২৬ বছর আগে, এ দিনেই শেষবার ম্যারাডোনা

ডি বক্সের বাইরে থেকে তীব্র শট। হতভম্ব গোলরক্ষক। ডিয়েগো ম্যারাডোনার এমন একটা গোল আজও চোখে ভাসে ফুটবলপ্রেমীদের। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে গ্রিসের বিপক্ষে করা ওই গোলটিই যে দেশের জার্সিতে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির শেষ গোল!

ক্যালেন্ডারের পাতায় ঘুরেফিরে এসেছে সেই দিনটি। দেখতে দেখতে ২৬ বছর হয়ে গেল। গোলটি ছিল দৃষ্টিনন্দন, সন্দেহ নেই। তবে সবাই মনে রেখেছেন এরপর ম্যারাডোনার সেই বন্য উদ্‌যাপন। বল জালে জড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে কর্নার পতাকার দিকে ছুটে গিয়ে একটি টেলিভিশন ক্যামেরার লেন্সে মুখ রেখে সেই উদ্‌যাপনটি করেছিলেন আর্জেন্টাইন তারকা। কী যেন এক প্রত্যয় মাখা ছিল ম্যারাডোনার সেই উদ্‌যাপনে।
৩৩ বছর বয়সে ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপটি খেলতে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। ম্যাসাচুসেটসের ফক্সবোরোর সেই ম্যাচে গ্রিসকে ৪–০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা শুরু করেছিল নতুন এক মিশন। পরের ম্যাচে নাইজেরিয়াকে ২–১ গোলে হারিয়ে সঠিক পথেই ছিল দল। কিন্তু এরপরই কী যেন হয়ে গেল। খবর এল নিষিদ্ধ ওষুধের নমুনা রক্তে পাওয়া যাওয়ায় বহিষ্কৃত হয়েছেন ম্যারাডোনা। ডোপ টেস্টে প্রিয় তারকার অকৃতকার্য হওয়ার খবরটায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছিল ম্যারাডোনা–ভক্তদের মাথায়।
গ্রিসের বিপক্ষে সেই গোলটির সময়ও কেউ কি ঘুণাক্ষরে ভেবেছিল, সেটিই হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ম্যারাডোনার শেষ গোল। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ক্লদিও ক্যানিজিয়াকে যখন দারুণ একটি বল বাড়িয়ে দিয়ে গোল করালেন তিনি, সেদিনও কি কেউ ভেবেছিল আর্জেন্টিনার জার্সিতে সেটিই হতে যাচ্ছে কিংবদন্তির শেষ ম্যাচ! তবে ক্যারিয়ারের শেষ গোলেও তিনি সবাইকে যেন মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরাদের তালিকায় কেন তাঁর নাম ওপরের দিকেই থাকবে।
‘৯৪–এর বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার নিষিদ্ধ হওয়া নিয়ে অনেক বিতর্কই আছে। এফিড্রিন জাতীয় একটি ওষুধের কারণেই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল ম্যারাডোনাকে। এক রাশ গ্লানি মাথায় নিয়ে তিনি ফিরে গিয়েছিলেন দেশে। তবে সেই এফিড্রিন সেবনের কারণ নিয়ে অনেক কথাই প্রচলিত আছে। ১৯৯১ সালের শেষ দিকে কোকেন সেবনের দায়ে ১৫ মাসের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিলেন ম্যারাডোনা—অন্ধকার জগতে তাঁর পদার্পণের শুরুটা সেখান থেকেই। সেই নিষেধাজ্ঞা থেকে ফেরার পর নিজের ফিটনেস ফিরে পেতে নাকি এই এফিড্রিন সেবন করতেন তিনি—ম্যারাডোনা নিজেই এ কথা বলেছেন বহু জায়গায়। তিনি বলেছিলেন ফিফার অনুমোদন নিয়েই তিনি নাকি সেই ওষুধ খেতেন। দ্রুত ফিটনেসে ফেরার জন্য। আবার ম্যারাডোনাই বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার সময়টায় তিনি একটা শক্তিবর্ধক পানীয় খেতেন, সেটাতে যে এফিড্রিন থাকে, সে সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল ছিলেন না।
ক্যারিয়ারের চতুর্থ বিশ্বকাপটা নিয়ে তিনি রীতিমতো মরিয়া ছিলেন। ১৯৮২ সালে ২০ বছর বয়সী ম্যারাডোনা নিজেকে পরিপূর্ণভাবে মেলে ধরতে পারেননি। আর্জেন্টিনা বিদায় নিয়েছিল দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই। ম্যারাডোনার কপালে জুটেছিল লাল কার্ড। সেই অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দিলেন চার বছর পর, ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপে। অনেকটা একক কৃতিত্বেই তিনি দেশকে জেতালেন দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। এরপর ১৯৯০ সালে ইতালিতে আবারও একক কৃতিত্বের শক্তিটা দেখালেন বিশ্বকে, ভাগ্যও তাঁকে সেবার সহায়তা করেছিল। প্রায় ভাঙা একটি দলকে তুললেন বিশ্বকাপের ফাইনালে। কিন্তু ভাগ্য বিড়ম্বনার শুরুটা সেখান থেকেই। জার্মানির কাছে বিতর্কিত পেনাল্টিতে গোল খেয়ে হেরে গেল আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলেন, কাঁদালেন সবাইকে। চুরানব্বইতে তাই মুখিয়ে ছিলেন আবারও নিজেকে প্রমাণের। কিন্তু শেষটা তাঁর হয়েছিল যাচ্ছেতাই।
ম্যারাডোনার জীবনের গল্পটাই এমন। গৌরব আর লজ্জা যেন সেখানে হাত ধরাধরি করে হাঁটে। তিনি সব সময়ই একটা বিশেষ চরিত্র, যে চরিত্র আনন্দ দিতে জানে, আবার বিতর্কে ডুবিয়ে দিতে পারে চারদিক। ফুটবলের গোটা ইতিহাসটাকেই যেন আরও বেশি প্রাঞ্জল করে তুলেছে এ কিংবদন্তির আবির্ভাব।
সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলারের শেষ গোলের সেই স্মৃতি সে কারণেই অবিস্মরণীয় ফুটবল দুনিয়ায়।

 

Facebook Comments

Related Articles