করোনায় শিশু ও তরুণ বেশি মারা যাওয়ার কারণ

করোনায় শিশু ও তরুণদের মৃত্যুর বড় কারণ একেবারে শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে নিয়ে আসা। করোনায় সংক্রমিত শিশু ও তরুণদের যখন তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, তখন তাদের হাসপাতালে আনা হয়। ততক্ষণে তাদের রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা অনেক কমে যায়। সর্বোচ্চ চেষ্টাও করেও তাদের বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না।

এর বাইরে পুষ্টিহীনতা, ডায়বেটিস, ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত শিশু ও তরুণ করোনায় সংক্রমিত হয়ে মারা যাচ্ছে। করোনা রোগীদের চিকিৎসায় সম্পৃক্ত কয়েকজন চিকিৎসক ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এসব তথ্য জানান।

করোনার রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত প্রথম সরকারি হাসপাতাল কুয়েত-বাংলাদেশ সরকারি মৈত্রী হাসপাতালের ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের হাসপাতালে কয়েকজন করোনার রোগী মারা যান, যাঁদের একেবারেই শেষ পর্যায়ে আনা হয়েছিল। তীব্র শ্বাসকষ্ট থাকা অবস্থায় তাঁদের আমাদের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। ভর্তির পর সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পরও তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। কারণ, তাঁদের রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা একেবারই কমে গিয়েছিল। তখন মাল্টি অর্গান ফেইলারের মধ্য দিয়ে তাদের মৃত্যু হয়। তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে শেষ পর্যায়ে ভর্তি হওয়া শিশু ও তরুণ অনেকে মারাই যাচ্ছে।’

গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে করোনায় সংক্রমিত হয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ৩৪৩ জন। সংক্রমিত হয়েছেন ১ লাখ ২ হাজার ২৯২ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, করোনায় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন ৬০ বছরের অধিক বয়সী ব্যক্তিরা। ৪ জুন পর্যন্ত মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৬০ বছরের অধিক বয়সীরা মারা গেছেন ৩৮ দশমিক ৯৯ ভাগ। এরপর ৫১ বছর থেকে ৬০ বছর বয়সী মারা গেছেন ২৯ দশমিক ৬২ ভাগ।

এ ছাড়া ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী ১৭ দশমিক ৩৯ ভাগ, ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ৮ দশমিক ২৯ ভাগ, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৩ দশমিক ৪ ভাগ, ১১ থেকে ২০ বছর বয়সী ১ দশমিক ৪৯ ভাগ এবং ১ থেকে ১০ বছর বয়সী দশমিক ৮২ ভাগ শিশু মারা গেছে। গত ৫ থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত শূন্য থেকে ১০ বছর বয়সী শিশু মারা গেছে ১টি, ১১ থেকে ২০ বছর বয়সী ৮ জন, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ১৯ জন, ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ৩৯ জন এবং ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী মারা গেছেন ৬৪ জন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাঈদা আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে করোনার উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত আটটি শিশু মারা গেছে। তাদের কারও কারও ক্যানসারসহ নানা শারীরিক জটিলতা ছিল, আবার কাউকে কাউকে একেবারই শেষ পর্যায়ে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। ফলে অনেক চেষ্টা করার পরও তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তিন মিনিটের বেশি সময় মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ থাকলে তখন কিন্তু মস্তিষ্কের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। হার্টেও কয়েক মিনিট অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ থাকলে তার কার্যক্রম বন্ধ হয়। অর্থাৎ, করোনায় সংক্রমিত ব্যক্তিকে যদি সঠিক সময়ে অক্সিজেন সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়, তাতে ভালো ফলাফল বয়ে আনে।’

রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি বড় বিপৎসংকেত
করোনা চিকিৎসায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, করোনায় আক্রান্ত একজন মানুষের রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৯৫–এর নিচে নেমে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা দরকার। একই সঙ্গে তাকে অক্সিজেন সরবরাহ করতে হবে। করোনায় আক্রান্ত এমন অনেক রোগী পাওয়া গেছে, যাদের রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ অনেক কমে গেছে, কিন্তু তাঁরা সেভাবে বুঝতেই পারেননি বিষয়টি।

কুয়েত-মৈত্রী বাংলাদেশ সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের মধ্যে অনেকে বাসায় অক্সিজেনভর্তি সিলিন্ডার কিনে বাসায় রাখছেন। অনেকে করোনা রোগীকে বাসায় অক্সিজেন দিচ্ছেন। বাসায় বড়জোড় একজন মানুষকে সাত থেকে আট ঘণ্টা অক্সিজেন দেওয়া যায়। কিন্তু সঠিকভাবে কী দেওয়া সম্ভব? সম্ভব নয়। আবার আমরা দেখছি, করোনা রোগীর যখন তীব্র শ্বাসকষ্ট তখন অনেকে আইসিউর জন্য ছোটাছুটি করছেন। আসলে এসব রোগীর দরকার আগে অক্সিজেন। এ জন্য যেকোনো ধরনের কোভিড হাসপাতালে আগে ভর্তি করা উচিত। শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ার পরও অনেকে বিলম্ব করে হাসপাতালে আসছেন। এই কাজটি করা যাবে না। প্রয়োজনে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা বাসায় একটি পালস অক্সিমেটার রাখতে পারেন। অক্সিজেনের মাত্রা ৯৫–এর কম হলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে রোগীকে ভর্তি করতে হবে।’

ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনিজনিত জটিলতা করোনায় আক্রান্ত অনেক শিশু ও তরুণের মৃত্যুর অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাইফ উল্লাহ মুন্সি। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘করোনায় যেসব শিশু ও তরুণ মারা যাচ্ছে, তাদের অন্যান্য জটিলতা ছিল। তারা হয়তো জানত না যে তাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ওবেসিটি রয়েছে। তাদের অ্যাজমা রয়েছে। বহু তরুণের ডায়াবেটিসও আছে। আর বয়স্ক লোকের হাইপার টেনশন, ফুসফুসজনিত সমস্যা থাকে। যার যত বেশি শারীরিক দুর্বলতা, মৃত্যুঝুঁকি তত বেশি।’

করোনায় শিশুমৃত্যুর জন্য পুষ্টিহীনতাকে দায়ী করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, করোনায় শূন্য থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হার বেশি। আর করোনায় বাংলাদেশে ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী ব্যক্তিরা বেশি মারা যাচ্ছেন। পশ্চিমা দেশের অধিকাংশ বয়স্ক ব্যক্তি পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন না। বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন। করোনায় তাঁদের মৃত্যু বেশি হয়েছে। আমাদের দেশে বয়স্করা পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন। অনেক বয়স্ক ব্যক্তিদের গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর গ্রামে করোনার সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে কম। যাদের অন্যান্য শারীরিক জটিলতা রয়েছে, করোনায় তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। করোনায় আক্রান্ত হলে সঠিক সময়ে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া উচিত। তাতে মৃত্যুর ঝুঁকি কমে যায়।

Facebook Comments

Related Articles