নিহত সাবেক মেজর সিনহা,দাফন সম্পন্ন আজ বিকেলে

সোমবার,৩ আগস্ট,২০২০

কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত একজন মেজর নিহত হয়েছেন। শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার বাহারছড়ায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর পুলিশ তল্লাশি চেকপোস্টে এই ঘটনা ঘটে। অবসরপ্রাপ্ত ওই সেনা কর্মকর্তা সেনাবাহিনীর টিশার্ট–ট্রাউজার পরিহিত ছিলেন।

নিহত অবসরপ্রাপ্ত ওই সেনা কর্মকর্তার নাম সিনহা রাশেদ খান।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন জানিয়েছেন, ওই সাবেক সেনা কর্মকর্তা তাঁর ব্যক্তিগত গাড়িতে করে অপর একজন সঙ্গীসহ টেকনাফ থেকে কক্সবাজার আসছিলেন।শামলাপুরের লোকজন ওই গাড়ির আরোহীদের ডাকাত সন্দেহ করে পুলিশকে খবর দেন। এই সময়ে মেরিন ড্রাইভ সড়কের বাহারছড়া তল্লাশি চেকপোস্টে গাড়িটি থামানোর চেষ্টা করে পুলিশ। কিন্তু গাড়ির আরোহী একজন তাঁর পিস্তল বের করে পুলিশকে গুলি করার চেষ্টা করেন। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালায়। এতে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা রাশেদ গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন।

তাঁকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন।কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) শাহীন আব্দুর রহমান
এর বক্তব্য অনুযায়ী হাসপাতালে আনার আগেই অবসরপ্রাপ্ত ওই সেনা কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছে।গত শনিবার সকালে নিহতের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালে তার মৃতদেহ

এসপি জানান, এই ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। দুজনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ অবসরপ্রাপ্ত ওই সেনা কর্মকর্তার পিস্তলটি জব্দ করেছে। এ ছাড়া গাড়িতে তল্লাশি করে ৫০টি ইয়াবা বড়ি, কিছু গাজা এবং দুটি বিদেশি মদের বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। এসপি আরও বলেন, অনুসন্ধানে জানা গেছে, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা রাশেদ একটি তথ্যচিত্র ধারণের কাজে আরও চারজন সঙ্গীসহ গত এক মাস ধরে হিমছড়ির একটি রেস্টহাউসে অবস্থান করছিলেন।

এ ঘটনায় তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।গত শনিবার সন্ধ্যায় এই কমিটি গঠন করা হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক নির্দেশনায় বলা হয়, তিন সদস্যের কমিটির আহ্বায়ক কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহা. শাজাহান আলী। অন্য দুই সদস্য হলেন কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও কক্সবাজারের এরিয়া কমান্ডারের একজন প্রতিনিধি। কমিটিতে আগামী সাত কর্মদিবসের ভেতরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, কমিটি ঘটনার বিষয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে ঘটনার কারণ, উৎস অনুসন্ধান করবেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে মতামত দেবেন।

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর গত শনিবার বিকালে মেরিন ড্রাইভ রোডের বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ি এলাকার ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর একটি তদন্ত দল ঘটনা তদন্তে যায়। এসময় এলাকার লোকজন সেনাবাহিনীর তদন্ত দলটিকে দেখে এগিয়ে আসেন। স্থানীয়দের কাছে তদন্ত দলের কর্মকর্তারা গত শুক্রবার রাতের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের ব্ক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র ফুটে ওঠে।

তদন্তের সময় উপস্থিত একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, স্থানীয় একটি হেফজখানার ইমাম, মুয়াজ্জিন ও দুজন হাফেজ সেনা কর্মকর্তাদের কাছে বলেছেন, শুক্রবার রাতে প্রাইভেট কার থেকে যে ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেছে সেটা ছিল একটি নির্মম ঘটনা। তারা জানান, প্রাইভেট কারের ওই আরোহী (মেজর সিনহা) ফাঁড়ির পুলিশ ইন্সপেক্টর লিয়াকতের নির্দেশমতে ওপরে দুই হাত তুলে বলেন, ‘বাবা আপনারা অহেতুক আমাকে নিয়ে উত্তেজিত হবেন না। আপনারা আমাকে নিয়ে একটু খোঁজ নিন।’

সাক্ষীরা বলেন, মেজর সিনহা এমন কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই ‘কুত্তার বাচ্চা’ বলেই তাঁর (মেজর সিনহা) বুকে গুলি চালান পুলিশ ইন্সপেক্টর লিয়াকত হোসেন। তৎক্ষণাৎ তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

স্থানীয় শামলাপুর বাজারের আবদুল হামিদ নামের একজন ফেরিওয়ালা সেনা দলের কর্মকর্তাদের বলেছেন, এটা সাংঘাতিক অন্যায় কাজ হয়েছে। আমাকে যেখানেই নিয়ে যান আমি সত্য কথা বলব। পুলিশ ক্রস ফায়ারের মতো করে একজন জ্যান্ত মানুষকে হত্যা করেছে। তিনি বলেন, গাড়ি থেকে নামার পর পরই পুলিশ ইন্সপেক্টর গাড়ির আরোহীকে (মেজর সিনহা) বুকে গুলি চালিয়ে দেয়।

পুলিশের গুলিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা রাশেদ খান নিহতের ঘটনার তদন্তে গঠিত কমিটি কাল মঙ্গলবার থেকে তদন্তকাজ শুরু করবে।

ওই ঘটনার পর প্রথমে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহা. শাহজাহান আলিকে প্রধান করে তিন সদস্যদের কমিটি গঠন করা হলেও পরবর্তী সময়ে তা পুনর্গঠন করা হয়েছে। ২ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক পুনর্গঠন করা কমিটিতে প্রধান করা হয়েছে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে। পুনর্গঠিত কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ।

কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের একজন প্রতিনিধি, রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও কক্সবাজারের এরিয়া কমান্ডারের একজন প্রতিনিধি, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির একজন প্রতিনিধি, কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের একজন প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। কমিটিকে সরেজমিনে তদন্ত করে ঘটনার কারণ, উৎস অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, তার করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট মতামত দিতে বলা হয়েছে।

এই ঘটনার পর ২ আগস্ট কক্সবাজারে আসেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক ও অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. জাকির হোসেন। আজ সোমবার বিকেলে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে টেকনাফ পরিদর্শন করেন ডিআইজি। কিন্তু ঘটনার বিষয়ে পুলিশের কোনো কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে কিছুই বলেননি।

এদিকে ২ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান তাঁর নিজ বাসভবনে ঘটনার বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টা নিয়ে যেহেতু তদন্ত চলছে, সেহেতু তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। তবে তদন্তে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মিলিটারি কবরস্থানে দাফনকার্য

ময়নাতদন্ত ও বিশ্লেষণের পর আজ বিকেলে মিলিটারি কবরস্থানে গার্ড অব অনার প্রদান শেষে দাফন করা হয় মেজর সিনহাকে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
সামিন ইয়াসার

আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন::
লাইক দিন: https://www.facebook.com/eisomoy365/ (‘এই সময়’ ফেসবুক পেইজ)
সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে: https://youtu.be/ZBMTaqUNbh4

Facebook Comments

Related Articles