জাদু দেখাতে গিয়ে যুবতীর প্রাণ কেড়ে নিলেন পি সি সরকার? যুক্তরাজ্য জুড়ে চাঞ্চল্য

অধ্যাবসায় আর নিষ্ঠার নাম জাদুসম্রাট পি. সি. সরকার। যা সারা বিশ্বের কাছে সুপরিচিত। এই জাদু মহারাজকে ইজিপ্টে দেখলে কেউ বিস্মিত হতেন না। আশ্চর্য হতেন না কেউ অস্ট্রেলিয়ায় দেখলে। কখন যে কোন দেশে উড়ে যেতেন তা বলা খুব কঠিন ছিল। পি. সি. সরকার জাদুবিদ্যায় কল্পনা, উদ্ভাবনীর ক্ষমতা, প্রদর্শনভঙ্গি, পরিবেশনের মুর্ছনা, জাঁক-জমকপূর্ণ পোশাক, থিয়েটারের কায়দায় দৃশ্যপট, স্বদেশি কায়দায় বাজনা-সহ অভিনয়ে দক্ষ সুন্দর-সুন্দরী সহকারী-সহকারিনীর সঙ্গে আল্ট্রাভায়োলেট আলোর ব্যবহার করতেন। তিনিই প্রথম এসবের প্রবর্তক।

ভারতীয় ভাবধারায় সর্বোপরি মহারাজার চোখ ধাঁধানো পোশাক, ঘড়ি ধরা সময়ানুবর্তিতা সবমিলিয়ে পি. সি. সরকার আর জাদুবিদ্যা সমার্থক হয়ে গেছে। তিনি ছিলেন শিল্পীর শিল্পী। তাঁর খেলার বিন্যাসে সম্পূর্ণ ভারতীয় মেজাজের রুচিশীল চিন্তা-ভাবনা প্রমাণ করে পি. সি. সরকার নিজেই একটা জাদুবিদ্যার বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁর কাছ থেকে সারা বিশ্ব অনেক কিছুই পেয়েছে। অবহেলিত এক কৃষ্টির অগ্রদূতকে চিনল পৃথিবীর মানুষ। জাদুসম্রাট পি. সি.সরকারের ছিল ব্যক্তিত্বপূর্ণ, সৌম্য, শান্ত চেহারা, অতিসুন্দর বাচনভঙ্গি, আর মানুষ হিসাবে ছিলেন অত্যন্ত সহজ, সরল আর অনাড়ম্বর। সারা বিশ্ব ঘুরেছেন, তাতে মনের পরিধি বেড়েছে। নানা ধরণের মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছেন এবং নানা রকম অভিজ্ঞতার সঞ্চয় করেছেন। তিনি সফল হতে পেরেছিলেন। নিত্যনতুন ইন্দ্রজালের মায়াস্পর্শে তিনি ছিলেন চিরমুখর। জাদু কথাটাকে তিনি প্রবাদে পরিণত করেছিলেন।

পি. সি.সরকারের সাম্রাজ্য ছিল সারা পৃথিবী। তিনি মনে প্রাণে ছিলেন খাঁটি বাঙালি। সারা পৃথিবীর পুজোই তাঁর প্রাপ্য। জাদুবিদ্যার মহারাজা পি. সি.সরকারের কাছে কোনো দেশই বিদেশ ছিল না। জীবদ্দশাতেই তিনি প্রমাণ করেছেন কিংবদন্তি তিনি। তিনি প্রমাণ করে দেখিয়েছেন ভারতের জাদুবিদ্যা সারা বিশ্বের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।

