ফর্মে থাকলে সবাই প্রিয় মাহমুদউল্লাহর

ধরুন, সময়টাই তাঁর যাচ্ছে খারাপ। ব্যাটিংয়ে সুর ধরতে পারছেন না। রানের খাতায় ধু ধু বালুচর। প্রতিপক্ষ যে–ই হোক, মাহমুদউল্লাহর কাছে খেলাটা তখন আর উপভোগের থাকে না। জেঁকে ধরে ‘কী যেন নেই, কী যেন নেই’ জাতীয় একটা হাহাকার।

আর যদি ফর্ম থাকে দুর্দান্ত, সামনে যে আসে তাকেই ভালো লেগে যায় মাহমুদউল্লাহর। যার সঙ্গেই খেলা হয়, মনে হয়—আরে! এদের সঙ্গে খেলতেই তো ক্রিকেটটা খেলি!

প্রিয় প্রতিপক্ষ প্রসঙ্গে মাহমুদউল্লাহর দর্শন খুবই পরিষ্কার, ‘আমার সবকিছু ফর্মের ওপর নির্ভর করে। ভালো ফর্মে থাকলে সব দলের বিপক্ষে খেলতেই ভালো লাগে। আত্মবিশ্বাস ভালো থাকে তখন। যেকোনো চ্যালেঞ্জ নেওয়া যায়। আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি থাকলে চিন্তাভাবনাই বদলে যায়।’

মাহমুদউল্লাহর কাছে ক্রিকেটটা যত কঠিন, ততই আনন্দেরও। নিজে ফর্মে থাকবেন, আবার সামনে থাকবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ—তাহলেই খেলাটা জমে যায় তাঁর কাছে, ‘চ্যালেঞ্জ নেওয়াটা আমি উপভোগ করি। আপনি যত কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যাটিং করবেন, ততই নিজের সম্পর্কে জানতে পারবেন। বুঝতে পারবেন আপনার সামর্থ্য কতটুকু বা কোন জায়গায় আপনাকে আরও কাজ করতে হবে।’ একজন বড় ক্রিকেটারের সবচেয়ে বড় গুণ মাহমুদউল্লাহর চোখে এটাই, ‘যদি চ্যালেঞ্জ নিয়ে সেগুলো সাফল্যের সঙ্গে উতরে যেতে পারেন, তাহলেই বুঝতে হবে আপনি ভালো কিছু করছেন। বড় খেলোয়াড়েরা নিয়মিতই এ রকম চ্যালেঞ্জ নেন এবং সফলও হন। সে জন্যই তারা গ্রেট।’

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দুটো দল আছে, যাদের বিপক্ষে এ রকম চ্যালেঞ্জ নেওয়াটা বেশি পছন্দ মাহমুদউল্লাহর। একটি নিউজিল্যান্ড, অন্য দলটি ইংল্যান্ড, ‘আলাদা করে যদি বলতেই হয়, আমি নিউজিল্যান্ড আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতেই বেশি পছন্দ করি। এই দুটি দলের বিপক্ষে খেলাটা আমাদের জন্য বেশি চ্যালেঞ্জিং, বিশেষ করে ওদের কন্ডিশনে।’

নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ডের সিমিং কন্ডিশনে খেলা বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য বরাবরই কঠিন। প্রতিপক্ষের পেসারদের সুইং-বাউন্সের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণই নিয়তি এসব দেশে। কিন্তু মাহমুদউল্লাহর নাকি সেই চ্যালেঞ্জের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতেই বেশি ভালো লাগে। আর নিউজিল্যান্ড যদি তাঁর প্রিয় প্রতিপক্ষের তালিকায় থাকে, হ্যামিল্টন নিশ্চয়ই দেশের বাইরে প্রিয় ভেন্যু। মাহমুদউল্লাহর অর্জনের অনেক কিছুরই যে সাক্ষী নিউজিল্যান্ডের এই শহর!

টেস্টে এখন পর্যন্ত করা তাঁর চার সেঞ্চুরির দুটিই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এবং দুটিই করেছেন হ্যামিল্টনে। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে করা প্রথম সেঞ্চুরিটি আবার ছিল নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনে মাহমুদউল্লাহর প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসেই। কিউইদের বিপক্ষে এ পর্যন্ত যে পাঁচটি টেস্ট তিনি খেলেছেন, তার সবই অবশ্য নিউজিল্যান্ডের মাটিতে। তবু ওই কন্ডিশনে দলটির বিপক্ষে তাঁর টেস্ট গড় দেখুন—৪৯.৩০। অথচ ৪৯ টেস্টের ক্যারিয়ারে তাঁর গড় ৩১.৭৭।

শুধু টেস্ট কেন, ওয়ানডেতেও হ্যামিল্টনকে মাহমুদউল্লাহর পয়া ভেন্যু বলা যায়। সঙ্গে নিউজিল্যান্ড তো প্রিয় প্রতিপক্ষ থাকবেই। ৫০ ওভারের ক্রিকেটে তিন সেঞ্চুরির দুটিই করেছেন এই দলটির বিপক্ষে। সর্বশেষটি ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। তার আগে ২০১৫ বিশ্বকাপে প্রথম সেঞ্চুরিটি করেন ওই হ্যামিল্টনেই। আর ইংল্যান্ডও কেন মাহমুদউল্লাহর প্রিয় প্রতিপক্ষ, সেটি আগের ম্যাচের স্কোরকার্ড দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। ওই বিশ্বকাপেই অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৫ রানে জিতেছিল বাংলাদেশ দল। ১০৩ রানের ইনিংস খেলে সেটি জিতিয়েছিলেন ম্যান অব দ্য ম্যাচ মাহমুদউল্লাহই।

সেই স্মৃতি মনে পড়লে এখনো রোমাঞ্চ দোলা দেয় বাংলাদেশ দলের অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যানের মনে, ‘এই দুটি দলের (ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড) বিপক্ষেই আমার এক-দুটি ভালো ইনিংস আছে। ম্যাচগুলোর কথা মনে পড়লে অনুপ্রাণিত হই। অন্যকে দেখে অনুপ্রাণিত হওয়ার চেয়ে আমি যদি নিজেকে দেখে অনুপ্রাণিত হতে পারি, নিজের ভালো ইনিংস থেকে অনুপ্রেরণা নিতে পারি, সেটি ভবিষ্যতের জন্য আরও ভালো কিছু করতে আরও বেশি প্রেরণা জোগাবে।’

ব্যাটিংয়ে মাহমুদউল্লাহর নীতি হলো প্রথম ১০ বল খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে খেলা। বোঝার চেষ্টা করা—উইকেটে টিকে থাকতে হলে কী করতে হবে বা কোন বোলার কীভাবে তাঁকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করছে। ওই ১০ বলে বলটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় মাহমুদউল্লাহর চোখে, ‘বলটা ঠিকভাবে দেখতে পারলে বাকি সবই সহজ।’

বোলার যে–ই হোক, এটিই তাঁর ব্যাটিংয়ের মূলমন্ত্র। যেমন প্রতিপক্ষ যে–ই হোক, ফর্ম আর আত্মবিশ্বাস থাকলে সব দলকেই মাহমুদউল্লাহর মনে হয় ‘প্রিয়’ প্রতিপক্ষ।

Facebook Comments

Related Articles

Close