অপেক্ষা করবো সেই দিনটির জন্য যেদিন স্রষ্টার সামনে সবাই দাঁড়াবোঃদূর্নীতি প্রসঙ্গে লেখক

শনিবার,১১ জুলাই,২০২০

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. সাবরিনা চৌধুরী যে জেকেজির আরিফ চৌধুরীর চতুর্থ স্ত্রী, আমি কিন্তু আজ আপনাদের এ কথা বলতে আসিনি।
আরিফের এক স্ত্রী থাকেন রাশিয়ায়, অন্যজন লন্ডনে, আর যার সঙ্গে অনেক আগেই তার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, সাবেক ওই স্ত্রীই নাকি বিভিন্ন জায়গায় আরিফের জন্য দেনদরবার করে যাচ্ছেন এখন, আমি এটাও বলতে আসিনি।
স্বামী-স্ত্রী মিলে ভুয়া করোনা টেস্ট করলেও তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের নয়। স্ত্রীর সঙ্গে অশালীন অবস্থায় দেখতে পেয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের এক চিকিৎসককে মারধর করেছিলেন আরিফ। পরে এ ঘটনায় স্বামীর বিরুদ্ধে শেরে-বাংলানগর থানায় জিডি করেছিলেন সাবরিনা। এছাড়া জেকেজির এক কর্মীকে অশালীন প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনায় গুলশান থানার আরিফের বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে। এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কথা বলাটা শোভা পায় না আমার।
সাবরিনার হাত ধরেই করোনার স্যাম্পল কালেকশনের কাজটি ভাগিয়ে নেয় অনেকটা অখ্যাত জেকেজি। এবং জেকেজির গুলশান কার্যালয়ের ১৫ তলার এক ফ্লোরে ৭-৮ জন কর্মী দিনরাত এক ল্যাপটপেই তৈরি করেছিলেন ১৫ হাজার ৪৬০টি ভুয়া রিপোর্ট! হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৮ কোটি টাকার বেশি টাকা। যদিও দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে ম্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির ভিত্তিতে বিনামূল্যে তাদের স্যাম্পল কালেকশন করার কথা ছিল। দুঃখিত, আমি এটাও বলতে আসিনি।
করোনার এই ভুয়া রিপোর্ট তৈরির কাজটি জেকেজির যে কর্মীরা করত, তাদের জন্য ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে আনন্দ ট্রিপের ব্যবস্থা করেছিলেন ডা. সাবরিনা চৌধুরী ও তার স্বামী আরিফ চৌধুরী। একজন নারী ও একজন পুরুষ কর্মীকে আলাদাভাবে পাঠানো ওই ট্রিপের নাম ছিল—‘হানিমুন ট্রিপ’। না, এটাও একটা অশ্লীল বিষয়। সুতরাং…
আরিফ মাদক সিন্ডিকেটে জড়িত। নিজে নিয়মিত ইয়াবা খান। গ্রেফতারের পর তেজগাঁও থানায় আনা হলে মাদক না পেয়ে এক পর্যায়ে থানার সিসি ক্যামেরাও ভেঙে ফেলেন। আরিফ জেলে, সাবরিনা বাইরে। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। না না, এই চেষ্টা কতদিন চলবে, আমি এটাও বলতে আসিনি।

আমি আসলে কোনো কথাই বলতে আসিনি, আমি এসেছি একটা কথা জানতে।

০২

  • ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের চেয়ারম্যান ও লেক্সিকোন মার্চেন্ডাইজ ও টেকনোক্র্যাট লিমিটেডের মালিক মো. মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু দেশের অনেক হাসপাতালে অনেক যন্ত্রপাতি না দিয়ে, কেবল খালি বাক্স দিয়েই হাতিয়ে নিয়েছেন ৯০০ কোটি টাকা।
  • মাত্র এক মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেবাদানকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের খাবারের বিল এসেছে ২০ কোটি টাকা।
  • বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনার প্রকল্পটিতে ৫০০ টাকার গগলস ৫০০০, ২০০০ টাকার পিপিই ৪৭০০ টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে।
  • আর সদ্য গুণধর রিজেন্টে হাসপাতালে মো. সাহেদ। সেখানেও কোটি কোটি। কোটির নিচে কোনো কথা নেই কোনোখানে।

০৩
এই যে এতো কিছু, তা কি তারা কেবল একাই করেছেন? এদের পেছনে কেউ নেই? পুলিশের সন্দেহ— এদের সঙ্গে প্রভাবশালী রাঘববোয়ালরা জড়িত। আমি এটাই জানতে চাই—এই রাঘববোয়ালরা কারা?
কোনো মন্ত্রী বা মন্ত্রীগণ?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কতজন বড় কর্তা?
দেশের কতজন ক্ষমতাশালী?
কতজন মুখোশপরা সুবিধাভোগী?