পি. সি.সরকারের আসল নাম প্রতুল চন্দ্র সরকার। জন্ম অবিভক্ত বাংলার টাঙ্গাইল জেলার আশোকপুর গ্রামে, ১৯১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। গ্রামে মাদারিদের জাদু দেখে প্রথম আকর্ষিত হন ম্যাজিকে। তবে প্রথম ম্যাজিক দীক্ষাগুরু ছিলেন তাঁর এক মামা, দীনেশ চন্দ্র নন্দী। নিজের মামা না হলেও তিনি খুব ভালবাসতেন ভাগ্নেকে। তাস, রুমাল, কয়েন ইত্যাদি দিয়ে খুব ভাল ক্লোজ-আপ ম্যাজিক দেখাতেন তিনি। ভাগ্নের বায়নার জেরে কিছু খেলা বানিয়েও দিয়েছিলেন তাঁকে। তবে এখানেই শেষ নয়। তারপর বিস্তর পড়াশোনা, নিজের গবেষণা এবং বুদ্ধিমত্তার জোরেই পৃথিবীর জাদুকরদের শ্রেষ্ঠ আসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন পি. সি. সরকার। তাঁর জীবনের অনেক ঘটনাই অবাক করে। পরিচয় দেয় তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের। তেমনই একটি ঘটনা বলি…

১৯৫৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ব্রিটেনে গেছেন ম্যাজিক দেখাতে। বিবিসি (ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন) লন্ডন থেকে ১৫ মিনিট অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পেলেন। এর আগে কোনোদিন বিবিসিতে তিনি খেলা দেখাননি। বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে তরুণীকে দ্বিখণ্ডিত করার খেলাটা দেখাবেন বলে ঠিক করলেন। তার জন্য প্রথমে তিনি রিহার্সাল দিয়ে নিলেন যাতে ১৫ মিনিটের মধ্যেই খেলাটা শেষ করতে পারেন। লাইভ টেলিকাস্ট। ভুল হয়ে গেলেই বিপদ। শুধরানোর কোনো উপায় নেই। ভুল মানে ভুল। অর্থাৎ ক্যামেরার সামনে সঠিক সময়সীমার মধ্যে তরুণীটিকে কাটা এবং জোড়া দেওয়া শেষ করতে হবে। তারিখটা ছিল ৯ এপ্রিল, ১৯৫৬। বিবিসির লাইম গ্রোভ স্টুডিয়োয় ক্যামেরাম্যান-ডিরেক্টর কয়েকবার সময়-বিষয়গুলি দেখে নিলেন। তারপর শুরু হয়ে গেল টেলিকাস্ট। খেলাটা ধীরে ধীরে দেখাতে লাগলেন তিনি। তরুণীকে কাটা হয়ে গেল বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে। জোড়া লাগানোর সময় জাদুকরের আন্তরিক চেষ্টাতেও তরুণী বেঁচে উঠলেন না। তখন প্রচণ্ড উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হল। জাদুসম্রাট পি. সি. সরকারের নাটকীয়তা এবং পরিবেশন যেন জন্মগত প্রতিভা। তিনি তার চোখে-মুখে এমন হাব-ভাব ফোটালেন যেন বিরাট দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। তরুণী আর প্রাণ ফিরে পেল না। সময় শেষ। এবার নতুন টেলিকাস্ট শুরু হয়ে গেল।

অনুষ্ঠানের প্রযোজক ভীষণ চটে গেলেন জাদুসম্রাটের ওপর। জাদুসম্রাটও এমন ভাব দেখালেন যেন খুবই অপরাধ করে ফেলেছেন। কিছুক্ষণ বাদে আসল নাটক শুরু হল গোটা লন্ডন শহর এবং শহরতলি জুড়ে। এক পাকা জাদু শিল্পী খেলা দেখাতে গিয়ে প্রাণ কেড়ে নিলেন সহকারিণীর! হুমড়ি খেয়ে পড়লেন সাংবাদিকরা ব্রডকাস্টিং সেন্টারে। জনগণের ঘনঘন টেলিফোন। সংবাদপত্রের অফিসে ফোন এল এত বেশি যে লন্ডন শহরে দু’ঘণ্টার জন্য টেলিফোন লাইন অচল হয়ে গিয়েছিল। পরের দিন ১৯৫৬ সালে ১০ এপ্রিল তারিখে লন্ডনের সমস্ত খবরের কাগজে বড় বড় করে প্রথম পাতায় বেরোল ‘চিন্তা করবেন না মেয়েটা সুস্থ আছে। পুরোটাই জাদুসম্রাট পি. সি.সরকারের জাদুর চালাকি।’ জাদুর ইতিহাসে এমন প্রচণ্ডরকমের প্রচার করতে এর আগে কেউ কখনও পারেনি।

