লাইসেন্সবিহীন রিজেন্ট হাসপাতালে কেন গিয়েছিলেন মন্ত্রী ও ডিজি?

করোনাভাইরাস শনাক্তকরণ পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট দেওয়াসহ নানা অভিযোগে রাজধানীর রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় অভিযান চালিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসময় হাসপাতালটির উত্তরা শাখা সিলগালা করা হয়েছে এবং করোনাসহ সকল রোগীদের অন্য সরকারি হাসপতালে স্থানান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে র‌্যাব। এছাড়াও হাসপাতালটির ব্যবস্থাপক সহ ৮ কর্মীকে আটক করা হয়েছে।

গতকাল সোমবার (৬ জুলাই) বিকেলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিনা করে র‌্যাব। হাসপাতালের একটি শাখার লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে ছয় বছর আগে, আরেকটি শাখার তিন বছর আগে। তা সত্ত্বেও করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়ার অনুমতি পেয়েছিল রিজেন্ট হাসপাতাল।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য খাতে যত কেলেঙ্কারি হচ্ছে, সবগুলোতেই যেন বেরিয়ে আসছে মন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবুল কালাম আজাদের সংশ্লিষ্টতা।

জেএমআই গ্রুপের মাস্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় মন্ত্রীর নাম উঠে এসেছিল। সেখানে ডিজিরও যোগসাজশ ছিল।

কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মোহাম্ম’দ শহীদউল্লাহ তার লেখা চিঠিতে স্বাস্থ্য খাতে সিন্ডিকেটের পেছনে এই দুজনের সংশ্লিষ্টতার কথা ফাঁস করেছিলেন।

এরপর করোনা পরীক্ষায় জেকেজির দুর্নীতি ও অনিয়মেও উঠে এসেছে ডিজির ঘনিষ্ঠতা। পিসিআর মেশিন ক্রয়ের যে অনিয়ম সেখানেও এসেছে আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নাম। আর সর্বশেষ রিজেন্ট হাসপাতালের যে মহা দু’র্নীতি ও অনিয়ম ফাঁস হলো, সেখানেও দেখা যাচ্ছে এই দুজন ব্যক্তির যোগসাজশ।

গতকাল রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় অভিযান চালায় রেপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) ভ্রাম্যমাণ আদালত। এই অভিযানে বেরিয়ে আসে হাসপাতালটির একের পর এক অপকর্ম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বিনামূল্যে করোনা টেস্টের অনুমতি নিয়ে রোগীদের থেকে প্রতি পরীক্ষায় তিন/চার হাজার টাকা আদায় করেছে এই হাসপাতাল। এমনকি তাদের সংগৃহীত করো’নার স্যাম্পলের অর্ধেকের বেশি পরীক্ষা না করেই অনুমান নির্ভর রিপোর্ট সরবরাহ করা হয়েছে। হাসপাতালটি করোনা রোগীদের ফ্রি চিকিৎসা দিচ্ছে জানিয়ে সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করলেও রোগীপ্রতি দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকা আদায় করেছে। শুধুমাত্র ভর্তি রোগীর করোনা পরীক্ষার অনুমতি থাকলেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্যাম্পল সংগ্রহ করে ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে এই হাসপাতাল।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো ছয় বছর আগেই রিজেন্ট হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তারপরও তারা চিকিৎসা সেবার নামে রোগীদের কাছ থেকে কাড়ি কাড়ি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল। এই অপকর্মের জন্য শাস্তির আওতায় আনার বদলে এই হাসপাতালকে পুরষ্কৃত করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। লাইসেন্সবিহীন এই হাসপাতালকেই করোনা চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই সুযোগে করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার নামে আরও বড় অপকর্মের সুযোগ পেয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। আরও অবাক করা বিষয় হলো, যেই হাসপাতালটির লাইসেন্সই নেই, সেই হাসপাতালেরই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং ডিজি। এর আগে জেকেজির পরীক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধনেও দেখা গিয়েছিল ডিজিকে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যখাতে নানা অপকর্মে লিপ্ত বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে মন্ত্রী এবং ডিজির যে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে এসব ঘটনা থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

জানা গেছে, রিজেন্ট হাসপাতালের কর্ণধার মো. শাহেদের সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং ডিজি দুজনেরই সুসম্পর্ক। এজন্যই এই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে একের পর এক সুযোগ দিয়ে গেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ঠিক এই কাজটিই করা হয়েছিল মিঠু গ্রুপ, জেকেজি গ্রুপ এবং জেএমআই গ্রুপেরও ক্ষেত্রেও। ঢালাওভাবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাস্থ্য খাতে ডাকাতির সুযোগ দিয়ে গেছেন মন্ত্রী এবং ডিজি।

বর্তমান করোনা সংকট মোকাবেলায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং ডিজিরই সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল। অথচ তারা দুজন করোনা মোকাবেলায় নেতৃত্ব না দিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের নেতৃত্বে মেতে উঠেছেন। যার ফলে স্বাস্থ্যখাতে আরও অনেকে যেমন অপকর্মের সুযোগ পাচ্ছে, ঠিক একইভাবে অনেকের অক্লান্ত পরিশ্রম আবার নিষ্ফল হয়ে যাচ্ছে।

সুত্র: বাংলা ইনসাইডার

Facebook Comments

Related Articles