কিভাবে প্রতারক ‘রিজেন্ট হাসপাতাল’ কোভিডের জন্য ডেডিকেটেড?

মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স সহ একটি হাসপাতালকে কি করে করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় ডেডিকেটেড করল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সে প্রশ্ন এখন সবার মধ্যে। কোন পরীক্ষা না করেই জেকেজি হেলথ যেভাবে প্রতারণা করেছে তার চেয়েও বড় প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে রিজেন্ট হাসপাতাল। একটি অনলাইন পত্রিকা ‘বাংলা ট্রিবিউন’ এ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চায়।

অনুমোদনহীন একটা হাসপাতালকে কী করে অধিদফতর কোভিড চিকিৎসায় নির্ধারণ করে দিল জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করতে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘আপনি এপ্রিল মাসের কথা চিন্তা করুন্। তখন রোগীরা ঘুরে বেড়াচ্ছিল, বেসরকারি কোনও হাসপাতাল রোগী নিচ্ছিলো না। সেই সময় আমাদের কেউ বলেছে, তারা (রিজেন্ট হাসপাতাল) এরকম (রোগী ভর্তি) করতে চায়, আপনারা দেখেন। তাদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে রোগীর সেবার জন্য। তখন এটা বিবেচনা করা হয়নি, দেখা হয়নি।’

সেই ‘কেউ’টা কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বলেছেন “উপরের কেউ”, কিন্তু আমি তো আর এই মুহূর্তে বলতে পারবো না। আর আমরা তো আর তাকে চিনি না।’ বলেন ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা। অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) তাকে চেনেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, পরিচালক তাকে কেমন করে চিনবে।’

তাহলে কীসের ভিত্তিতে, কোনও যাচাই-বাছাই ছাড়া রিজেন্টকে অধিদফতর থেকে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল নির্ধারণ করা হলো? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা পরিচালককে (হাসপাতাল) জিজ্ঞেস করুন।’

তবে কিছু সময় পর এ প্রতিবেদককে এই কর্মকর্তা ফোন করে বলেন, ‘কিছু তথ্য আমি সঠিক দিইনি। সেটা হলো, পরিচালক (হাসপাতাল) জানতো যে নবায়ন হয়নি। তাকে শর্তই দেওয়া হয়েছিল, সে লাইসেন্স নবায়ন করবে।’ সেটা মনিটর করা হচ্ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাদের তাগিদ দেওয়া হচ্ছিল।’

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক ও বিএমএ’র (বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, ‘২০১৪ সালের পর যে হাসপাতালের নবায়ন করা হয়নি, যে হাসপাতালে এত অনিয়ম সে হাসপাতালকে কোন বৈধতায় স্বাস্থ্য অধিদফতর কোভিডের মতো মহামারিতে সরকারি তালিকাভুক্ত করলো সেটা খুঁজে বের করা দরকার। তারা তো কিছু চেকই করেনি, যদি করতো তাহলে ধরা পড়তো। পরবর্তী সময়েও হাসপাতালটিকে মনিটর করা হয়েছে কিনা প্রশ্ন করে অধ্যাপক রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বা পরিচালক ( হাসপাতাল) এসব ইন্সপেকশন করে না, তারা তাদের রুটিন কাজও করেনি। এতে তাদের অবহেলা এবং অদক্ষতা দুটোই রয়েছে।’

এসব বিষয়ে কথা বলতে একাধিকবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আমিনুল হাসানকে মোবাইল ফোনে কল করে এবং এসএমএস পাঠিয়েও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি, তিনি উত্তর দেননি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন ‘আমরা তো তাকে চিনি না’ বলেছিলেন। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সেই কর্মকর্তাদের সঙ্গেই রিজেন্ট চেয়ারম্যান মো. সাহেদের ছবি ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে গত ৭ জুন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেনশন অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের ( নিপসম) পরিচালক অধ্যাপক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ রিজেন্টের প্রতারণা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর বরাবর চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি বলেন, ‘রিজেন্ট হাসপাতাল নমুনা দেওয়ার নাম করে সাড়ে তিন হাজার টাকা আদায় করছে। অথচ নিপসম তথা সরকার বিনামূল্যে আরটি পিসিআর পরীক্ষা করছে।’ বিষয়টি সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, ‘কীভাবে স্যাম্পল সরবরাহ করতে হবে সে বিষয়েও নির্দেশিকা রিজেন্ট হাসপাতালকে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া বা সতর্ক করার পরও রিজেন্ট হাসপাতাল তা অনুসরণ করছে না। যার কারণে রিজেন্ট হাসপাতালের কোনও স্যাম্পল নিপসমের পক্ষে পরীক্ষা করা যুক্তিযুক্ত নয় বলে প্রতীয়মান হয়।’ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয় স্বাস্থ্য অধিদফতরকে।

তার ঠিক দুই দিন পর ( ৯ জুন) নিপসম পরিচালককে ফিরতি চিঠি দিয়ে প্রতিদিন উত্তরা ও মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতালের প্রতিদিন ৫০টি নমুনা পরীক্ষার জন্য ‘নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো’ বলে জানানো হয়।

Facebook Comments

Related Articles