, অন্তঃসত্ত্বারা ভাইরাসের সংক্রমণের বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাঁদের সর্বোচ্চ সতর্কতা দরকার। গণপরিবহন ব্যবহার না করা, ভিড় ও অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলা, বাড়িতে স্বাস্থ্যবিধি ও শিষ্টাচারগুলো মেনে চলতে হবে। শুধু ঘরে থাকলেই হবে না, বাড়িতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন সতর্কভাবে। জ্বর বা হাঁচি–কাশির যেকোনো রোগী থেকে দূরে থাকবেন। বারবার হাত ধোবেন। প্রচুর পরিমাণে পানি ও জলীয় খাবার খেতে হবে। দরকার হবে প্রচুর আমিষ আর পুষ্টিকর খাবারের। চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন খনিজ সাপ্লিমেন্টও চলবে। ছোটখাটো সমস্যায় টেলিমেডিসিনে পরামর্শ নেওয়া ভালো।

স্বাভাবিক অবস্থায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গর্ভকালে নারীদের মোট আটবার অ্যান্টিনাটাল ভিজিট বা চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করার পরামর্শ দেয়। কিন্তু করোনার মহামারিকালে এই ভিজিটের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। প্রথম দুটি ভিজিট (৮ সপ্তাহ ও ১২ সপ্তাহ) স্বাস্থ্যকেন্দ্রে না গিয়ে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে নিতে বলা হয়েছে। মোট চারবার অন্তঃসত্ত্বা সশরীরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাবেন—১৬ সপ্তাহ, ২৪-২৮ সপ্তাহ, ৩২ সপ্তাহ আর শেষবার ৩৪-৩৬ সপ্তাহের সময়ে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় অবশ্যই মুখে মাস্ক পরবেন, অন্যদের থেকে ৩-৬ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে চলবেন। টিটেনাসের টিকা ঠিক সময় দিতে হবে।

পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলে পেটে বাচ্চার নাড়াচড়া খেয়াল করতে হবে। স্বাভাবিক অবস্থায় ১২ ঘণ্টায় ১০ বার নড়বে, অর্থাৎ সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত গুনতে হবে। বড় রকমের ব্যত্যয় হলে হাসপাতালে যেতে হবে।

বাড়ির অন্তঃসত্ত্বার দিকে পরিবারের সবাই সজাগ দৃষ্টি রাখবেন। তাঁকে এ সময় মানসিক দিক থেকে সুস্থ রাখতে হবে। তাঁকে সাহস দিন।

রক্তের গ্রুপ জেনে পরিবারের সবার সঙ্গে মিলিয়ে ঠিক করে রাখতে হবে। কারণ, যেকোনো সময় রক্তের প্রয়োজন হতে পারে।

প্রসবের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা ঠিক করে রাখতে হবে। এর মধ্যে তাঁকে দুইবার কোভিড–১৯ পরীক্ষা করতে হবে। প্রথমটি ৫ মাসের (২০ সপ্তাহ) মধ্যে এবং দ্বিতীয়টি ৯ মাসের (৩৬ সপ্তাহ) দিকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারও কোভিড পরীক্ষার ক্ষেত্রে অন্তঃসত্ত্বাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছে। কারণ, করোনা পজিটিভ হলে ও আগে থেকে জানা থাকলে তিনিও সুরক্ষিত থাকবেন এবং যিনি প্রসব করাবেন তাঁকেও সুরক্ষিত থাকতে হবে।

 

যখন সময় হবে

মাকে সময়মতো চিকিৎসাকেন্দ্রে বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। যে নির্দিষ্ট জায়গায় স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক নিয়মিত থাকেন, সেটা নিশ্চিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। ৩৬ সপ্তাহে করা কোভিড-১৯ টেস্ট পজিটিভ হলে কোন হাসপাতালে এ ধরনের ডেলিভারি করা হয়, সে খোঁজখবর আগেই করে রাখুন। গর্ভকালীন বিপদের চিহ্ন—রক্তপাত, পানি ভেঙে যাওয়া, প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও ঝাপসা দেখা, নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া, তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা বা খিঁচুনি ইত্যাদি হলে দ্রুত হাসপাতালে যাবেন।

 

যদি সংক্রমণ হয়

গর্ভকালীন যদি করোনার সংক্রমণ হয়ে যায়, তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। উপসর্গ মৃদু হলে বাড়িতে আইসোলেশনে থাকুন। জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল খেতে পারেন। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ খাবেন না। এই সময় টেলিমেডিসিনের সাহায্যে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। বাড়িতে পালস অক্সিমিটার রাখবেন, মাঝেমধ্যেই ফুসফুসে অক্সিজেনের পরিমাণ স্বাভাবিক আছে কি না, দেখবেন। ৯২-এর নিচে নেমে গেলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।

যদি প্রসবের আগেই নেগেটিভ হয়ে যান, চিন্তা নেই। তবে কোভিড পজিটিভ হয়ে থাকলে করোনায় আক্রান্তদের সেবা দেওয়া হয়, এমন হাসপাতালের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যেতে হবে। বড় কোনো সমস্যা না থাকলে স্বাভাবিক প্রসবই সম্ভব।

যদি মা বেশি অসুস্থ না হন, তাহলে নবজাতককে বুকের কাছে রাখা যাবে। দুই ঘণ্টার মধ্যেই নবজাতককে বুকের দুধ খেতে দিতে হবে। বুকের দুধের মাধ্যমে করোনা ছড়ায় না। মা অসুস্থ থাকলে বুকের দুধ বাটিতে করে চামচ দিয়ে খাওয়ানো যাবে অথবা অন্য মায়ের দুধ অথবা বাইরের দুধ দেওয়া যাবে। দুধ খাওয়ানোর সময় মা মুখে মাস্ক পরে নেবেন ও হাত ধোবেন।

বর্তমানে বলা হচ্ছে, প্রসব বা সিজারিয়ানের আগে প্রত্যেক মাকেই রক্তের সিবিসি, সিআরপি, কোভিড টেস্ট ও বুকের এক্স–রে করে নিতে হবে। এগুলো তাঁর জটিলতা কমানোর জন্যই দরকার।

অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম : স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগ, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।

Facebook Comments

Related Articles