হলি ক্রস কলেজে কেন পড়বো? পর্ব-২

বৃহস্পতিবার,৬ আগস্ট,২০২০

পর্ব-২: জগতের আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ


“জগতের আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ”
প্রবেশপথের শুরুতেই টেরাকোটায় খোদাই করা এ বাণী বাস্তবে তাই। সত্যিকার অর্থেই হলি ক্রস একটি আনন্দযজ্ঞ। মনে হতে পারে কেন এরূপ সংজ্ঞায়ন। এ পর্বে হবে তারই বিশ্লেষণ । আজ সংক্ষিপ্ত আকারে পরিচয় হবে হলি ক্রস নামক আনন্দযজ্ঞের সাথে।

প্রাঙ্গনঃ
বড় একটা গেট থাকলেও ছোট্ট করে ‘হলি ক্রস কলেজ’ লেখা ছোট গেট টা দিয়েই প্রতিদিন প্রবেশ করে সব ছাত্রী, তাদের জগতের আনন্দযজ্ঞে৷ গেট দিয়ে ঢুকে একটু সামনে এগিয়ে বামপাশে চোখে পড়বে মাটিতে খোদাই করে তৈরি দেয়ালে রাখা শিল্পকর্ম। যাতে লেখা
‘জগতের আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ ‘
প্রশস্ত প্রাঙ্গন, বাস্কেটবল গ্রাউন্ড, পুরাতন বিল্ডিং এর পিছনের সুবিশাল সবুজ ঘাসে পরিপূর্ণ মাঠ আর তার চারপাশে বড় বড় গাছের ছায়া বেষ্টিত, এসব যেন ক্রসিয়ানদের প্রাণ!
আর পুরো কলেজেই কিছু দূর পরপরই আছে ডাস্টবিন। নিজের কলেজকে পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের নিজেরই। আর এ বিষয়ে রয়েছে কড়া নির্দেশ।হঠাৎ কখনও পড়ে থাকা বর্জ্য নিজ হাতে তুলে ডাস্টবিনে ফেলতে দেখা যেত সিস্টারদের। ফলে, নিজের প্রাঙ্গণ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব যে নিজের, এবং এ কাজ যে বিন্দুমাত্র ক্ষুদ্র নয়, তা অনুধাবন করতে শিক্ষার্থীদের বেগ পেতে হয়নি।

প্রাঙ্গণের কিছু অংশ। ছবিঃ সুমাইয়া আরা শৈলী, এলিজা আক্তার মালিহা

ক্যান্টিনঃ
‘দাদা, এক প্যাকেট বিরিয়ানি দেন।’ ‘দাদা তিন প্লেট চটপটি’৷ ’দাদা, একটা কোক আর তিনটা স্ট্র দেন।’
প্রতিদিনের যেকোন ব্রেক টাইমে ক্যান্টিনে এসব কথা বহুল পরিচিত। হেন খাবারের জিনিস নেই যে ক্যান্টিনে পাওয়া যাবে না। মজার ঘটনা হলো, আচার খাওয়ার পর উচ্ছিষ্ট ডাস্টবিনে না ফেলার অপরাধে আচার নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল ক্যান্টিনে।
সেই ৪০ টাকা দামের চিকেন বিরিয়ানির প্যাকেট (যা একজনের জন্য যথেষ্ট), নিজেদের ইচ্ছামত লাল মরিচ নিয়ে ঝাল করে বাস্কেটবল গ্রাউন্ডে বসে চটপটি খাওয়া, এক কোকের বোতলে তিনজন তিন টা স্ট্র দিয়ে খেতে গিয়ে তৃতীয়জনের ভাগ্য পুরো টাই ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’- এসবই নিত্যদিনের কাহিনী। আর এই ছোট ছোট ঘটনা গুলোই আনন্দের স্মৃতি হয়ে থাকে।

ক্যান্টিন- দূর থেকে তোলা। ছবিঃ তাবাসসুম নিশাত

ল্যাবঃ
মহাযজ্ঞ? হ্যাঁ, তা অবশ্য বলা যায়। হলি ক্রস কলেজ লাইফের এক মহাযজ্ঞের নাম এই ল্যাব।
কেমিস্ট্রি ল্যাবে দেখা মিলবে এক অসীম ক্ষমতাধর মানুষের সঙ্গে। লবণ মেলানো আর টাইট্রেশন করতে করতে….. আচ্ছা সে না হয় পরেই দেখা যাবে।
বায়োলজি ল্যাব বলা যায় মজারই এক জায়গা। নিত্যনতুন আকর্ষণীয় জিনিস দেখার সৌভাগ্য হয়। তবে আসল মজা সেদিন হয়, যেদিন তেলাপোকার ডিসেকশন করতে হবে।
বিন্দু, বিন্দু, বিন্দু………………….
এতগুলো বিন্দু কেন দেখাচ্ছি? সেটা ম্যাথ ল্যাবেই বোঝা যায়৷ প্রতিদিন গ্রাফে অগণিত বিন্দু বসানো আর সেগুলো যুক্ত করে অর্থবহ কিছু বের করে আনা…. এক মহা ঝঞ্জাটের ব্যাপার। আবার এইসব বিন্দু ঠিকভাবে মেলাতে না পারলে গ্রাফ সাইনও হবে না।
অতঃপর আসি ফিজিক্স ল্যাবের কথায়। মহাযজ্ঞের চেয়ে এক কাঠি সরস! ফিজিক্স ল্যাবে মেকআপের(!) সম্মুখীন হয়নি এমন ক্রসিয়ান খুঁজে পাওয়া বিরল। এই মেকআপ কিন্তু সেই মেকআপ না। অবশ্য তা যথাসময়েই টের পাওয়া যাবে।
ল্যাবের কথা শুনে মনে হতে পারে খুবই কষ্টের ব্যাপার। কিন্তু যখন ল্যাবের কোন পরীক্ষার ফলাফল মিলে যায়, তার আনন্দটাই অন্যরকম। আর হলিক্রসের অন্যতম সেরা স্মৃতি গুলোর জন্ম এই ল্যাবের সামনের করিডোরেই।


