দাদাদের মনঃক্ষুণ্ন করা চলবেনা—শ্যামল দত্তের এমন লেখা ভারতে আলোচিত

‘সম্পর্কে নতুন মোড়’ শিরোনামে একটি সংবাদ বিশ্লেষণ ‘দৈনিক ভোরের কাগজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় গত ২৪ জুলাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ফোনালাপ প্রসঙ্গে লেখা এই লেখাটি ভারতের জাতীয় দৈনিক ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকার রিপোর্টেও উঠে এসেছে। শ্যামল দত্ত লিখেছেন, “ঢাকায় দায়িত্বরত ভারতের হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস গত ৪ মাসে অ্যাপয়নমেন্ট চেয়েও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ পাননি বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে।” তবে ভারতীয় দ্যা ডন পত্রিকার খবর পড়ে মনে হয় সাক্ষাৎ না পাওয়ার এই খবর শ্যামল দত্তের লেখা থেকেই তারা জেনেছে। যদিও শ্যামল দত্তের লেখাটি পড়ে যে কারো মনে হতে পারে এটি একপাক্ষিক একটি লেখা, যেটা অনেক কষ্ট করে একটু নিরপেক্ষ সাজার চেষ্টা করেও ব্যর্থ।

শ্যামল দত্ত লিখেছেন,

“২০১৯ সালে বাংলাদেশের নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার পর থেকে ভারতীয় প্রকল্পগুলোর কার্যক্রম পিছিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে চীনের প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে উৎসাহ দেখা গেছে দৃষ্টিকটু পর্যায়ে। ভারতের উদ্বেগ সত্ত্বেও সীমান্তবর্তী সিলেট বিমানবন্দর সম্প্রসারণের প্রকল্প চীনা কোম্পানিকেই দেয়া হয়েছে। এমনকি ঢাকায় দায়িত্বরত ভারতের হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস গত ৪ মাসে অ্যাপয়নমেন্ট চেয়েও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ পাননি বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। করোনা মোকাবিলায় ভারত সরকার বিভিন্ন সামগ্রী দিলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে একটি ধন্যবাদ চিঠিও পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে চীনের একটি ডাক্তারের প্রতিনিধি দলকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য বিমানবন্দরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের উপস্থিতি ও বিদায় জানানোর সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সংবর্ধনা নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকে। এর মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের এই নতুন মেরুকরণ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ভিন্ন বিশ্লেষণ দাবি করছে। গত পহেলা জুলাই এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এই সাক্ষাতের খবর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো মিডিয়ায় প্রচার না করলেও খবরটি প্রচারের জন্য পাকিস্তান হাইকমিশনের বিশেষ প্রচেষ্টা ছিল লক্ষণীয়।”

শ্যামল দত্তের অভিযোগ গুলো বালকসুলভ। সুস্পষ্ট সোর্স উল্লেখ না করে নিজের মনের কথাগুলোই যেন কেউ বলে গেল৷ কোন বিশ্বাসযোগ্য মিডিয়ায় খবর প্রকাশ হয়েছে চারবারের অনুরোধ সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর দেখা পাননি ভারতের হাইকমিশনার? দ্যা হিন্দু পত্রিকা ভারত ও বাংলাদেশ উভয় কর্তৃপক্ষের কাছেই জানতে চেয়েও এর সত্যতা নিশ্চিত করতে পারলনা। বরং একটি সূত্র একবার দেখা না হওয়ার কথা তাদের জানিয়েছেন। তাহলে শ্যামল দত্তরা কেন সেধে শত্রু বানাতে যাচ্ছেন প্রতিবেশী দেশকে?

শ্যামল দত্ত লিখেছেন,

“প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দায়িত্বপালনরত উপদেষ্টাদের মধ্যে পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল উপদেষ্টার সংখ্যা বেড়েছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষাকারী উপদেষ্টারা গুরুত্ব হারিয়েছেন এবং দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার বলয়ে জোরালোভাবে উপস্থিত হয়েছে চীন। চীন-পাকিস্তান যৌথ প্রয়াসে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন সমীকরণ এনেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। যে কারণে বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। যদিও দুদেশ প্রকাশ্যে এখনো এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজি নয়।”

ইমরান খানের একটি ফোনালাপেই প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের একটি অংশকে পাকিস্তানপন্থী ট্যাগ দিয়ে দিলেন তিনি কৌশলে। তিনি স্পষ্ট করে তাদের নাম যদি বলে দিতেন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের সংখ্যা বা মুখ সেই প্রথম থেকেই প্রায় অপরিবর্তিত। তাহলে কিসের ভিত্তিতে তিনি এ ধরনের মিথ্যাচার করলেন? পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক এক ধরনের স্থগিতই আছে, কি কারণে আছে সেটা তিনি উল্লেখ করেছেন৷ একটি ফোনালাপের মাধ্যমেই সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যায় কিনা? তাহলে এত হাহাকার কেন এখনই? ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে সাউথ ব্লক এ ফোনালাপে খুশি কেননা শেখ হাসিনা কাশ্মীর প্রসঙ্গে কথা বলতে অনাগ্রহী। আমাদের দেশের শ্যামল দত্তরাই যেন এতে অখুশি। তাইতো তারা ‘সম্পর্কে নতুন মোড়’ দেখতে পান। ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে শত্রুতা নয়’ শেখ হাসিনার এই পররাষ্ট্রনীতি সেই শুরু থেকেই আওয়ামীলীগের সরকার সফলভাবে এখন পর্যন্ত প্রয়োগ করে আসছে। তাই আগ বাড়িয়ে কেন কলহ কামনা করে কলম চালাতে হবে?

দুইদেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন না খুজে তিনি বরং ভারতের সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানিচুক্তি এসব ব্যাপারে লিখে ভারতকে সতর্ক করতে পারতেন, তারা যেন বন্ধুকে অবহেলা না করে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত কেন নিশ্চুপ বা মিয়ানমারকে কেন দিল্লি অস্ত্র দিচ্ছে এসব লিখতে শ্যামল দত্ত ভুলে গেলেও নিজের দাসত্বের জানান দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ধন্যবাদ চিঠি না দেওয়ার কথা তিনি ভোলেন নাই। জাতীয় ক্রিকেট দলের পাকিস্তান সফরকেও শ্যামল দত্ত একটি বিশেষ লবির চেষ্টার ফল বলে উল্লেখ করেছেন৷ শ্যামল দত্তরা হয়ত চান দেশের সব কিছুই প্রতিবেশী দাদাকে জিজ্ঞেস করে করা হোক।

শ্যামল দত্তের লেখায় পরিষ্কার তিনি বাংলাদেশের একটি নতজানু পররাষ্ট্রনীতি না দেখায় কেবল আক্ষেপ করছেন। দেশটা ভু-রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হলেও তার আক্ষেপ নেই, দাদাদের মনঃক্ষুণ্ন করা চলবেনা।

লেখাঃ সাজ্জাদ আহমেদ।

Facebook Comments

Related Articles