০৪
আমাদের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমি বলি—আমাদের প্রধানমন্ত্রী। কয়দিন আগে দু জন আভাসে-ইঙ্গিতে আমাকে বলেছেন, আমি ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী’ বলি কেন? স্বভাবজাত ঠোঁটকাটার মতো আমি বলেছি—উনি যদি আমাদের প্রধানমন্ত্রী না হন, তাহলে পাকিস্তানের ইমরান খান আমাদের প্রধানমন্ত্রী? ভারতের নরেন্দ্র মোদী আমাদের প্রধানমন্ত্রী?
চুপ হয়ে গিয়েছিলেন তারা।

আমি আজও বলব—আমাদের প্রধানমন্ত্রী। আমি নিদ্বির্ধায় বলব, বুকের সমস্ত বিশ্বাস নিয়ে বলব, প্রগাঢ় প্রত্যয় নিয়ে বলব—আমাদের প্রধানমন্ত্রী সব জানেন, এরই মধ্যে সব জেনে ফেলেছেন। তারপরও যদি তিনি বলেন, না, আমি জানি না—আমি কিছু বলব না। কারণ একজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তর্ক করার মতো সাহস আমার নেই, তর্ক করার মতো বেয়াদবি আমার শিক্ষক বাবা আমাকে শেখাননি কখনো।
আমি কেবল অপেক্ষা করব সেই দিনটির জন্য, যেদিন স্রষ্টার সামনে আমি, তিনি, সবাই একসঙ্গে দাঁড়াবো। তখন তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলব, ‘আপা, আপনি সত্যি জানতেন না!’

০৫
সবুজবাগের দক্ষিণগাঁওয়ের কুসুমবাগ এলাকার এক বাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ডে গত ১৬ জুন এক নারীর গলিত লাশ পাওয়া গেছে। তার নাম পলি আক্তার। তাকে খুন করার পর ওই স্থানে লাশটি ফেলে রাখা হয়েছিল। এরপর তার বাবা ও অন্যান্য স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুলিশ। তবে জীবনের নিষ্ঠুর বাঁকে ধাক্কা খেয়ে যৌনকর্মী হয়ে ওঠা এই নারীর ব্যাপারে তারা একটুও সহানুভূতি দেখাননি।
তাকে কেন মেরে ফেলা হয়েছিল?
সিএনজি অটোরিকশার এক চালক সাদা মিয়া গত ১৩ জুন বিকেলে নিজের অটোরিকশায় পলিকে রামপুরা থেকে বাসায় নিয়ে আসে। অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মাত্র ৫০ টাকা কম-বেশি পারিশ্রমিক নিয়ে পলির সঙ্গে বাকবিতন্ডা হয় তার। একপর্যায়ে সাদা মিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে, বাসার আন্ডারগ্রাউন্ডে জমে থাকা পানির মধ্যে ফেলে দেয় লাশ।

হে আল্লাহ, এই নাগরিক শহরে কোটি কোটি টাকার হিসেব নিকেশে মাত্র ৫০ টাকার জন্য একটা মানুষের জীবন যায়, তারপরও তুমি মহান। কারণ শেষপর্যন্ত তোমার কাছেই এসব বলতে হয় আমাদের। কথা শোনার মতো, পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই যে তুমি ছাড়া। তুমিই আমাদের শেষ আশ্রয়, শেষ ভরসা বলে!

©কথাসাহিত্যিক সুমন্ত আসলাম

আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন::
লাইক দিন: https://www.facebook.com/eisomoy365/ (‘এই সময়’ ফেসবুক পেইজ)
সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে: https://youtu.be/ZBMTaqUNbh4

Facebook Comments

Related Articles