অধিদপ্তরের ওপারে বসে প্রতারণা করা জেকেজি’র সাথে ডিজির সখ্যতার রহস্যটা কী?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রাস্তার ওপারেই তিতুমীর কলেজ। সেখানে বুথ বসিয়েছিল জেকেজি হেলথ কেয়ার নামের একটি প্রতিষ্ঠান। চলত নানান কথিত ট্রেনিং বা কর্মশালাও। মঙ্গলবার (২৩ জুন) করোনাভাইরাসের উপসর্গ থাকা রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই ভুয়া রিপোর্ট প্রদানকারী প্রতারকচক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে তেজগাঁও থানা পুলিশ। গ্রেফতারদের মধ্যে আরিফুল চৌধুরী জেকেজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। এছাড়া গ্রেফতার হুমায়ুন কবীর ও তানজিনা দম্পতি জেকেজির সাবেক স্টাফ।

করোনার দুঃসময়ে এপ্রিল মাস থেকে চলা এই প্রতারণায় থমকে গেছে বিপদে থাকা মানুষ। টাকা দিয়েও এতদিন প্রতারণার স্বীকার হতে হল এতদিন! রাস্তার ওপারের অধিদপ্তর থেকে কেন কোন তদারকি করা হয়নি এতদিন, পুলিশ এটা না ধরলে কি এভাবেই চলত; এসব প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসা স্বাভাবিক। এর আগেও অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটালেও কেন অধিদপ্তর কোন ঢু মারল না সেখানে, কেন মহাপরিচালকের এত সখ্য জেকেজির সাথে?

ডা. আজাদের আগ্রহেই জেকেজি হেলথ কেয়ার নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে করোনার নমুনা সংগ্রহের কাজে যুক্ত করা হয়। ওই নমুনা পরীক্ষা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে ওই প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অথচ অনুমোদন দেওয়ার আগে ডিজি ওই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। তার সেই ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সরেজমিন পরিদর্শনের বিষয়টির সমালোচনা করে অনেকে বলেছেন, করোনা সংক্রমণের পর আজ পর্যন্ত কোনো হাসপাতাল পরিদর্শনে যাননি ডিজি। এমনকি অর্ধশতাধিক চিকিৎসকের মৃত্যুর ঘটনায় একটি শোকবার্তাও দেননি। অথচ তিনি জেকেজি নামের ওই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। পিপিই সহ নানান নিরাপত্তা সরঞ্জামের বন্দোবস্ত করা হয়েছিল আবুল কালাম আজাদের সরাসরি হস্তক্ষেপেই। অথচ তখন দেশজুড়ে ছিল পিপিই’র জন্য হাহাকার।

১৩ এপ্রিল প্রকাশিত সংবাদের কিছু অংশ তুলে ধরা হলোঃ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ গতকাল রোববার বলেন, আমরা অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ জাতীয় ধারণা নিয়ে এগিয়ে আসতে উত্সাহ দিচ্ছি। অবশ্যই, এই ধরনের সুযোগ-সুবিধা আমাদের পরীক্ষা বাড়াতে বাড়তি সুবিধা দেবে।

তিনি জানান, এই বুথের মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ করতে জনবলও কম লাগবে। এনজিও জেকেজি হেলথ কেয়ার নমুনা সংগ্রহ করছে এবং সেগুলো ডিজিএইচএস তাদের নিজস্ব পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করবে।

তিনি আরও বলেন, সন্দেহভাজন রোগীদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করার সময় এই বুথ স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতিটি নমুনা সংগ্রহ করার পর তাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম (পিপিই) বদলাতে হবে না।

এর আগে, জেকেজি হেলথ কেয়ারের কর্মী ও তিতুমীর কলেজের কর্মচারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে তিতুমীর কলেজের ছয়জন স্টাফ আহত হন। তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। সে সময় প্রকাশিত সংবাদের কিছু অংশ তুলে ধরা হলোঃ

গভীর রাতে রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজের কর্মচারীদের ওপর বর্বর হামলা করেছে করোনার নমুনা সংগ্রহের জন্য অস্থায়ী বুথের স্বেচ্ছাসেবকরা। শুধু তাদের ওপর হামলা নয় এ সময় স্বেচ্ছাসেবীরা সন্ত্রাসের মতো কর্মচারীদের বাসভবনেও হামলা চালিয়েছে এমনটাই দাবি করেছেন কলেজের ছাত্রছাত্রী ও কর্মচারীরা। এই ঘটনায় কলেজ স্টাফদের ২৫/৩০ কর্মচারী আহত হন।

কলেজের কর্মচারীরা দৈনিক শিক্ষাকে জানান, ২ জুন রাত ২টার দিকে ছেলেদের থাকার জায়গায় স্বেচ্ছাসেবী মেয়েদের ঘোরাঘুরি করতে দেখে। এ সময় একজন মেয়ে বুথের ভেতরে প্রবেশ করে। করোনা বুথের দুজন ছেলে এবং একজন মেয়েকে একসঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় থাকতে দেখা যায়।

জানা যায়, কলেজের কর্মচারীদের কয়েকজন এতে বাধা দেয়ায় তাদের লাঠিপেটা, ঘরবাড়ি ভাংচুর, চাপাতি দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপানো হয়। স্টাফদের দাবি অসামাজিক কার্যকলাপে বাধা দেয়ায় স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে।

পুলিশ জানায়, এই চক্রটি আগে জেকেজি’র হয়ে করোনার উপস্বর্গ রয়েছে এমন লোকজনের নমুনা সংগ্রহের কাজ করতো। করোনা পরীক্ষা বিষয়ে আইইডিসিআরের অনুমোদন রয়েছে জেকেজি’র। সম্প্রতি ওই চক্রের কিছু সদস্যরা জেকেজি থেকে চাকরি ছেড়ে দেয়। এরপর নিজেরাই অনলাইনে ‘হেলথ কেয়ার’ ও ‘বুকিং বিডি’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হয় বলে বিজ্ঞাপন দেয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ওই বিজ্ঞাপন দেখে অনেকেই করোনা পরীক্ষা করার জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এই প্রতারক চক্রের সদস্যরা নমুনা সংগ্রহের পর কোনও ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই যাদের উপসর্গ রয়েছে তাদের পজিটিভ ও যাদের উপসর্গ নেই তাদের নেগেটিভ রিপোর্ট মেইল করে জানিয়ে দিতো। এজন্য প্রত্যেক ব্যক্তির কাছ থেকে তারা পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নিতো।

এই প্রতারণার অভিযোগ ওঠায় সন্দেহজনক কোভিড-১৯ রোগীর নমুনা সংগ্রহ, কেন্দ্র স্থাপন ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়ে জেকেজি হেলথ কেয়ারের অনুমোদন বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। বুধবার ( ২৪ জুন) অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) নমুনা পরীক্ষার জন্য অনুমতি পায় জেকেজি হেলথকেয়ার।

সবকিছু ছাপিয়ে প্রশ্ন ওঠা অতি স্বাভাবিক, মহাপরিচালকের অফিসের সামনে বসে এসব প্রতারণা কি সবার অজান্তেই করে গেছে জেকেজি?

Facebook Comments

Related Articles