করোনায় আড়ালে ভাঙাচোরা ক্রিকেট কালচার

বৃহস্পতিবার,৩০ জুলাই,২০২০

সমগ্র বিশ্বের মত কোভিড-১৯ এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটেও। সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হওয়ায় এর সাথে জড়িত খেলোয়াড়ের সংখ্যাও স্বাভাবিকভাবে বেশি।করোনায় ক্রিকেট আটকে থাকায় আটকে আছে মাঠের খেলা।কিন্তু ক্রিকেট কি শুধু মাঠেরই খেলা?

যারা ক্রিকেট আঙিনা সম্পর্কে একটু খোঁজ খবর রাখেন,এদেশে লোকাল ক্রিকেটারদের ইনকামের
সোর্স ঢাকা প্রিমিয়ার লীগ,যেটা ওয়ানডে ফরম্যাটে হয়।এছাড়া ফার্স্ট,সেকেন্ড,থার্ড ডিভিশন ক্রিকেট তো আছেই,যেখানে ইনকামের চেয়ে জুনিয়র খেলোয়াড়দের প্রমাণের মঞ্চ বেশি।এছাড়া বিভাগ অনুসারে আয়োজিত প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট(চারদিনের) জাতীয় লীগ বন্ধ(এমনিতেও উইকেটের মান আর খেলার গুরুত্ব বিবেচনায় সেটা পিকনিক লীগ নামেই পরিচিত)।
করোনায় বন্ধ হয়ে থাকার ফলে খেলোয়াড়েরা কি শুধু আর্থিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন?
মাঠের খেলার বাইরেও একটা খেলা আছে,যেটা খেলতে হয় নিজের সাথে।তা হল ফিটনেস ধরে রাখা আর স্কিল ট্রেনিং।বিশেষ করে ফিটনেসে বড় ধরনের ঘাটতি পড়লে একজন খেলোয়াড় মাঠে নিয়মিত পারফর্ম করতে পারবেন না কখনোই।এখন বলতে পারেন,ফিটনেস তো নিজের হাতে,এতে ক্রিকেট কালচারের কি!
ক’দিন আগে একাত্তর টিভির খেলাযোগে সাংবাদিক দেব চৌধুরীর একটি রিপোর্ট দেখলাম,যা লকডাউনে বাড়ি বসে আমার সাময়িক বিস্মৃত হওয়া ভাবনাটাকে আবার নাড়িয়ে দিল।”বেন স্টোকস” আর “সাইফুদ্দিন”।দু’জনই পেস বোলিং অলরাউন্ডার।ব্যাটিংয়ে পর্যাপ্ত সুযোগ না পেলেও প্রথম দু বছরে বোলিংয়ে সাইফুদ্দিনের পারফরমেন্সের গ্রাফ বিশ্বের অন্যতম সেরা বেন স্টোকস এর পারফরমেন্সের তুলনায় অনেক উপরে।কিন্তু সাইফুদ্দিন বেন স্টোকস হতে পারবেন কী করে?জাতীয় দলে নিয়মিত এক তরুণ সদস্য নিজের এলাকা ফেনীর মাঠে গিয়ে জল-কাদা সহ যেই বেহাল দশা দেখলেন,তা দেখলে যে কোন বোধসম্পন্ন লোকই লজ্জা পাবেন!(লজ্জা পান না কেবল দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কর্তারা)।
ক্রিকেট এমনই একটি খেলা,যেখানে ফিটনেস আর স্কিল ধরে রাখতে হলে পর্যাপ্ত জিম ফ্যাসিলিটিস,ইনডোর,ভাল মানের প্রাকটিস উইকেট থাকা বাধ্যতামূলক।কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান(বিকেএসপি) আর কয়েকটি বড় ক্লাব বাদে ঢাকার বাইরে দেশের কোথাও ই এগুলো ন্যূনতম মানের ধারেকাছেও নেই।বাংলাদেশ জাতীয় দলে সবচেয়ে বেশি ক্রিকেটার সরবরাহ করা খুলনা বিভাগের অন্যান্য জেলা বাদ দিন।খোদ বিভাগীয় খুলনা শহরে প্রফেশনাল ক্রিকেটারদের জন্য না আছে ভাল মানের উইকেট,না আছে সুযোগ-সুবিধা।এরপরও খেলাটির প্রতি ভালোবাসা থেকেই এত বেশি তরুণ ক্রিকেটের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

