স্বাস্থ্য সচিবের কাছে ব্যাখ্যা চাইলো এফডিএসআর

প্রথম আলো পত্রিকায় স্বাস্থ্য সচিবের একটি মন্তব্যের ব্যাপারে ব্যাখ্যা চেয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটিসের (এফডিএসআর)৷

সম্প্রতি পত্রিকাটির একটি প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকারে স্বাস্থ্য সচিবের মোঃ আব্দুল মান্নান বলেছেন, ‘দুঃখজনক হলো একজন সেবাপ্রত্যাশীর পরীক্ষা প্রয়োজন একটি বা দুটি। অথচ চিকিৎসক দিচ্ছেন ১০ টি।’

‘আপনার কাছে বিনীত প্রশ্ন’ শিরোনামে এফডিএসআর -এর চিঠিতে বলা হয়,

“বিনীত নিবেদন এই যে আপনি কি সত্যই প্রথম আলো পত্রিকার সংবাদদাতাকে একথা বলেছেন যে ডাক্তাররা একটি বা দুটি পরীক্ষার দরকার থাকলে রোগীকে দশটা পরীক্ষা দেয়?

প্রথমত আপনি এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করতে পারেন বলে আমরা বিশ্বাস করি না। অতএব যদি এটা আপনি না বলে থাকেন তবে এখনি প্রথম আলোতে প্রতিবাদলিপি দিয়ে এটি সংশোধন করতে বলেন।

আর যদি আপনি এটা বলে থাকেন তবে মনোযোগ দিয়ে কিছু বিষয় যদি বুঝতে চেষ্টা করেন তবে অত্যন্ত আনন্দিত হবো।

১. চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগীর পরীক্ষা নিরীক্ষা একটি আবশ্যিক বিষয়। এখনকার চিকিৎসা এভিডেন্স বেস্‌ড চিকিৎসা। রোগীর অ্যানিমিয়া আছে কিনা এটা কেবল চোখ দেখে নয়, রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হয়। এরকম কিছু চিকিৎসা পরীক্ষণ আছে যাকে রুটিন টেস্ট বলা হয়।

২. রোগীর বয়সভিত্তিতে এই রুটিন পরীক্ষার প্রকারভেদ আছে। যেমন ৪০ এর বেশী পুরুষের প্রোস্টেট এর স্বাস্থ্য দেখা, মেয়েদের বোন ডেনসিটি দেখা, ম্যামোগ্রাম, কোলনোস্কপি এরকম নানা রকম স্ক্রীনিং টেস্ট আছে যা সারা পৃথিবীতে করা হয়।

৩. কিছু পরীক্ষা আছে যা সাম্প্রতিক সময়ে করা না থাকলে করিয়ে নেয়া প্রায় বাধ্যতামূলক। যাকে রুটিন টেস্ট বলে। যেমন

সিবিসি ও ই এস আর
ইউরিন আর/ই
চেস্ট এক্সরে
রেনাল ফাংশন
লিভার ফাংশন
ইসিজি
রক্তের গ্রুপিং (যদি করা না থাকে)

বয়স ভেদে প্যাপস্মিয়ার , কোলনস্কপি, ম্যামোগ্রাম, পিএসএ ও রুটিন হয়ে যায়।

বয়স কম হলে ইসিজি ও রেনাল ফাংশন ও লিভার ফাংশন এখানে ডাক্তাররা দেন না।

বিদেশে কমপ্লিট টেস্ট রান করে তারা। কারন পয়সা দেয় ইনস্যুরেন্স কোম্পানী

কেন লিভার ও রেনাল ফাংশন দেখা হয়?

যাতে কোন ঔষধের কারনে এই অতিপ্রয়োজনীয় অংগগুলির কোন ক্ষতি না হয়। আপনার হয়তো জানা নাই রোফিকক্সিব ও কিটোরোল্যাক নামক ঔষধের উল্টাপাল্টা ব্যবহারে সারা দুনিয়ায় ও বাংলাদেশে কত লোকের হার্ট ও কিডনীর ক্ষতি হয়েছে।

৪. দয়া করে সচিব হয়েছেন বলে আপনি এটা ভাববেন না যে আপনি চিকিৎসাবিদ্যা বোঝেন। আপনার কাজ চিকিৎসাব্যবস্থার প্রশাসণিক বিষয় দেখা। চিকিৎসকদের বিদ্যা ও কাজসংক্রান্ত মন্তব্য করার আগে এ বিষয়ে যথাযথভাবে জেনে নেবেন।

৫. আপনার বাড়ীতেই একাধিক চিকিৎসক আছেন। আপনি তাদের কাছে জেনে নেবেন রুটিন টেস্ট কি দুটো নাকি দশটা?

৬. থাইল্যান্ডের জনসেবা (বামরুনগ্রাদ) ও সিংগাপুরের এলিজাবেথের পাহাড়ে ( মাউন্ট এলিজাবেথ) কয়টা টেস্ট দেয় রুটিন, সেটাও জানবেন।

৭. মাননীয় অর্থমন্ত্রী যে ইউকে গেছেন, সেখান থেকে ফিরে আসলে তার চিকিৎসা ফাইল দেখে নিশ্চিত হবেন যে সেখানে রুটিন পরীক্ষা কয়টা দেয়?

৮. আর আপনি নিজে গত ৫ বছরে যতো চিকিৎসা করিয়েছেন সে চিকিৎসাগুলি কোথায় করিয়েছেন ও কি কি পরীক্ষা করিয়েছেন সেটাও জনসমক্ষে প্রকাশ করবেন। এটা প্রকাশ করলে দেশের অগনিত চিকিৎসক জানতে পারবে যে আপনি রুটিন পরীক্ষা করিয়েছিলেন কিনা?

এটাকে বলে প্রেসক্রিপশন অডিট। প্রেসক্রিপশন অডিট সহ সঠিক হসপিটাল অডিট চালু করলে এসব নিয়ে অভিযোগ যা আছে সেটা দুর করা যাবে। যদি কোন ডাক্তার অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা দেন সেটাও বোঝা যাবে। আপনি চাইলে এই অডিট ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সহায়তা আমরা আপনাকে দেবো।

আপনাকে দেয়া প্রেসক্রিপশন অডিট করেই এটা শুরু করা যাক।

দয়া করে ডাক্তাররা দুটো পরীক্ষার জায়গায় দশটা পরীক্ষা দেয় এরকম ঢালাও মন্তব্য করার আগে নিশ্চিত হবেন কারন আপনি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা টিমের একজন প্রধান প্রশাসক। আপনি নিজে যদি এধরনের ঢালাও মন্তব্য করেন তাতে আপনি কেবল আপনার নিজের কর্মীদেরই হেয় করেন।

এই অনভিপ্রেত মন্তব্য দেশের চিকিৎসকদের যেমন হেয় করেছে তেমনি চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে আপনার নিজের জানার গভীরতা বিষয়েও আমাদের সন্দিহান করেছে।

আমরা এখনো বিশ্বাস করি যে আপনি এমন কথা বলেন নাই। যদি বলে থাকেন আপনার উচিত দুঃখপ্রকাশ করা। আপনার অবস্থানের একজন মানুষের কাছ থেকে ঢালাও অপমন্তব্য আমরা আশা করি না।

ধন্যবাদান্তে
বাংলাদেশের চিকিৎসকদের পক্ষে
এফডিএসআর”

Facebook Comments

Related Articles