সাহেদ দিত উপহার, টকশোতে ডাক পড়ত বারবার; সবই জানা ছিল মিডিয়ার

জালিয়াতিসহ বিভিন্ন প্রতারণার অভিযোগে ৩২টি মামলা হয়েছে। কর্মমুখী কর্মসংস্থান সোসাইটি (কেকেএস) এবং ‘বিডিএস ক্লিক ওয়ান’ নামে এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং) কোম্পানি খুলে গ্রাহকদের কাছ থেকে ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ধানমণ্ডি থানায় মামলা হয়। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জেলও খাটেন সাহেদ। নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখার উপসচিব নায়েব আলী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ভুয়া সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা পরিচয়ে অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এতে মোহাম্মদ শহীদ নামের ব্যক্তিকে ‘ভয়ংকর প্রতারক’ বলে উল্লেখ করা হয়। এসব কি কিছুই জানত না মিডিয়া?

রিজেন্ট হাসপাতালকে করোনার জন্য ডেডিকেটেড করার সময় এলাকাবাসীর হামলার মিথ্যা নাটক মঞ্চায়নে সাহায্য করেছিল নামকরা কিছু সাংবাদিক। সাংবাদিক অঞ্জন রায়ের এই ফেসবুক পোস্টটি তিনি সরিয়ে ফেলেন সাহেদ ধরা পড়ার পরপরই যেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘এই শহরের এতো চার তারকা পাঁচ তারকা হাসপাতাল রয়েছে-–মানুষের রোগ আর শোকের ব্যাবসায়ী সেই হাসপাতালগুলোর মালিকরা একটাও যখন কোনও কথা বলছেন না। তখন উত্তরা আর মীরপুরে রিজেন্ট হাসপাতাল তাদের দুটো হাসপাতালেই করোনাভাইরাস আক্রান্তের চিকিৎসার জন্য রাজী হয়ে স্বাস্হ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে এমএমইউ স্বাক্ষর করলো। সাথে সাথেই সেখানে একদল মানুষ লেলিয়ে দেয়া হলো, তাদের দাবি–এই হাসপাতালে করোনা আক্রান্তের চিকিৎসা হলে এলাকাবাসী নাকি আক্রান্ত হবে? হাসপাতাল ভাঙা হলো। আটকে দেয়া হলো সেই হাসপাতালে প্রবেশের মূল রাস্তার দুই দিকেই। পরে কেনওভাবে একপাশের পথ খুলেছে। রিজেন্ট হাসপাতাল এখন মোটামুটি প্রস্তুত করোনাভাইরাস আক্রান্তের সেবায়। হাসপাতাল মালিক Md Shahed এর অভিযোগ এই ঘটনা ঘটেছে ওয়ার্ড কমিশনারের প্ররোচনায় আর উস্কানীতে।’

সাহেদের পরামর্শে তার হাসপাতালের এক নারী পরিচালক আরেকটি নাটক মঞ্চস্থ করেন। সেখানে তিনি নিজের অসুস্থ পিতাকে রিজেন্ট হাসপাতালে সিট ম্যানেজ করে দিতে পারেননি। সেই স্ট্যাটাসটির বরাতে কোনরকম অনুসন্ধান ছাড়াই খবর প্রকাশ করে গণমাধ্যমগুলো।

সাংবাদিকদের সাথে সাহেদের একাধিক ঘনিষ্ঠ ছবি দেখে বোঝার উপায় নেই তারা অল্প দিনের পরিচিত। অনুসন্ধানে জানা গেছে সব কিছুই জানা ছিল প্রথম শ্রেণীর কিছু টকশো সঞ্চালক এবং সাংবাদিকদের। অনেকে সাহেদের ব্যাপারে তাদের জানালেও সাহেদকে পুনরায় আমন্ত্রণ জানানোতেই বেশি আগ্রহী ছিল তারা। মিডিয়ায় কাজ করেন এমন সাংবাদিকরাই মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তারা বলছেন সাহেদের মোটা ‘উপঢৌকন’ই ছিল আমন্ত্রণের মূল উদ্দেশ্য। সাধারণ টকশোতে কোন নেতাকে ডাকলে চ্যানেলের পক্ষ থেকে একটি সম্মানী খাম দেওয়ার রেওয়াজ আছে। সাহেদের বেলায় ছিল উল্টো। টকশোর আগে পরে সঞ্চালক এবং অন্যান্যদের নিয়ে সাহেদ তারকা রেস্টুরেন্টে যেত। দেশের প্রথম শ্রেণীর কিছু সাংবাদিক এবং টকশো সঞ্চালককে বিদেশে ঘুরে আসার বন্দোবস্ত করে দিত সাহেদ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত চার-পাঁচ বছর ধরে নিজেকে কথিত বুদ্ধিজীবী বা রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে পরিচয় দিতেন তিনি। সেন্টার ফর পলিটিক্যাল রিসার্চ বা রাজনীতি গবেষণা কেন্দ্র নামে একটি প্রতিষ্ঠানও চালাতেন তিনি। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সুবিধা আদায়ের জন্য ‘নতুন কাগজ’ নামে একটি নামসর্বস্ব পত্রিকাও খুলেছেন তিনি এক ‘প্রথিতযশা’ সাংবাদিকের পরামর্শে। এসবই ছিল তার বিভিন্ন অপকর্ম থেকে নিজেকে বাঁচানোর ঢাল। মোটা অংকের টাকার বিনিময়েই তিনি বুদ্ধিজীবী সেজে টক শো’তে অংশগ্রহণ করতেন। তার টকশোতে কথা বলার সুবিধার জন্য অনেক সময়ই প্রশ্ন এবং উপাত্তসহ উত্তর প্রস্তুত থাকত সঞ্চালকের পক্ষ থেকেই। তার মিডিয়া প্রমোটারদের দিতে হত ‘বিনোদনের’ খরচ। এসব কাজে একাধিক নারী সহকর্মী ও উঠতি মডেলকেও ব্যবহার করত সাহেদ।

এ নিয়ে একুশে টিভির সাবেক বার্তা সম্পাদক সাঈফ ইবনে রফিক ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন যেখানে তিনি লিখেন,

“মেজর সাহেদ পরিচয় দেয়ার পর জিগাইলাম, আপনি কোন লংকোর্সের? উত্তর না দিয়া বাঘ-সিংহ মারার গল্প শুরু করলেন।
জিটিভিতে রাতের ডিউটিতে টকশো গেস্টদের সাথে মিনিট দশেকের আড্ডা দিতাম। তবে সাহেদ বা ট্রাক শ্রমিক নেতা গোছের কেউ হলে এড়িয়ে যেতাম।
একবার এক চাপাবাজ বললেন, তিনি ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের সাবেক ছাত্র। এক্স-ক্যাডেট পরিচয় দেয়ার সাথে সাথে জিগাইলাম, কোন ব্যাচ, কোন হাউসে ছিলেন? কয়, শহীদুল্লাহ হাউস। ক্যাডেট নম্বর মনে নাই! টিভিতে যে রকম কনফিডেন্টলি চাপা মারে, একই ভোকালের চাপায় বিস্মিত হইলাম!
খোঁজখবর নিয়া আরেকদিন জিটিভির সিঁড়িঘরে ব্যাটারে কানে কানে কইলাম, ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ ফেলাইয়া দেন। পরে আর্মি হেডকোয়ার্টার ঝামেলা করতে পারে।
এই টাউটারির কথা টকশো সঞ্চালকরা জানতো। আমিই বহুবার জানাইছি। কাজ হয় নাই। আমি অপ্রিয় হইছি।”

Facebook Comments

Related Articles

Close