বিসিবি জাতীয় দলের চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটারদের জন্য রোটেশন করে প্রাকটিসের ব্যবস্থা করলেও তারা ক’জন!এই ২০-৩০ জনেই কি সীমাবদ্ধ সারা দেশের ক্রিকেট!ক’জন ক্রিকেটারের সামর্থ্য আছে বাড়িতে ফিটনেস ধরে রাখার উপকরণ কিনে রাখার!করোনা দূরে রাখি,নরমাল সময়ও ঢাকায় বসেই অনেকে পর্যাপ্ত সুবিধা পান না। ফলাফল কিন্তু দেখতেই পাচ্ছেন।আজ মাশরাফি মাহমুদুল্লাহ তামিমরা দু’দিন ভাল খেলেনা বলে দল হারে,তা কিন্তু না।আপনি বিদেশ থেকে কোটি থাকা খরচ করে জাতীয় দল আর অনুর্ধ্ব-১৯ দলের জন্য কোচিং স্টাফ আনবেন।আর দেশের জেলায় জেলায় দূরে থাক,বিভাগীয় শহরগুলোয় পর্যন্ত বেসিক ক্রিকেট সরঞ্জামাদি ও ফ্যাসিলিটিস দিবেন না;তাহলে ব্যাপার কী দাঁড়াল।গাছের গোঁড়া পঁচে আগাছা জন্মাতে দিয়ে আপনি আগায় পানি ঢালছেন!যার জন্য বিকেএসপির বাইরে দেশের বিভিন্ন আনাচ-কানাচ থেকে সহজাত প্রতিভাগুলোকে যেমন আপনি বিকশিত হতে সাহায্য করছেন না,তেমনি নতুন খেলোয়াড় উঠে না আসায় জাতীয় দলের নিয়মিত সদস্যদের উপরও যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করতে পারছেন না। কারণ যে পরিবেশ থেকে সংগ্রাম করে তারা উঠে এসেছেন,ভাল করেই জানেন,তাদের চ্যালেঞ্জ জানানোর মত খুব বেশি খেলোয়াড় পাইপলাইনে নেই।ফলে প্রভাব পড়ছে জাতীয় দলের পারফরমেন্সে।এই ভগ্নগ্রস্ত ক্রিকেট কালচারের মাঝে নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার আর দু-একটা বড় জয়ে আমরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলি।আর বিপদে পড়লে বন্ধু জিম্বাবুয়ে তো আছেই পারফরমেন্সের উন্নতি ঘটাতে।
আজ করোনাকালে তো জাতীত দলের তরুণ খেলোয়াড় সাইফুদ্দিনরাই যখন প্রাকটিসের জন্য একটা ভাল মাঠ পান না।ভাবুন,দেশের শত শত স্বপ্নবাজ ক্রিকেটারদের কি অবস্থা!টেস্ট মর্যাদা পাবার বিশ বছর পরও খালি বাইরে চকচকে মলাট লাগিয়ে অন্তর্ভাগ খুব বেশি না বদলানো ক্রিকেট কালচারের বলি হবে হচ্ছে দেশের ক্রিকেট!অবশ্য এ যাত্রায় বিসিবি কর্তারা করোনার উপর দায় চাপিয়েই বেঁচে যাবেন।কিন্তু বাঁচবে কি দেশের ক্রিকেট?করোনাযুদ্ধ শেষে আপন ছন্দে ফিরতে পারবে তো দেশের ক্রিকেট?উত্তরটা সময়ই বলে দেবে…

আপন সৌরভ
নিজস্ব প্রতিবেদক

আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন::
লাইক দিন: https://www.facebook.com/eisomoy365/ (‘এই সময়’ ফেসবুক পেইজ)
সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে: https://youtu.be/ZBMTaqUNbh4

Facebook Comments

Related Articles

Close