ছবিটি একজন ভন্ড সাংবাদিক অথবা হালের মিডিয়ারই মুখোশ উন্মোচন করেছে

করোনাকালে অনেক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিরই মুখোশ খুলে গিয়েছে। কারা জনগণের প্রকৃত সেবক অথবা কারা প্রকৃত ভিলেন সেটা করোনাই যেন দেখিয়ে যাচ্ছে। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে শুরু করে, চালচোর জনপ্রতিনিধি বা প্রতারক সাহেদদের স্বরুপ উন্মোচন করেছে করোনা। দেশের গণমাধ্যমের চেহারার মুখোশও খসে গেছে এই করোনাকালে। এতকাল তারা জনগণের কাছে ভিলেন বানিয়েছে ডাক্তার আর পুলিশকে। করোনা মোকাবিলার ফ্রন্টলাইন যোদ্ধারাই যে জনগণের প্রকৃত সেবক এটা মানুষ উপলব্ধি করতে পেরেছে।

একজন সিনিয়র পুলিশ সদস্যের মাস্ক না পরার ফটোস্টোরি প্রথম সারির একটি পত্রিকা ছেপেছে। তারা লিখেছে পুলিশ সদস্য নাকি অন্যদের ঝুকিতে ফেলছেন! রংপুর শহরের মত উষ্ণ অঞ্চলে টানা ছয় সাত ঘন্টা ডিউটি করে যে পুলিশ সদস্য —তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ জনগণ মানতে পারেনি। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। জনগণের কাছে এই পত্রিকা বা ফটো সাংবাদিকই উল্টো ধিক্কার পাচ্ছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক থেকে কিছু পাবলিক কমেন্ট দেখে নেওয়া যাক।

“…অথচ এই পুলিশ ই করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সবচাইতে বেশি কন্ট্রিবিউট করেছে। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে তার হাতে সুরক্ষা সামগ্রী আছে। হয়তো ক্লান্তি আসার কারনে সাময়িক ২/৪ মিনিটের জন্যে মাস্ক টা খুলছে উনি.. ওত পেতে থাকা সাংবাদিক সাথে সাথে ছবি টা তুলে নিউজ করলো।

সাংবাদিক সাহেদের টক শো বানায় আর আসল বোয়ালের কাছ থেকে কেঁচো খায়৷ তারা কিচ্ছু জানে না, বোঝেও না। সংবাদিকের এমন সংবাদ এপ্রুভ হলো কেমনে ?? শুধু কি সংবাদিকের দোষ??

ভাই নরমাল একটা জায়গায় মাস্ক পরে ঘন্টা খানেক থাকলে দম বন্ধ হয়ে আসে।আর সেখানে যারা জীবন বাজি রেখে ডিউটিরত আছেন,হয়তো খানিক সময়ের জন্য খুলেছেন মাস্ক, তাদের নিয়ে এসব নিউজ না করলেই কি নয়? তাও রংপুরের মতো একটা উষ্ণ এলাকায়!!!

এই ফটো সাংবাদিকের নাম আদর রহমান। তিনি তার তোলা ছবি ছাপা হওয়ার পর আবার সেটি ফেসবুকে শেয়ার করেছে৷ ক্যাপশনে তিনি বলছেন পুলিশ সদস্যটি নাকি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাননি। সাংবাদিক রহমানের ফেসবুক প্রোফাইল একটু ঘাটলেই দেখা যায় তিনি আদতে একজন ‘ভন্ড’। এই করোনাকালেই, কিছুদিন পূর্বে তিনি বন্ধুর মেয়ের বিয়ের ছবিও শেয়ার করেছেন। পাঠক সেই পোস্ট দেখে নিজেই বুঝতে পারবেন সাংবাদিক আদর রহমান কতটা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল৷

সাহেদদের বহুকালের প্রতারণার চেহারা উন্মোচনের পাশাপাশি সাহেদকে শক্তিশালী কারা করেছে সেটাও আমরা দেখেছি। আমরা জানতে পেরেছি টকশোতে উপঢৌকনের বিনিময়ে কিভাবে যাওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে আজ অনেক সত্য আমজনতাই উন্মোচন করেছে। এতকাল চিকিৎসকদের ভিলেন বানিয়েছিল মিডিয়া, এখন জনতা দেখতে পাচ্ছে আদতে তারা অস্ত্রহীন যোদ্ধা। স্বাস্থ্যখাতের বাস্তব চিত্র তুলে না ধরে এক শ্রেনীর পেশাজীবীদের ওপর দায় চাপানোর ফল আজ হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে।

সরকারের ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান বা সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্যখাতে অভিযানের পর সবার মনে একটা প্রশ্নই আসছে এতদিন কেন এসব কোন মিডিয়ার নজরে আসল না। প্রধানমন্ত্রী নিজেও এই প্রশ্নটা রেখেছেন।

দেশের অধিকাংশ টিভি চ্যানেল এখন ২৪ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেল। তাছাড়া অবশিষ্ট প্রতিটি চ্যানেলই ঘণ্টায় ঘণ্টায় খবর দেখায়৷ প্রতিটা নিউজ চ্যানেলই একেকটা বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত। দেশে একটা স্পোর্টস চ্যানেল বা ডেডিকেটেড মুভি চ্যানেল নেই। দেশের মানুষ বিদেশের চ্যানেলমুখী; তারপরেও কেন ডজনে ডজনে নিউজ চ্যানেল? পাঠক না থাকলেও কেন বের হচ্ছে খবরের কাগজ?

এসব গণমাধ্যম মালিকের যথেষ্ট টাকা আছে, তারা চাইলে মানসম্মত বিনোদনমূলক টিভি চ্যানেল করতে পারত৷ কিন্তু দর্শকের চাহিদার কোন মূল্য তাদের কাছে নেই। তাদের লক্ষ্য ক্ষমতার চর্চা আর নিজের ব্যবসার সুরক্ষা। কিছু সাংবাদিক পুষে নিজেদের মনমত খবর প্রচার করে, টকশো করিয়ে সরকারকে চাপে রাখার একটা প্রচেষ্টা ছাড়া এসব মিডিয়ার আর কোন উদ্দেশ্য খুঁজে পাইনা। মানের ব্যাপারে কোন চিন্তাই তারা করেনা।

এসব গণমাধ্যমে কতজন কাজ করেন যারা সাংবাদিতার ইথিক্স পড়েছেন? গণমাধ্যমের আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের বেতন দেওয়া হয় নাকি ‘সিস্টেম’ করে চলতে বলে হয় এসব অনেকটাই ওপেন সিক্রেট।

সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার থেকেও সংবাদ মাধ্যমের সততা আজ বড় দাবী। একটি সমাজের বা রাষ্ট্রের দর্পণ হিসেবে বিবেচিত গণমাধ্যম কি উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি করছে কিনা তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। একটি জাতির জন্য সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ বলা হয় গণমাধ্যমকে। গণমাধ্যম বা সাংবাদিকদের নিয়ে আজ যে বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলা আমাদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করতে সাংবাদিকদেরই এগিয়ে আসতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি এখনো অনেক সাংবাদিক আছেন যারা সততার সাথে কাজ করেন। তারাই গণমাধ্যমের মান রক্ষায় এগিয়ে আসবেন বলে বিশ্বাস করি।

লেখকঃ সাজ্জাদ আহমেদ।

Facebook Comments

Related Articles