ক্লাসঃ
এ বিষয়ে হলি ক্রসের প্রশংসা একটু বেশিই করতে হয়। কাঠের ডেস্কে বোঝাই ক্লাসরুম গুলো যেন একেকটি মহাকাব্য। প্রত্যেক ডেস্কে সাদা পোষাক পরিহিত ক্রসিয়ানদের মনোযোগী দৃষ্টি, শিক্ষকদের ভাষায় স্বর্গীয় দৃশ্য।পড়াশোনার মান নির্ধারণের কথা যদি বলি তাহলে বলতে হবে, সঠিক উপায়ে পাঠদানের একটি আদর্শ মানদন্ড হলি ক্রস। কারণ, হলি ক্রস সব সময় পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে, স্বেচ্ছায় জেনে বুঝে শেখাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এছাড়া,প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কথা বিবেচনা করে অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিকভাবে পাঠদান করা হয় এবং শিক্ষকবৃন্দ এক্ষেত্রে অত্যন্ত বন্ধুসুলভ আচরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর জড়তা দূর করেন, যার ফলে কখনও কোনো সমস্যার বিষয় তুলে ধরতে সংকোচবোধ হয়নি। পড়াশোনার পাশাপাশি ক্লাসে অনুপ্রেরণা, হাস্যরস আর আতংক ও কম নয়। যার ফলে,বিভিন্ন সময় ক্লাসরুমে দেখা যেত বিভিন্ন রকম চিত্র।কখনো নিউটন স্যারের হাস্যরসাত্মক উপস্থাপনায় হাসতে হাসতে পাশের ডেস্কে লুটিয়ে পড়তে দেখা যেত, আবার স্যারের কাছ থেকে “বোতল” সম্বোধনে উচ্ছাসিত হতে দেখা যেত,কখনোবা সূত্র পড়া ধরতে গিয়ে ইন্দ্রজিৎ স্যারের “পেছন থেকে পাঁচ নম্বর কলাম এর তিন নম্বর মেয়ে” ডাক শুনে আতঙ্কে ফ্যাকাশে হতে দেখা যেত আবার কখনো সিস্টার শিখার মায়াবী কন্ঠে একেকটি শুভ্র প্রাণকে নতুন শক্তিতে জেগে উঠতে দেখা যেত…..
এছাড়া আফরিন মিসের সাথে নতুন করে জীবন দেখা, ফাহমিনা মিসের মুখে “good morning girrrrls” শুনে সতেজ হয়ে ওঠা, তিথি মিসের অনুপ্রেরণা আর মিষ্টি আদর, হামিদা মিসের অপূর্ব সেই মায়াবী হাসি….সব মিলিয়ে হলি ক্রসের ক্লাসরুমগুলো সত্যিকার অর্থেই একেকটি মহাকাব্য…

