বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের বরফ ভাঙার চেষ্টা পাকিস্তানের; চিন্তিত ভারত

অবশেষে ৩ বছর ধরে চলমান শীতল সম্পর্ক অবসান ঘটাতে উদগ্রীব পাকিস্তান সরকার। আর সেই লক্ষ্যে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকার প্রধান শেখ হাসিনা ওয়াজেদ কে ফোন আলাপে আগ্রহ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান সরকার প্রধান ইমরান খান।

বর্তমান আওমীলীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহনের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যু এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তথা তাদের সরকারের ভূমিকার জন্য নিঃস্বার্থ ক্ষমা চাওয়ার ইস্যুতে পাকিস্তান বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েনের শুরু হয় এমন অবস্থায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে পাকিস্তান এর ততকালীন সরকার নেওয়াজ শরীফের সংসদে নিন্দা প্রস্তাব আনা এবং বিশ্বে এই বিচার বন্ধে নানা রকম তদবীর ইস্যুতে বাংলাদেশ পাকিস্তান সম্পর্কে চরম অবনতি ঘটে। এমনি অবস্থায় প্রথমে পাকিস্তান এয়ারলাইনস এর কর্মীর বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি অভিযোগ আনা হয় এবং সেই কর্মী তরিৎ পাকিস্তানে স্থানান্তর করা হয় ঠিক তার কিছু দিনের মধ্যে বাংলাদেশ অবস্থানরত পাকিস্তানের দুই কুটনৈতিক এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদ কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার প্রমান পায় বাংলাদেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা এবং তারা র‍্যাবের হাতে ধরা পরার পর কূটনৈতিক ধারা বিবেচনায় তাদের এই অভিযোগ তদন্তের জন্য পাকিস্তানের সরকারের কাছে সোপর্দ করা হলেও পরবর্তীতে তার বেপারে কোন রকম তদন্ত করতে পাকিস্তান সরকার অস্বীকৃতি জানায় যা দুই দেশের সম্পর্কে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দেয়। এমন অবস্থায় ২০১৫ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তানি এক কুটনৈতিক কে বহিষ্কার করে যার পরবর্তীতে পাকিস্তান বাংলাদেশের কুটনৈতিক কে ফেরত পাঠায়। এছাড়াও বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানি কুটনৈতিক এর চলাচলের উপর বিশেষ নজরদারি শুরু করে।

এমন অবস্থায় সর্বশেষ ২০১৮ বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানি হাইকমিশনার হিসাবে নিযুক্ত সাকলাইন সায়েদা কে গ্রহন করতে অপারগতা জানায় এবং তারপর থেকে প্রায় ২০ মাস বাংলাদেশে অবস্থারত পাকিস্তান হাইকমিশনে কূটনৈতিক পদ টি শুন্য ছিল। এই সময়ে পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাই কমিশন পাকিস্তানি নাগরিক বাংলাদেশ ভ্রমনে নিষেথাজ্ঞা প্রদান করে ভিসা সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান বাংলাদেশ তাদের নতুন রাস্ট্রদূত হিসাবে ইমরান সিদ্দিক কে নিয়োগ দেন। নিয়োগ পাবার পর থেকেই এই নব নিযুক্ত রাস্ট্রদূত বাংলাদেশ সাথে অনেকদিন ধরে চলা এই শীতল সম্পর্কের বরফ গলাতে কাজ শুরু করেন তিনি বাংলাদেশের রাস্ট্রপতি ডক্টর আব্দুল হামিদের সাথে দেখা করেন এসময় তিনি পাকিস্তানের রাস্ট্রপতির আলভি আরিফ এবং প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের তরফ থেকে শুভেচ্ছা বিনময় করেন।

বাংলাদেশ পাকিস্তানের মধ্যে চলমান এই ভংগুর সম্পর্ক সচল করতে পাকিস্তান নব নিযুক্ত এই রাস্ট্রদূত পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় এর সাথে যোগাযোগ শুরু করেন এবং ইমরান খান সরকারের ইচ্ছায় তিনি গত কয়েকমাস ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তান এর প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ফোনালাপ এর মাধ্যমে কথা বলার জন্য চেস্টা করে আসছেন বলে জানা যায়।

পাকিস্তানের প্রভানশালী দৈনিক ডন এর বরাত দিয়ে পাকিস্তানের রাস্ট্রদূত এই প্রচেষ্টার কথা সামনে এসেছে। পাকিস্তান রাস্ট্রদূত ডন কে দেয়া এক বক্তব্যে বলে তিনি বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের জনগনের মধ্যে ভ্রাতৃত্যমুলক সম্পর্ক স্থাপনে কাজ করবেন। দক্ষিন এশিয়ার এই দুই প্রভাবশালী মুসলিম দেশের মধ্যে থাকা সকল ভুল বুঝাবুঝি নিরসন করাই তার মুল লক্ষ্য হবে৷ সেই সাথে দক্ষিন এশিয়ার অর্থনৈতিক ভাবে দিনে দিনে প্রভাবশালী হয়ে উঠা এই দেশ টির সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক কে তিনি আরও গভীরে নিয়ে যেতে চান। দুই দেশের মধ্যে বানিজ্য বৃদ্ধি, নাগরিকদের ভ্রমনসহ নানা ইস্যুতে কাজ করার সম্ভাবনা কথা তিনি উল্লেখ করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এই ফোন বড় ধরনের কুটনৈতিক পরিবর্তন এর সম্ভাবনা কে নির্দেশ করে। মুলত ভারতের সাথে সিমান্ত ইস্যুতে চলমান টানাপোড়েন তার মধ্যে নাগরিকত্ব ইস্যুতে সম্পর্কে যে অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে সেই সময়ে এসে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশ এর সম্পর্ক বৃদ্ধি পেলে তা নিঃসন্দেহ ভারতের জন্য চাপের সৃস্টি করবে। ভারত বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়ে শুরু থেকে উদ্বিগ্ন। ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারত বাংলাদেশে ক্রমশ তাদের বাজার হাড়াচ্ছে। এমন অবস্থায় পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশ সম্পর্কের বরফ গলা শুরু হলে তা ভারতীয় কুটনৈতিকদের মাথায় দূঃচিন্তার ছাপ ফেলতে বাধ্য। ইতিমধ্যে নাগরিকত্ব ইস্যু, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক মতবাদ চাপিয়ে দেয়া, সীমানা চুক্তি লংঘন, সিমান্ত সংঘর্ষ সহ না না ইস্যুতে চীন এবং নেপালের সাথে বৈরীসম্পর্কে জরিয়ে পড়ে। শুধু চীন নেপাল নয় বাংলাদেশের সাথে সিমান্ত হত্যা নিয়ে ক্ষোভ চরমে। ভারতীয় সিমান্ত বাহিনীর প্রশ্নবিদ্ধ কার্যকলাপ বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কে ইতিমধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এমন অবস্থায় পাকিস্তানের বাংলাদেশ সম্পর্কে পরিবর্তন তাদের কে দক্ষিন এশিয়ার কোনঠাসা করে ফেলতে পারে।

বাংলাদেশ পাকিস্তান সম্পর্ক ভারতের নিরাপত্তার জন্য যেন হুমকির কারন না হয় সেই ব্যপারে ভারত অধিক সতর্কতা অবলম্বন করবে।

সৌজন্যেঃ ডিফেন্স রিসার্চ ফোরাম; সৌরভ দত্ত

Facebook Comments

Related Articles