কোনো দেশে ঘুরে বেড়াতে গেলে, সেখানের মানুষের সঙ্গে কথোপকথনে ও খেলা দেখানোয় আগ্রহ তৈরি করতে গেলে সেখানকার ভাষা, সংস্কৃতি, আচার ব্যবহার জানতে হবে। বিদেশে যাওয়ার আগে সেখানকার সমস্ত আদব-কায়দা রপ্ত করে নিতেন তিনি। তারপর দলবল নিয়ে দেখাতে যেতেন জাদুর খেলা। মনোবিজ্ঞানীর মতো খুঁজে বার করতেন সে দেশের মানুষের হাসির খোরাক, পছন্দের বিষয় প্রভৃতি। তাই কোনো দেশে যাওয়ার আগে পি. সি. সরকারকে নিজের বাড়িতে দেখা যেত একান্তে সে দেশের ভাষা নিয়ে চর্চা করতে। ম্যাজিশিয়ান পি. সি.সরকারের কথা সকলেই জানেন। কিন্তু পাঠক পি. সি.সরকারের কথা ক’জন জানেন? ট্রাম-বাস-গাড়ি-ঘোড়ার আওয়াজ যখন থেমে যেত, পাড়া-প্রতিবেশীরা যখন গভীর ঘুমে আছন্ন হয়ে যেতেন, তিনি তখন তাঁর লাইব্রেরিতে বসে পড়াশোনা করতেন রাতের বেলায়।

ম্যাজিক ছাড়া জাদুসম্রাটের জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার গল্প একটু জানাই। রাত্রে জাদু প্রদর্শন হবে তাই সকালে কিছু টুক-টাক কাজ সেরে নিচ্ছেন। তারমধ্যে খাম, পোস্টকার্ড, স্ট্যাম্প ইত্যাদি কিনতে হবে। তাই পোস্টঅফিসটা কোথায় জানার জন্য একজনকে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি দেখিয়ে দিলেন। জাদু সম্রাট বললেন, ‘ধন্যবাদ’। ভদ্রলোক সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। রাস্তা ছাড়লেন না। অগত্যা একটা পঞ্চাশ ফ্র্যাঙ্কের মুদ্রা তাঁর হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘ধন্য তুমি প্যারিস।’

আরও এক মজার ঘটনা পি. সি. সরকার নিজেই বলেছিলেন। “প্যারিসে বাগানে, পার্কে বেঞ্চ সারি সারি করে সাজানো। যেমন কলকাতায় ঢাকুরিয়া লেকে, পার্কে, গঙ্গার ধারে আমরা দেখতে পাই। আমি দেখলাম অসংখ্য খালি চেয়ার পড়ে রয়েছে। এমনই একটা খালি চেয়ারে বসে আপন মনে ডাইরির পাতায় কয়েকটা জিনিস নোট করে রাখতে আরম্ভ করেছি। হেন কালে হায়, যমদূতপ্রায়, কোথা থেকে এক ফরাসি মহিলা খাতাপত্র ব্যাগ হাতে নিয়ে আবির্ভূত হলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি একটা ১০ ফ্র্যাঙ্কের একটি টিকিট কেটে হাতে ধরিয়ে দিলেন। অর্থাৎ ওই চেয়ারে বসার দক্ষিণা দিতে হল। একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। সব জায়গা স্যাঁতস্যাঁতে ভেজা। আমি অপ্রস্তুত হয়ে যখন মানিব্যাগটা বার করে দশ ফ্র্যাঙ্ক দিতে গেছি, ওই ফরাসি মহিলা আরও একটা দশ ফ্র্যাঙ্কের টিকিট কেটে বসে আছেন। কারণ আমি আমার মানিব্যাগটা বের করার সময় আমার হ্যান্ডব্যাগটা স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে না রেখে আরেকটা চেয়ারে রেখেছি। মানে আরও একটা জায়গা দখল করেছি। কাজেই বাধ্য হয়ে নগদ বিশ ফ্র্যাঙ্কের আক্কেল সেলামি দিতে হল। তাই এখনও থেকে খালি চেয়ার দেখলেও বিনা প্রয়োজনে বসতে চাই না।”