ক্লাসরুম। ছবি- সুমাইয়া আরা শৈলী

পানিশমেন্টঃ
I will never be late in the class….. নিঃসন্দেহে খুব সুন্দর একটি বাক্য। কিন্ত এটি যদি আপনাকে ২০০ বার লিখতে বলা হয়? হ্যা, এমন শাস্তিই পেতে হয় কলেজে দেরী করে প্রবেশ করলে। আসলে, শৃঙখলার অপর নাম হলি ক্রস। আর তাই, হলি ক্রসে ভালোবাসার যেমন শেষ নেই, তেমনি শেষ নেই শাস্তির। বিভিন্ন সময়ে সিস্টার তাপসীর আদুরে কন্ঠে শোনা যায় ভর্ৎসনা(অবশ্যই তা কল্যানকর)। ইউনিফর্ম কিংবা জুতা অপরিষ্কার, জুতার ফিতা বাঁধোনি , চুলে রং করেছো কিংবা ব্যাগে কোনো কার্টুন ব্যাচ লাগিয়েছো….রেহাই পাবেনা একটি শিশুও….
শাস্তির সবচেয়ে ভয়ংকর অংশের কথা বলতে যাচ্ছি এখন—
ক্লাসে চলাকালীন লুকিয়ে প্রাক্টিক্যাল ল্যাব রিপোর্ট লেখা সকল ক্রসিয়ানের জাতিগত অভ্যাস। কিন্তু যদি একবার তা স্যরের চোখে পড়ে তবে প্রাক্টিকাল খাতা সম্পূর্ণই ছিড়ে কয়েক খন্ড হবে এবং ফেলে দেয়া হবে ডাস্টবিনে।ফলশ্রুতিতে… অতি লোভে তাঁতী নষ্ট । এছাড়া রং বেরঙের হেয়ার ব্যান্ড, ক্লিপ চোখে পড়লেও তার স্থান হবে ওই ডাস্টবিনে।
এছাড়া ক্লাস রুমে লিখতে লিখতে হঠাৎ জানালার দিকে তাকালে দেখা মিলতে পারে চৌকাস দৃষ্টির ছায়ামানবীর। ভয়ের কিছু নেই, তিনি করিডোরে হেঁটে যাওয়া সিস্টার তাপসী। আর সিস্টার যদি প্রাক্টিকাল রিপোর্টসহ কাউকে দেখতে পান তবে জানালার ফাঁক দিয়ে একটি অদৃশ্য হাত এসে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে খাতাপত্র। ভয় পাওয়ার কিছু নেই, এটিও সিস্টার তাপসীই। তবে দুঃখের বিষয় এটি যে প্রাক্টিক্যাল রিপোর্টগুলো হয়তো আর ফেরত পাওয়া যাবে না, কিংবা বিশেষ শর্তে পাওয়া যেতেও পারে।
তবে, বছর শেষে কলেজ ছেড়ে আসার সময় প্রত্যেক ক্রসিয়ান এসব স্মৃতিকে মধুর ভেবেই অশ্রুসিক্ত হয়…

লাইব্রেরীঃ
প্রত্যেক ক্রসিয়ানের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা এটি। এখানে সারি সারি বুক শেলফ এর মাঝে অনায়াসে হারিয়ে যাওয়া যায়। পাঠ্যবই,সাহিত্য, জার্নাল,এনসাইক্লোপিডিয়া কিছুই বাদ নেই এই সমাহারে। চাইলে ঘন্টার পর ঘন্টাই এখানে কাটিয়ে দেয়া যেত কিন্তু রুটিন ক্লাসের জন্য হয়তো সম্ভব হয় না। কিন্ত যখনই সময় মেলে তখন ভিড় জমে লাইব্রেরীতে।কখনও পাঠ্যবইয়ে, কখন ও সাহিত্যের পাতায়, কখনওবা কলেজ থেকে প্রকাশিত ম্যাগাজিন “স্ক্রাইব” ও “কেন্দ্রিকা” এর বিগত সংখ্যায় মুখ গুজিয়ে থাকতে দেখা যায়। আর লাইব্রেরী কার্ড পাওয়ার পর তার নাগাল পায় কে! পারলে যেন পুরো লাইব্রেরি তুলে নিয়ে যেত কিন্ত তা তো সম্ভব নয়ই বরং বই ফেরতের সময় উত্তীর্ণ হলে দিতে হয় জরিমানা…
আর যে কথাটি না বললেই নয়, বই এর যে বিস্তৃত সংগ্রহ হলি ক্রস কলেজ লাইব্রেরীতে দেখা যায়, তা এখনও বেশিরভাগ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই।

লাইব্রেরী। ছবিঃ সুমাইয়া আরা শৈলী, তাবাসসুম নিশাত

এতোসব দেখে মনে হতেই পারে যে হলিক্রস কলেজের নিয়ম কানুন একটু কঠিন। কিন্তু এতকিছুর মাঝে জীবনকে উপভোগের উপকরণও কম নয়। একজন শিক্ষার্থী কে নিজেকে নতুন ভাবে চিনতে-জানতে সাহায্য করে হলিক্রস৷ হলফ করে বলা যায় বেশির ভাগ ক্রসিয়ান তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা কাটিয়েছে এই হলিক্রস কলেজে।
আনন্দযজ্ঞের পরিচিতি কিন্তু শেষ নয়। এ পরিচিতির বাকি অংশের দেখা মিলবে পরবর্তী এবং শেষ পর্বে। অপেক্ষা করছে বিশেষ আকর্ষন!!!

“হলিক্রস কলেজে কেন পড়বো?” এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের সিরিজের সর্বশেষ পর্ব শীঘ্রই আমরা নিয়ে আসবো এই সময়ের মাধ্যমে। সাথে থাকুন।

পড়ে নিতে পারেন পর্ব-১: https://eisomoy365.com/4803/

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাবেয়া আক্তার স্বর্না ও সাদেকা সুলতানা সেতু

আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন::
লাইক দিন: https://www.facebook.com/eisomoy365/ (‘এই সময়’ ফেসবুক পেইজ)
সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে: https://youtu.be/ZBMTaqUNbh4

Facebook Comments

Related Articles