২৩ ফ্রেব্রুয়ারি তাঁর জন্মদিন বিশ্বজুড়ে পালিত হয় জাদুকর দিবস হিসাবে। স্বদেশ ও বিদেশে হাজার হাজার পুরস্কার তিনি স্বমহিমায় অর্জন করেছিলেন। ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ দিয়ে সম্মান জানিয়েছিল। প্রকাশ করেছিল তাঁর ছবি সহযোগে ডাকটিকিটও। তাঁর বাড়ি ‘ইন্দ্রজাল ভবন’টি ঐতিহ্যবাহী বাড়ি বা হেরিটেজ বিল্ডিংয়ের আখ্যা দেয় সরকার। তাঁর নামে ‘জাদুসম্রাট পি. সি. সরকার সরণি’-র নামকরণ করে কলকাতা পৌরসভা। তাঁর সুযোগ্য পুত্র পি. সি. সরকার জুনিয়রও তাঁর বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন জাদুসম্রাট পি. সি. সরকার বিদ্যানিকেতন এবং জাদুসম্রাট পি. সি. সরকার ময়দানের। পি. সি. সরকার জুনিয়র বাবার স্মৃতিচারণায় একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন। সেই তথ্যচিত্রের নাম ‘এ ট্রিবিউট টু পি. সি. সরকার’। নাতনী মানেকা সরকারও তৈরি করেছেন তাঁকে নিয়ে ডকুমেন্ট্রি ফিচার ফিল্ম।

বহু বছর পূর্বে জাদুসম্রাট পি. সি. সরকার যখন তাঁর তিন পুত্রের নামেরই আদিতে ‘পিসি’ দিয়ে রাখেন তখন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ‘দ্য স্ফিংস’ পত্রিকার সম্পাদক মি. জন ম্যুলহল্যান্ড বলেন, ‘জাদুসম্রাট, তাঁর তিন পুত্রের নামই পি. সি. সরকার রেখেছেন। তার কারণ ভবিষ্যতে তিনি আরও পি. সি. সরকার রেখে যেতে চান। তাঁর পুত্রদের মধ্যে অন্ততঃপক্ষে একজন জাদুকর হবেন। সেই হিসাবে তিন জনেরই নাম রেখেছেন পি. সি. সরকার।

সেদিন মি. জন ম্যুলহল্যান্ড যে কথা প্রকাশ করেছিলেন তার বাস্তব রুপায়ন আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি। জাদুসম্রাট পি. সি.সরকারের মধ্যমপুত্র জাদুকর প্রদীপচন্দ্র সরকার, সেই পূর্ব পরিকল্পিত পি. সি. সরকার জুনিয়রের স্থান নিয়েছেন। বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জাদুকরের প্রতিনিধিত্ব করবার পূর্ণ দায়িত্ব নিতে সক্ষম হয়েছেন। বাপ কা বেটা, এঁকেই বলে।

জাদু ও জীবন, শিল্প ও বিজ্ঞান, গণিত ও কবিতা, মিথ ও মনস্তত্ত্ব— যা মানবিক তার কোনো কিছুই তাঁর কাছে অনাত্মীয় নয়— শ্রী পি. সি. সরকার (জুনিয়র)-এর জীবনধারা ও শিল্পচর্চা সম্পর্কে এ কথা প্রথম দর্শনেই বলা চলবে। বিচিত্র ও বিবিধ বিষয়ে, তাঁর আগ্রহ, অন্বেষা ও অনুশীলন— এবং সাফল্যও। এক মহামান্য ব্যক্তির ভাষায় “Jack of all trades and master of all.” জুনিয়র পি. সি. সরকার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট জয় করে এনেছেন সারা বিশ্ব থেকেই।

অনুলিখন – শুভজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

Facebook Comments

Related Articles

Close